এমনি একটা দিনের কথা মনে পড়ছে আজ। সেদিন চাঁদ উঠেছিল আকাশে। বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ির ওপর জ্যোৎস্নার আলো লুটোপুটি খাচ্ছিল। ভিজে বাতাসে জলের সোঁদা সোঁদা গন্ধ মাতাল করা হাওয়া। দুজনে পাশাপাশি হাঁটছিলাম হাতে হাত রেখে গায়ে না ঠেকিয়ে। মনে মনে ভাবছিলাম আমরা, আমাদের চলার পথ যদি শেষ না হয় কখনো। আর তখুনি হঠাৎ..হ্যাঁ, হঠাৎই তুমি একটা অদ্ভুত কাজ করে বসলে আমাদের পথে চলার সাময়িক বিরতি ঘটিয়ে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলে তুমি আমাকে। আমি মুখ তুলে তাকালাম তোমার চোখের দিকে, বুঝি…বা কোনো কিছুর প্রত্যাশার জন্য। তোমার চঞ্চল চোখ দুটি কি যেন বলার মধ্যে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল তখন। খানিক পরেই তোমার মুখখানি নেমে আসে আমার কানের কাছে, ফিসফিসিয়ে তুমি আমাকে শুধোলে, আমি, আমি তোমাকে ভালবাসি ভেরা
এরই জন্য কি আমি অপেক্ষা করছিলাম। তা না হলে তোমার সেই আবেগভরা কথাটা কেনই বা আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হবে? আবেগে চোখ বুজে এলো আমার। অস্ফুটে, বলেই ফেললাম, জানি, জানি গো সজনী, তোমার এই স্বপ্নের কথাটা শুনে আজ আমার রজনী যাবে ভাল।
কিন্তু ভেরা।
বেশ তো একটা আবেগ এনে দিয়েছিলে তুমি আমায়। তোমার মুখ থেকে আমার বাণী শুনে ভেবেছিলাম সজনী সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখবো আজ রজনীতে। লক্ষ্মীটি সেই স্বপ্নটা তুমি আমার ভেঙ্গে দিও না
আমার যে আরো কিছু বলার ছিল ভেরা, তুমি তখন বলে যাচ্ছিলে, হয়তো তোমার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে ভেরা, তোমাকে আর কোনদিনও বিয়ে করতে পারবো না। আমি এক কপর্দকশূন্য পুরুষ। মরিস মারা যাওয়ার পর তোমার মতো আমিও স্বপ্ন দেখতে শুরু করি–বিত্তবান হওয়ার একটা সুযোগ হয়েছিল আমার। এখন আর সেই সম্ভাবনাটা নেই। তার মৃত্যুর তিন মাস পরে জন্ম নিলো সিরিল। সিরিল ছেলে না হয়ে যদি মেয়ে হতো।
তোমার দুঃখটা আমি বুঝি, একটুও বাড়িয়ে বলোনি তুমি। সিরিল নামে এই শিশু ভাইপোটি তোমার সব স্বপ্ন, সব সম্ভাবনা ভেঙ্গে রেণু রেণু করে উড়িয়ে দেওয়ার জন্যই জন্ম নিয়েছে।
জন্মের মুহূর্ত থেকেই সিরিল রুগ্ন। তার শরীরে কোনো বাড়-বাড়ন্ত ছিলো না। হাত-পায়ের জোরও ছিলো না, অনেকটা জবুথবুর মতো। মরতে কেন যে জন্ম নিলো সে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে।
আমি সাঁতার কাটবো, তুমি আমাকে জলে নিয়ে চলল।
তুমি সাঁতার কাটবে এই রুগ্ন শরীরে, পঙ্গু হাত-পা নিয়ে? আর স্রোতের কি টান দেখবো?
