বসবার ঘর থেকে ত্রস্তপায়ে বেরিয়ে এসে ভেরার কাছে জানতে চাইলেন এমিলি, লঞ্চের কোনো হদিশ পেলেন?
না কোনো চিহ্নই দেখতে পেলাম না। ভেঙ্গে পড়লেন এমিলি হতাশ ব্যঞ্জক উত্তর শুনে। বিমর্ষ মুখে তাদের সঙ্গে ঢুকলেন ডাইনিংরুমে।
অঢেল খাবারের আয়োজন। ম্লান-বিষণ্ণ মুখে তাদের খাওয়ার তদারকি করতে থাকে রগার্স। এই কয়েক ঘণ্টায় তার চোখের কোলে কালি পড়ে গেছে, মুখ ফ্যাকাশে সাদা হয়ে কাছে স্ত্রী বিয়োগে। সেটা লক্ষ্য করে হঠাৎ এমিলি জিজ্ঞেস করে বসলেন, আপনারা লক্ষ্য করেছেন, আজ রগার্সকে কেমন যেন একটু অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে, ওর শরীর ভাল আছে তো?
হ্যাঁ, শরীর তো ভাল তবে
তবে কি?
প্রাতরাশ শেষ হওয়ার পর সব বলবো। এ নিয়ে আপনাদের সঙ্গে পরামর্শ করাও দরকার?
সকলের প্রাতঃরাশ শেষ হলে এক এক করে সকলের আগ্রহান্বিত মুখের ওপর দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন আর্মস্ট্রং। মনে মনে বিড়বিড় করেই বললেন, এটা একটা দুঃসংবাদই বটে। খাবারের তৃপ্তিটুকু উপভোগ করতে গিয়ে যাতে আপনারা বাধার সম্মুখীন না হন, তাই আগে বলিনি। জানেন, রূপালির স্ত্রী মারা গেছে।
সেই মুহূর্তে ঘরে যেন বাজ পড়লো। স্তব্ধ হতবাক হয়ে গেল সকলে। সকলের স্থির দৃষ্টি তখন আমস্ট্রং-এর ওপর। কারোর মুখে কথা নেই। হঠাৎ সবাই যেন বোবা হয়ে গেছে। তারই মাঝে অকস্মাৎ চিৎকার করে বলে উঠলো ভেরা এ আপনি কি বলছেন ডক্টর? আশ্চর্য। এখানে আসার পর চব্বিশ ঘণ্টাও কাটলো না, এরই মধ্যে দু-দুটো মৃত্যু?
আর্মস্ট্রং-এর দিকে ভুরু কুঁচকে তাকালেন ওয়ারগ্রেভ, এ যে দেখছি ভয়ঙ্কর বিস্ময়। তা মৃত্যুর কারণটা নির্ণয় করতে পেরেছেন ডাক্তার?
এখুনি ঠিক বলা মুশকিল
অর্থাৎ পোস্টমর্টেম না হওয়া পর্যন্ত বলা মুশকিল, এই তো?
হ্যাঁ, ঠিক তাই। এক্ষেত্রে ভাল করে না জেনে-শুনে ডেথ সার্টিফিকেট দিতে পারছি না।
আমার মনে হয় তাদের কথার মাঝে বাধা দিয়ে এবার ভেরা বললো, হয়তো মিসেস রগার্সের নার্ভ দুর্বল ছিলো। তার ওপর গতকালের অমন আকস্মিক ঘটনায় হয়তো মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। আর তাতেই তার মৃত্যু ঘটে থাকবে।
তা না হয় মানলাম, কিন্তু– ভেরার যুক্তিটা ঠিক মেনে নিতে পারলেন না আর্মস্ট্রং। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললে মানুষ পাগল হয়ে যায়, কিন্তু কখনোই সে মরে না।
বিবেক, বিবেকদের দংশনেও তো মৃত্যু হতে পারে না? এবার এমিলি তার ধারণার কথা প্রকাশ করলো।
এখানে বিবেকের প্রশ্ন আসে কি করে? এবারেও এমিলির যুক্তি ঠিক মেনে নিতে। পারলেন না ডঃ আর্মস্ট্রং।
কেন গতকাল রাতে গ্রামোফোন রেকর্ডে সেই সব অভিযোগের কথাগুলো এরই মধ্যে আপনি ভুলে গেলেন? এমিলি আরো বলে সেই যে, স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলে তাদের পুরনো মনিবকে হত্যা করার অভিযোগ প্রতিধ্বনিত হলো রেকর্ডে। হয়তো এটা তারই প্রতিক্রিয়া–হয়তো সেই অভিযোগটা একেবারেই মিথ্যে নয়, সত্যি সত্যিই তারা হয়তো খুন করে থাকবে তাকে। সে খবর চাপা ছিলো, এতোদিন পরে তাদের সেই কু-কীর্তি ফাঁস হয়ে যাওয়াতে বিবেকের দংশনই মিসেস রগার্সকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে থাকবে হয়তো।
