ইথারের শিশির ছিপি খুলে এমিলির ফাঁক হয়ে যাওয়া মুখের ভেতরে ঢালতে গিয়ে আর এক দফা চমক লাগলো। আজ যেন একটার পর একটা অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে। একটু আগের দেখা এমিলি এখন হয়ে গেলো মার্স্টান। তোমরা কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা শুরু করে দিলে শেষ পর্যন্ত?
বড় জোরে জোরে হাত-পা খিচছে সে। এমন করলে খুন করবো কি করে। ওকে সবাই মিলে শক্ত করে ধরে থাকো। যতক্ষণ না আমি ছুরি চালাই, না ঠিক হচ্ছে না, হ্যাঁ, এই ভাবে নমি তুমি ওর হাত দুটো ধরো, আর ডাক্তার তুমি ধরো পা দুটো। ধ্যাৎ, তোমাদের দ্বারা কিস্সু হবে না। আমাকেই সামলাতে হবে দেখছি। যেই না ওর হাত-পা একটু কায়দা করে ধরতে যাবো, একটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেয়ে ছিটকে পড়লাম। প্রচণ্ড ঝাঁকুনির দরুণ ঘুম ভেঙে গেলো ডঃ আর্মস্ট্রং-এর। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালেন আর্মস্ট্রং। স্বপ্নভঙ্গ হতেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন তিনি বিছানার ওপর।
তখন ঘরের মধ্যে লুটোপুটি খাচ্ছিলো ভোরের প্রথম আলো। তার এই আলোয় তিনি দেখতে পেলেন রগার্স দাঁড়িয়ে আছে তার শিয়রে। তার ফ্যাকাসে থমথমে, চোখের দৃষ্টি তার ঝাপসা, উৎকণ্ঠায় আবিষ্ট, একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা তাকে যেন কুরে কুরে খাচ্ছিল।
কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে বোধহয় কোথাও হিসেবে গরমিল হয়ে গেছে। সেটা পরের ভাবনা, পরে ভেবে দেখবো।
ব্যাপার কি বল-তোরগার্স। সাত সকালে তুমি এখানে কি মনে করে?
সর্বনাশ হয়ে গেছে স্যার, আমার স্ত্রীর ঘুম আর ভাঙ্গছে না। সকাল থেকে কতো ডাকাডাকি করলাম, কিন্তু সাড়া দেওয়ার নাম নেই।
সে কি। তাড়াতাড়ি উঠে পড়লেন আর্মস্ট্রং, ফিতে আটলেন ড্রেসিং গাউনের। তারপর রগার্সকে অনুসরণ করে দ্রুত পায়ে নেমে চললেন নিচে সিঁড়ি বেয়ে।
বাঁ দিকে কাত হয়ে শুয়েছিল মিসেস রগার্স? যন্ত্রণার লেশমাত্র ছিলো না তার মুখে। শান্ত হয়ে গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে আছে সে যেন, সকলের রোদে উদ্ভাসিত তার সুন্দর মুখখানি।
তার বরফ ঠাণ্ডা হাতখানি তুলে নিয়ে নাড়ি টিপলেন ডঃ আর্মস্ট্রং, স্পন্দহীন দেহ। সন্দেহ মুক্ত হওয়ার জন্য চোখের পাতা টেনে দেখলেন। তারপর তাকালেন রগার্সের মুখ-পানে তার চোখে চিন্তার ছাপ পড়ে।
তবে কি স্যার আমার ইথেল–?
হ্যাঁ, রগার্স, শান্ত সংযত স্বরে বললেন আমস্ট্রং, তোমার, স্ত্রী আর বেঁচে নেই, মৃত সে।
মারা গেছে? যেন নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে উঠলো রগার্স তাহলে কি ও হার্টফেল করে।
সব মৃত্যুই হার্টফেল করে হয়। আর তোমার স্ত্রীর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল মৃত্যুর আগে। কিন্তু কেন যে বন্ধ হল, সেটাই আমার কাছে বড় বিস্ময়। একটু থেমে আমস্ট্রং আবার মুখ খুললেন, আচ্ছা রগার্স তোমার স্ত্রীর স্বাস্থ্য কেমন যাচ্ছিল ইদানিং?
