অতএব তার স্ত্রীর মুখ চিরদিনের জন্য বন্ধ করা, প্রয়োজন। কিন্তু কি ভাবে?
কেন উপায় তো খুব সহজ। স্ত্রীর কোন পানীয়র সঙ্গে কিছু একটা মিশিয়ে তার পক্ষে তাকে এমন ভাবে ঘুম পাড়িয়ে রাখলো, যা এ জীবনে ঘুম আর কখনো ভাঙ্গবে না।
বাঃ আপনি চমৎকার গল্প বানাতে পারেন তো মিঃ ব্লোর, আমস্ট্রং-এর মুখে শ্লেষের হাসি ফুটে উঠতে দেখা গেলো, তবে আপনাকে বলে রাখি মৃতের ঘরে খালি চায়ের কাপ কিংবা জলের গ্লাস আমি দেখতে পাইনি।
চোখে না পড়ারই তো কথা। রগার্স কি এতই বোকা? সে তার কাজ হাসিল করার পরেই পাতটি ধুয়ে মুছে যেখানে রাখার ঠিক রেখে দিয়ে থাকবে।
তাদের আলোচনার মাঝে বাধা দিয়ে বললেন ম্যাকআর্থার, মিঃ ক্লোরের ধারণার কথা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে কথা হচ্ছে, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর এমন নিষ্ঠুর ব্যবহার ভাবতে গিয়ে কেমন অবাক লাগে তাই না?
চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। নিজের জীবনের কাছে ও-রকম নিষ্ঠুর ব্যবহার-ট্যবহার করেই থাকে সবাই। তখন মানবতার প্রশ্ন-টশ্ন বলতে কিছু থাকে না। কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন ব্লোর।
প্রাসাদের বাইরে পথের ওপর পায়চারি করছিলেন ব্লোর ও লম্বার্ড। এক সময় থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বললো লম্বার্ড, লঞ্চের কি ব্যাপার বলুন তো? এখনো এসে পৌঁছলো না
আর পৌঁছবে না রহস্যময় হাসি হাসলেন ব্লোর মানে এখানে আসতে দেওয়া হবে না। সেই বদ্ধ পাগলটার এটাও একটা পাগলামি বলে ধরে নিতে পারেন।
আমারও তাই ধারণা হঠাৎ অন্যের কণ্ঠস্বর শুনে পিছন ফিরে তাকালেন দুজন, ম্যাকআর্থার সখেদে আরো বললেন, লঞ্চ আসার সম্ভাবনা নেই। সেই সঙ্গে এই অভিশপ্ত দ্বীপ থেকে ফিরে যাওয়ারও কোনো উপায় নেই আর। শেষ দিকে গলা ভারী হয়ে এলো, মুখের সামান্য হাসিটুকুও মুছে গেলো, চোখের দৃষ্টি উদভ্রান্ত হলো। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ম্লান বিষঃ গলায় বললেন তিনি, এখানে অপার শান্তি, এই ভাল। জীবনের শেষ সীমানায় এসে পৌঁছেছি আমরা, আমরা জেনেছি, কেউ আর ফিরবো না এখান থেকে, ফিরতে পারি না–
তারপর তিনি আর দাঁড়ালেন না, সেখানে বালিয়াড়ির পথে এগিয়ে গেলেন দ্রুত পায়ে। ঢল নেমেছে সমুদ্রের দিকে। একটু পরেই তার শরীরটা দৃষ্টির আড়ালে চলে
বিরক্তি প্রকাশ করলেন ব্লোর, ফিরবো না বললেই হলো। আলবাৎ ফিরবো আমরা। ফিরে যাওয়ার জন্যই তো আমরা এখানে এসেছি। মাস্টার্ন মিসেস রগার্সের মতো চিরদিন এখানে চির ঘুমে ঘুমিয়ে থাকার জন্য তো আমরা আসিনি।
হ্যাঁ, বটেই তো। বটেই তো, লম্বার্ডের ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি। এক পলকে ব্লোরকে একবার দেখে নিয়ে লম্বাৰ্ড আবার বললো, অন্যদের কপালে যাই ঘটুক না কেন, আপনার পরমায়ু কমিয়ে আনবে, এমন দুঃসাহস কার আছে শুনি।
তার বিদ্রূপটা ধরে ফেলেছেন ব্লোর। তীক্ষ্ণস্বরে বলে উঠলেন তিনি এ আমার ব্যক্তিগত সমস্যা মিঃ লম্বার্ড। অতএব ভাবনা আমাকেই ভাবতে দিন। অহেতুক আমার ব্যাপারে মাথা ঘামানোটা একেবারেই পছন্দ নয়, মনে থাকে যেন।
