.
০৭.
প্রাতঃরাশের পর এমিলি ও ভেরা আবার সেই পাহাড়ের চূড়াটার ওপর গিয়ে উঠে বসলো। উদ্দেশ্য লঞ্চ আসছে কিনা দেখার জন্য।
আগের চেয়ে বাতাসের তীব্রতা বেড়েছে। যতদূর দৃষ্টি যায়, কেবল ঢেউ-এর পর ঢেউ উত্তাল সমুদ্রের বুকে ভেঙ্গে পড়ছে আবার নতুন করে গড়ে উঠছে, সমুদ্র তীরে এসে আছড়ে পড়ছে, ফেনলি জলরাশি ছড়িয়ে পড়ছে ধূসর বালিয়াড়ির ওপর।
দুজনেরই দৃষ্টি চলে যায় দূরে, বহু দূরে, সমুদ্রের গভীরে, কিন্তু কোথাও লঞ্চের চিহ্ন চোখে পড়ল না তাদের। ওপারে স্টিকল হ্যাঁভেনের গ্রামগুলো এপার থেকে সারি সারি পাহাড়ের মতো দেখাচ্ছিল। আকাশটা যেন সেই পাহাড়গুলোর চূড়ায় মিশে গিয়ে একাকার হয়ে গেছে।
আশাহত হয়ে নিচু গলায় বললেন এমিলি, লঞ্চের ঐ চালকটার কি যেন নাম-হা মনে পড়ছে ফ্রেড, ফ্রেড নারাকটকে দেখে গতকাল মনে হয়েছিল, সমঝদার নোক, তার ওপর নির্ভর করা যায়, কিন্তু আজ দেখো, কি রকম অবিবেচকের মতো কাজ করলো বস, এখনো তার পাত্তাই নেই।
ভেরাও কম অবাক হয়নি। এবং আতঙ্কিত বটে। তার হাত-পা যেন অবশ হয়ে আসছে, যত সময় অতিবাহিত হচ্ছে, ভয়ে আশঙ্কায় ততই যেন কুঁকড়ে যাচ্ছে সে। কোনো রকমে একটা কৃত্রিম স্বাভাবিক ভাব ফুটিয়ে রাখার প্রয়াস রয়েছে তার হাবভাবে, চালচলনে, যাতে আর পাঁচজনের সামনে প্রকাশ না পায়।
শান্তনার বাণী শোনা গেলো তার মুখে ঘাবড়াচ্ছেন কেন লঞ্চ ঠিক আসবে একটু পরেই। আসা মাত্র দেরী না করে এক লাফে উঠে পড়বো লঞ্চে। এখান থেকে যতো তাড়াতাড়ি মুক্তি পাওয়া যায়, ততই ভালো।
সে আর বলতে। জায়গাটা যেমন অদ্ভুত, এখানকার সব কিছুই কেমন যেন বিচিত্র ধরনের এতটুকু সাদৃশ্য নেই পৃথিবীর অন্য কোনো স্থানের সঙ্গে। এমিলি একটু থেমে বলতে শুরু করলো খুব ঠকিয়েছে সে আমাকে। ভাল করে দেখলে ঠিক ধরা যেত, চিঠিটা জাল ছাড়া আর কিছু নয়। অথচ এখানে আসার আগে একবারও খেয়াল হয়নি, চিঠিটা ভুয়োও হতে পারে।
হ্যাঁ, আমিও একবার ভুলেও এ-দিকটার কথা চিন্তা করে দেখিনি।
আমরা সবাই কেমন বোকা বনে গেছি ঐ পাগলটার কাছে। আমাদের সবাইকে আকাট মুখ-সুখ ভেবেছে সে। তা না হলে আমরা সবাই এক সঙ্গে ভুল করবোই বা কেন?
আচ্ছা মিস ব্লেন্ট আপনি যা বললেন তা সত্যি? সত্যি সত্যিই কি রগার্সরা তাদের মনিবকে হত্যা করেছিল?
কি যেন ভাবলেন এমিলি কয়েক মুহূর্তের জন্য, তারপর যেন স্বগোক্তি করলেন হ্যাঁ, সত্য বৈকি। তবে এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা। তা তোমার কি মনে হয় ভেরা?
