রিচমণ্ডের মৃত্যুর ব্যাপারে কেউ মাথা ঘাটালো না, কারণ তারা বেশ ভাল করেই জানতো, যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে জীবিত অবস্থা ফেরার সম্ভাবনা খুব কমই থাকে। বেশ নিশ্চিন্তে কটা দিন কাটলো। একদিন কাজকর্ম সেরে তাবুতে ফিরছি, পথে আর্মিটেজের সঙ্গে হঠাৎ দেখা। যেচে তার সঙ্গে কথা বলতে গেলাম, কিন্তু মুখ ফিরিয়ে নিলো সে। বেশ বুঝতে পারলাম, তার চোখ দিয়ে মুঠো মুঠো ঘৃণা ঝরে পড়ছিলো। ভাবলাম, রিচমণ্ডের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলো সে মনে হয় রিচমকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর উদ্দেশ্যটা। সে অনুমান করতে পেরেছে। আর তাতেই তার রাগ ও ঘৃণা আমার ওপর। কিন্তু যাই বুঝে থাক না কেন, তাতে আমার কিছু এসে যায় না। যেমন ভাবেই তুমি লোককে বোঝাও না কেন, আমার চালাকিটা কেউ ধরতে পারবে না ধরার সাধ্যও নেই কারোর। যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে যে কেউ মারা তো যেতেই পারে? কে পাঠিয়েছে কেন পাঠিয়েছে, তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাতে যাবে না।
একদিন ফিরে এলাম ইংলণ্ডে। লেসলি সব শুনে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। তার সেই কান্না দেখে আমার গা-পিত্তি জ্বলে যেতে লাগলো তাকে মুখে কিছু প্রকাশ করলাম না। বজ্জাত মেয়েছেলেটাকে প্রাণে আঘাত না করে তাকে মারবো। তাকে তিলে তিলে দগ্ধে মারবো।
কিন্তু পনের বছর পরে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আর্মিটেজ কি তার সন্দেহের কথা কারোর কাছে প্রকাশ করে দিলো? আর বললেই বা কি এসে যায়। এতদিন পরে তখন কে আবার তা নিয়ে জল ঘোলা করতে উঠে পড়ে লাগলো?
বছর তিন পরে লেসলি মারা যায় ডবল নিউমোনিয়ায়। তার চিকিৎসার ত্রুটি আমি করিনি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে চলে আসি ডিভনে। ছোট খাটো একটা বাড়ি কিনলাম। তার আগেই স্বেচ্ছায় চাকরী থেকে অবসর নিয়েছিলাম। বেশ সুখেই কাটছিল আমার দিনগুলি। বছর তিনেক পরে হঠাৎ একদিন লক্ষ্য করলাম, প্রতিবেশীরা কেউ আর আমার সঙ্গে কথা বলছে না, তবে কি আর্মিটেজ তার সেই সন্দেহের কথাটা এদের জানিয়ে গেলো, আর তাতেই কি তাদের এই অকস্মিক পরিবর্তন। যাই বলুক, তাতে আমার ভারী বয়ে গেলো, আমার সঙ্গে কে কথা বললো না বললো তো বয়েই গেলো, একা একা বেশ আছি আমি।
তা-এই দ্বীপে এসেও ভেবেছিলাম, বেশ সুখেই কাটবে কটা দিন। ভেবেছিলাম পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে হৈ-চৈ করে কটা দিন আনন্দ মুখর হয়ে উঠবে। কিন্তু মাঝখান থেকে সেই অদৃশ্য কণ্ঠস্বরটা। সব ভণ্ডুল করে দিয়ে গেলো। তা জবাবের মতো একটা মোক্ষম জবাব দিয়েছি বটে। ওসব ঘেঁদো অভিযোগ তোলা হয়েছে, আমার মতো তারা কেউ দোষী নয়। সব বাজে কথা, সব ধাপ্পা, স্রেফ ধাপ্পা। অতিথিদের নিয়ন্ত্রণ করে নিয়ে এসে তাদের সঙ্গে এ কি রসিকতা বাপু। আর এ সব বড়লোকী চাল ছাড়া আর কিছু নয়। বাজে ধাপ্পা দিয়ে সৎ মানুষগুলোকে অস্বস্তির মধ্যে ঝুলিয়ে রেখে মিঃ ওয়েন হয়তো আড়াল থেকে মজা দেখতে চাইছেন। এই আর কি।