না, না এটা ঠিক নয়, জোরে জোরে মাথা নাড়লেন আর্মস্ট্রং। আপনার কল্পনার কথা বাস্তবে মিলিয়ে ফেলার অযথা চেষ্টা করবেন না মিস্ ব্লেন্ট। চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিবেক-টিবেক বলে কিছু নেই। ধরা যাক, মিসেস রগার্সের হার্ট অত্যন্ত দুর্বল ছিলো।
আপনি যাই বলুন না কেন, এমিলি নিজের বক্তব্য জোরালো ভাবে সমর্থন করে বললেন, আমি এখনো বিশ্বাস করি, আমি ঈশ্বরকে বিশ্বাস করি, তিনিই পাপীকে তার প্রাপ্য শাস্তি প্রদান করে তার কর্তব্য পালন করেছেন।
এমিলির কথায় ব্লোর যেন একটু আঘাত পেলেন, ছিঃ মিস্ ব্লেন্ট, আপনি কি যা তা বলছেন?
কেন, আমি কি এমন ভুল বলেছি। ব্লোর দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকালেন এমিলি পাপের ফল তো ভুগতেই হবে পাপীকে। ঈশ্বরের নিখুঁত বিচারে পাপীর যে রেহাই নেই, ও আমি একান্ত ভাবে বিশ্বাস করি।
রেহাই যে একেবারেই নেই জোর দিয়ে তা বলা যায় না। গালে হাত রেখে বললেন ব্লোর, কতো পাপীই না আমাদের সঙ্গে মিশে আছে, আমরা তাদের কজনকেই বা চিনি।
অতো সব বিশ্লেষণে আমাদের কাজ নেই, প্রসঙ্গটাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেন ব্লোর, এখন আমাদের জানতে হবে, কাল রাতে কি খেয়েছিলেন মিসেস রগার্স।
কিসসু নয়, বললেন আর্মস্ট্রং।
অসম্ভব, আমি বিশ্বাস করি না।
তার স্বামী, রগার্স নিজে আমাকে বলেছেব্যঙ্গ করে বললেন আর্মস্ট্রং এর পরেও কি অবিশ্বাস করবেন?
কে কে বলেছেন বললেন–তার স্বামী রগার্স? একটা কেমন তাচ্ছিল্যের ভাব প্রকাশ পেলো ব্লোরের কথায়, সে তো বলবেই?
আর্মস্ট্রং এবং লম্বার্ড দুজনেই একসঙ্গে ফিরে তাকালেন ব্লোরের দিকে।
আবার সেই তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন ব্লোর বড় বিচিত্র এই পৃথিবী, তার চেয়েও বিচিত্র বোধ হয় মানুষের মন, কার মনে কি আছে বাইরে থেকে বোঝা মুশকিল। এই কালকের সেই ঘটনার কথাই ধরুন না কেন–আমরা প্রত্যেকেই আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে ক্ষোভ প্রকাশ করলাম, পাগলের কাণ্ড বলে উড়িয়ে দিলাম। কিন্তু যদি একটু তলিয়ে দেখা যায়, সেটা নিছক কারোর পাগলামি বলে আদৌ মনে হবে না। তাহলে এর থেকেই আমরা ধরে নিতে পারি, রগার্স ও ওনার স্ত্রীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ একেবারে মিথ্যা নয়। এও হতে পারে সত্যিই তারা তাদের বৃদ্ধা মনিবকে খুন করেছিল। এতোদিন এই জঘন্য ঘটনার কথা চেপে গিয়েছিল তারা। কিন্তু একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন ব্লোর, যাকে আমরা কাজ পাগল বলে কোনো আমল দিতে চাইছি না, যে যখন সেই সত্যটা প্রকাশ করে দিলো, তখন প্রথমেই ভয় পেয়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললোরগার্সের স্ত্রী। রগার্সও আতঙ্কিত হয়ে উঠলো মনে মনে। তার আশঙ্কা হলো, এবার বোধহয় আর রেহাই নেই, তার সেই দুষ্কৃতির কথা দুর্বল মুহূর্তে যদি তার স্ত্রী প্রকাশ করে দেয়, তখন তার আর বাঁচার পথ থাকবে না। অতএব