আমি এখনো সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি
এর মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া-নেওয়ারই বা কি আছে। যেভাবে রগার্সের বৌ জ্ঞান হারালো, রগাস যেভাবে কফির ট্রে হাত থেকে ফেলে দিলো, তাতেই তো ওদের মনের কথা স্পষ্ট প্রকাশ পাচ্ছে। আর পরে রগার্স যে সব কথাগুলো বলে গেলো, শুনে তোমার কি একবারও সন্দেহ হয়নি। কথাগুলো বানানো। ডাহা মিথ্যে বলেছে সে। যাইহোক, ওরা যে সত্যিই অপরাধী, তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
হ্যাঁ, আপনার অনুমাণ অক্ষরে অক্ষরে সত্য। রগার্সের বৌ-এর মুখের ভাব দেখে আমারও কেন জানি না মনে হয়েছিল, একটা অপরাধবোধ যেন তাকে কুঁরে কুঁরে খাচ্ছিল। সব অপরাধীরাই বোধহয় এতো ভীতু হয়ে থাকে, তাদের অতীত অপরাধ বুঝি এভাবেই তাদের পঙ্গু করে তোলে।
এ ব্যাপারে সেই নীতিকথাটা মনে পড়ে যায়–এ জন্মের পাপের শাস্তি তোমাকে এ-জন্মেই মাথা পেতে গ্রহণ করতে হবে। রগার্সের জীবনে সেটা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেলো।
বেশ তো তাই যদি হয়, ভেরা মন্তব্য করলো, তাহলে আর বাকী লোকদের কপালে কি রকম শাস্তি ঘটতে পারে?
তুমি কি বলতে চাইছো একটু স্পষ্ট করে বলবে?
নিশ্চয়ই! দ্বিধার জড়তা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠে ভেরা উত্তর দেয়, আমাদের নামেও তো অভিযোগ আনা হয়েছে। রগার্সদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যদি সত্যি বলে তুমি মনে করো, তাহলে আমার তোমার ও অন্যদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলিও তো কথাটা অসম্পূর্ণ রেখে এমিলির দিকে তাকালো ভেরা তার প্রতিক্রিয়া উপলব্ধি করার জন্য।
উত্তর না দিয়ে কিছুটা সময় ভেরার দিকে তাকিয়ে রইলেন এমিলি, তারপর মাথা নাড়লেন হ্যাঁ আমি জানি, তুমি কি বলতে চাইছে, যেমন লম্বার্ডের কথাই ধরা যাক না কেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ঐ শয়তানটা একজন আদিবাসীকে হত্যা করেছে। তবে লম্বার্ড নিজেই তার দোষ স্বীকার করে নিয়েছে। সুতরাং তার ব্যাপারটা এখানেই ইতি টানা যেতে পারে। এখানে একটু থেমে হঠাৎ কি যেন মনে পড়েছে এমনি একটা ভাব দেখিয়ে এমিলি আবার বলতে শুরু করলেন। তবে এ কথাও ঠিক যে, সব অভিযোগই যুক্তিগ্রাহ্য নয়। কিছু অভিযোগ আছে, যা শোনা মাত্র বলে দেওয়া যায়, মিথ্যে, ভুয়ো কিংবা বানানো ছাড়া আর কিছু নয়। এই যেমন মিঃ ওয়ারগ্রেভের কথাটা ধরা যাক না কেন, তিনি একজন স্বনামধন্য বিচারপতি, তিনি যদি বিচারে কোনো অপরাধীকে শাস্তি প্রদান করে থাকেন, তাতে তার অপরাধটা কোথায়? মিঃ ব্লোরের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। আর আমার ব্যাপারটা একটু থেমে কি যেন ভাবলেন তিনি, তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, কাল আমি চুপ করেছিলাম। অতোগুলো পুরুষ মানুষের সামনে মেয়েলী ব্যাপারে মুখ খুলি কি করে, বিশ্বাস করো, আমি কোনো দোষ করিনি, আমি নির্দোষ। বেট্রিস টেলরসকে একরকম যেচেই চাকরীটা দিয়েছিলাম। ঘরোয়া কাজ। তবে তার কাজে কোনো খুঁত ছিলো না। কিন্তু