আহত স্বরে বললো লম্বার্ড, হ্যাঁ মনে থাকবে। কথাটা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
প্রাসাদের ভেতরে একা একা থাকতে গিয়ে আমস্ট্রং-এর যেন দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। তাই তিনি বাইরে বেরিয়ে এলেন। প্রথমেই চোখে পড়লো ব্লোর আর লম্বার্ড কি একটা ব্যাপারে, যেন জোর তর্ক চালাচ্ছে, এবং ওয়ারগ্রেভ একা একা পায়চারি করছেন অদূরে। আশেপাশে অন্য কারোর টিকিও দেখা গেলো না।
একটু সময় কি ভেবে ওয়ারগ্রেভের দিকে এগিয়ে গেলেন ডঃ আর্মস্ট্রং। ঠিক সেই সময় পথের মধ্যে ছুটে এসে দাঁড়ালোরগার্স। সাদা কাগজের মতো ফ্যাকাসে মুখ, উদভ্রান্ত চোখের দৃষ্টি।
খুব জরুরী দরকার। একবার প্রাসাদের ভেতরে আসবেন, এখুনি?
কেন আবার কি হলো রগার্স?
কাল থেকে একটার পর একটা অদ্ভুত সব ঘটনা কেমন ঘটে যাচ্ছে। এ সব দেখে শুনে মনে হচ্ছে আমি বোধহয় সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাবো।
কেন এখন আবার নতুন করে কি ঘটলো?
নতুন করে ঠিক নয়, কালকের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বলতে পারেন। আপনি হয়তো ভাবছেন, সদ্য আমার স্ত্রী মারা গেছে বলে বোধহয় আমার মাথার গোলমাল হয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ডাক্তারবাবু আমি এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ আছি। তবে এর পরে নতুন করে অবাক হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটলে আমার মাথার গোলমাল হয়ে যাবে দেখবেন।
ভনিতা না করে কি হয়েছে চটজলদি বলেই ফেলো না।
হ্যাঁ, বলবো বলেই তো এসেছি, প্রাসাদে প্রবেশ করে সোজা রগার্সের শোওয়ার ঘরে চলে এলেন আর্মস্ট্রং তারপর বললো সে। কাঁচের শোকেসের ঐ পুতুলগুলো দেখতে পাচ্ছেন, চিনামাটির সুন্দর সুন্দর পুতুলগুলো ভাল করে তাকিয়ে দেখুন ভাল করে দেখতে পাচ্ছেন তো?
হুঁ মাথা নেড়ে সায় দিলেন আমস্ট্রং। আমরা এখানে যখন আসি তখন ওখানে দশ-দশটি সুন্দর সুন্দর পুতুল দেখেছিলাম।
হ্যাঁ, আমরাও দশটি পুতুল দেখেছিলাম বৈ কি।
কিন্তু জানেন ডাক্তারবাবু, গতকাল আপনাদের সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘরে শোয়ার আয়োজন করছিলাম হঠাৎ নজরে পড়লো দশটা পুতুলের মধ্যে একটা কম। অর্থাৎ নটা মাত্র পুতুল আছে। কাল ভেবেছিলাম, বোধহয় গুনতে আমি ভুল করে ফেলেছি। হয়তো আমার সেই ভুলটা ভেঙ্গে যেতেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম আমি, তবে আজ আর সেই ভুলটার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছি না। কিন্তু না, আপনার আজ প্রাতঃরাশ সেরে চলে যাওয়ার পর ঘরদোর পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখি আর এক অদ্ভুত ঘটনা–এবার নটা পুতুল দেখতে পেলাম না, মাত্র আটটি। কি আশ্চর্য। আমার নিজের চোখকে অস্বীকার করবো কি করে? আপনিই বলুন নটার বদলে আটটা পুতুল দেখলে কে না অবাক হবে?