আমি তোমার কোনো অজুহাত শুনবো না। তুমি আমাকে জলে নিয়ে চলো
বেচারা জানতো না যে, সেই জলের মধ্যেই ছিলো তার মৃত্যুর হাতছানি।
ঘুম আসছে না দেখে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো ভেরা। ফায়ারপ্লেসের তাকের ওপর রাখা শিশি থেকে তিনটে ঘুমের বড়ি বার করে ভেরা তার মুখে চালান করে দিলো। এবার নিশ্চয় ঘুম নেমে আসছে তার চোখে ভাবলো ভেরা। আর চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে পড়ার জন্য আট-দশটা ঘুমের বড়িই যথেষ্ট, আত্মহত্যা করার জন্য পটাসিয়াম সায়ানাইডের প্রয়োজন হবে না তার। মার্স্টানের মতো বোকা নয় সে। আজকের দিনে বিষ খেয়ে কেউ আত্মহত্যা করে না কি।
হঠাৎ দেওয়ালে টাঙ্গানো সেই কবিতাটির দিকে চোখ পড়ে গেলো ভেরার
দশটি কালোমানিক, দশটি কালো হীরে।
এক ঢোকে জল খেতে গিয়ে একজনের দম এল না আর ফিরে।
শিউরে উঠলো ভেরা, আতঙ্কের বিরাট শরীরটা। মুহূর্তে কুঁকড়ে যেন এতটুকু হয়ে গেলো। আচ্ছা মার্স্টানও তাতে। দম আটকেই মারা গেছে তাই না? আশ্চর্য। কবিতাটির
কিন্তু আত্মহত্যাই বা করতে গেলে সে কোন দুঃখে? না, না, এত কষ্ট পেলেও আমি কখনোই আত্মহত্যা করতে পারবো না। আমার এ-জীবনের অনেক দাম। আর সবাই মরুকগে, আমি কিন্তু বাঁচতে চাই, আমি ঠিক বেঁচে থাকবো, বাঁচার জন্যই তো এই জীবন,
.
০৬.
ডঃ আর্মস্ট্রংকে ঘুমের জন্য খুব একটা আরাধনা করতে হলো না। একটু পরেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন তিনি।
একটা বিরাট অপারেশন থিয়েটার…হাত দুখানা অবশ হয়ে আসছে, যে কোনো মুহূর্তে ছুরিটা খসে পড়তে পারে হাতের মুঠো থেকে। তীব্র আলোয় চিকমিক করে উঠলো ইস্পাতের ফলাটা। রোগীর অপারেশনের কথা ভুলে গিয়ে তিনি এখন ভাবছেন, এমন একটা ধারালো ছুরি হাতে পেলে কাউকে খুন করতে একটুও অসুবিধে হবে না।
খুন। হ্যাঁ খুন তাতে। আমি আগেই করে ফেলেছি। ঐ তো মেয়েটির স্পন্দনহীন দেহখানি পড়ে রয়েছে অপারেশন টেবিলের ওপর। সঙ্গে কাপড়ে ঢাকা রয়েছে তার মুখ। কিন্তু কাকেই বা আমি খুন করেছি? কে, কে ঐ মেয়েটি, লর্সকে একবার জিজ্ঞেস করবো? কিন্তু কেমন যেন সন্দেহের চোখে তাকিয়ে আছে সে আমার দিকে। তবে কি ও কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরেছে…মেয়েটিকে আমি খুন করেছি?
আর মুখটাই বা ঢাকলো কে? খোলা থাকলে চিনতে পারতাম, আমি কার ঘাতক। কি যে সব অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা ঘটিয়ে ফেললাম।
আমার মনের ভাবনাটা বুঝি টের পেয়ে থাকবে ছোকরা ডাক্তারটি। ধীরে ধীরে মৃত মেয়েটির মুখের ওপর থেকে কেমন সরিয়ে দিচ্ছে চাদরটা, সম্পূর্ণ করে সরিয়ে দিতেই চমকে উঠলাম, একি। আরে এ যে দেখছি আমাদের এমিলি ব্রেন্ট? উঃ কি বীভৎস চেহারা হয়েছে ওঁর মুখের। দুচোখ দিয়ে ঠিকরে পড়ছে গনগনে আগুন। কিন্তু উনি তো এখনো মরেননি, হা হা ঐ তো ঠোঁট নাড়ছেন, উনি কি যেন বলতে চাইছেন-আমরা এসে দাঁড়িয়েছি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে, নাহি ভয়, নাহি ভয়–অভয় বাণী শুনিয়ে আবার হাসছেন উনি, এক চিলতে। ভয়ঙ্কর বিদ্রূপ মাখানো সেই হাসি। অসহ্য। নমি, ইথারের শিশিটা আমার হাতে তুলে দাও, ওঁকে ঘুম পাড়াতে হবে। জাগ্রত অবস্থায় কেউ কাউকে খতম করতে পারে নাকি।