কেন, খুব ভালই তো ছিলো। তবে মাঝে মধ্যে হাঁপানির টানটা একটু বাড়লে কষ্ট পেতো। অবশ্য তার জন্য ডাক্তার ওষুধ করতে হয়নি কোনোদিন।
ঘুমের ওষুধ-টষুধ খাওয়ার কি অভ্যাস ছিলো তোমার স্ত্রীর?
না স্যার, ঐ যে বললাম, ওষুধ-টষুধ এমনিতেই খুব কম খেতো সে, আর ঘুমের ওষুধ তো একেবারেই নয়।
রগার্সের কথায় ঠিক বিশ্বাস হলে না আর্মস্ট্রং-এর, ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র নেড়ে-চেড়ে দেখলেন, কিন্তু কোথাও ঘুমের ওষুধের একটা খালি শিশি পর্যন্ত পেলেন না।
নিচু গলায় বললে রগার্স, জানেন ডাক্তারবাবু গতকাল রাতে আপনার সেই ওষুধ খাওয়ার পর আর কিছুই খায়নি ও, এমন কি একফেঁটা জল পর্যন্ত নয়।
সকাল নটার সময় প্রাতঃরাশের ঘণ্টা পড়লো। তার আগেই সকলের ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। জোড়ায় জোড়ায় গুল্প গুজবে মেতে উঠেছিল তারা। জেনারেল ম্যাকআর্থার এবং ওয়ারগ্রেভ প্রাসাদের উদ্যানে পায়চারি করতে করতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছিলেন।
ওদিকে ভেরা আর লম্বার্ড তখন প্রাসাদের পিছনের পাহাড়ের ওপর ওঠার চেষ্টা করছিল। একটা টিলার ওপর ওঠার মুখে ব্লোরের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো তাদের।
লঞ্চের আশায় সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বসেছিলেন ব্লোর। তাদের সঙ্গে দেখা হতেই নিরাশ হয়ে বললেন তিনি লঞ্চের কোনো পাত্তা নেই। তারপর আকাশ পানে তাকিয়ে তিনি আবার বললেন, নির্মেঘ আকাশ, আজও যথেষ্ট পরিষ্কার।
সে আর কতক্ষণ, কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো লম্বার্ড, বিকেলেই কালো মেঘে ছেয়ে যাবে আকাশ, ঝড় উঠবে দেখবেন।
ব্লোর বোধহয় কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু চুপ করে গেলেন প্রাসাদ থেকে ঘণ্টা বাজার শব্দ শুনে।
কব্জি-ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো লম্বার্ড নটা বাজে প্রাতঃরাশের ঘন্টা পড়লো। ভীষণ ক্ষিদে পেয়েছে, চলুন এবার, যাওয়া যাক প্রাসাদের দিকে।
পাহাড় বেঁকে নামতে গিয়ে ব্লোর মুখ খুললেন, মাস্টার্ন কেন যে আত্মহত্যা করতে গেলো, আমার মাথায় আসছে না। সারাটা রাত ধরে চিন্তা করার পরেও কেন জানি না আমি এর কোনো সমাধান খুঁজে পেলাম না।
ভেরা একা একা এগিয়ে গিয়েছিল। লম্বার্ড এবং ব্লোর হাঁটছিল পাশাপাশি। নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলো লম্বার্ড, আত্মহত্যা ছাড়া অন্য কিছু ভেবে দেখেছেন?
অন্য কিছু মানে কি হতে পারে, এ নিয়ে অনেক চিন্তা-ভাবনা করেছি বৈকি। যেমন-তেমন ছেলে নয়–এই মাস্টার্ন। ওর চলা-ফেরা-কথা-বার্তা শুনে আমার ধারণা, যথেষ্ট সম্মানিত ও পয়সাওয়ালা ঘরের ছেলে তো বটেই, পড়াশোনাও করেছে প্রচুর ও। এ হেন ছেলে আত্মহত্যা করতে যাবে কোন যুক্তিতে বলুন?