আরে এই দ্বীপের মানুষগুলোও যেন কেমন। কেউ কারোর সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলতে চায় না, মিশতে চায় না। কথা না বললো তো বয়েই গেলো আমার। একা একা করে। মাত্র একদিনেই যেন মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে রয়েছি এই দ্বীপে…তা আমরা যেন কবে ফিরবো? হ্যাঁ আগামীকালই তো ফ্রেড নারীকটের লঞ্চ এলেই সবার আগে গিয়ে, আমি উঠে বসবো তার লঞ্চে। আর অন্যেরা যা খুশি করুক আমি ফিরেও তাকাতে যাব না কারোর দিকে।
কিন্তু এ-দ্বীপ ছেড়ে চলে না গেলে কেমন হয়। মন্দ হয় না। এমন একটা নির্জন দ্বীপে লোকালয়ের থেকে অনেক দূরে দিনগুলো বেশ ভালই কাটবে বলে মনে হয়। শহরের স্বার্থান্বেষী মানুষগুলোর ভীড়ে জীবনটা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে, তাদের মধ্যে আবার ফিরে যেতে ভাল লাগে না।
খোলা জানালা পথে ভেসে আসছে সমুদ্রের গর্জন। এখানকার আকাশ কেমন নির্ভাবনাময় আকাশের কেমন সংসার নেই, নেই চিন্তা-ভাবনা। আকাশের মতো হতে ইচ্ছে হয়। দূরের ঐ পাহাড়, সমুদ্র অরণ্য, এই প্রাসাদ সব কিছুই থাকবে আমার হাতের মুঠোর মধ্যে। হ্যাঁ এই দ্বীপেই থেকে যেতে চাই আমি চিরদিনের জন্য, এখানে থেকেই আমি আমাদের পরিণতি দেখে যেতে চাই নিজের চোখে।
ভেরার চোখ থেকেও ঘুম যেন আজ নির্বাসন নিয়েছে। অন্ধকার যেন তাকে গিলতে আসে, তাই ঘরের আলো জ্বেলে রেখেছিল সে।
একা হলেই মন চলে যায় তার সুদুর অতীতে। বিশেষ করে আজ স্মৃতির পাতা উল্টাতে গিয়ে বারবার একটা মুখ তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে–সেই মুখখানি হুগোর
হুগো, আমার প্রিয়তম, তুমি আজ কোথায়? কত দিন দেখিনি তোমায়। আজই এই মুহূর্তে তোমাকে বেশী করে মনে পড়ছে কেন বলো তো। কাছে নেই তবু যেন তুমি আমার পাশটিতেই আছে, জড়িয়ে আছে আমার বুকের মধ্যে।
কর্ণওয়ালা। মনে পড়ে তোমার কর্ণওয়ালের সেই ভাললাগা দিনগুলির কতা? সেই মধুর দিনগুলি কি ভোলা যায়।
আকাশ ছোঁয়া পাহাড়, পাহাড়ের পাশেই ধু-ধু বালিয়াড়ি, সামনে অথৈ জল জলের কলকল শব্দ, মিসেস হ্যামিল্টন, আর সিরিল…
আধো আধো স্বর আবদার করতে সিরিল জলে সাঁতার কাটবার জন্য। তোমার ইচ্ছে নয় যে, ওর সেই আবদারে সাড়া দিই। তোমার চোখে চোখ পড়তেই তুমি মাথা নাড়তে। আমি যেন ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে ঘুম পাড়াতাম সিরিলকে। ঘুমিয়ে পড়তো ও। তারপর বেরিয়ে পড়তাম তোমার সঙ্গে বেড়াতে।
