তবে যার শেষ ভাল, তার সব ভাল বলে একটা প্রবাদ আছে। সেটা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেলে শেষ পর্যন্ত। রায় দেওয়ার সময় চমকে দিলাম সকলকে। আসামীর বিরুদ্ধে একটা মোক্ষম অস্ত্র হানলাম। আর তাতেই আসামী পক্ষের উকিল এবং সিটনের সমর্থক জুরীরা ও সরকারপক্ষের উকিল সবাই ধরাশায়ী। তাদের সেই দুরাবস্থা দেখে নিজের মনে বললাম, আরে বাবা আমি হলাম গিয়ে অতি বিচক্ষণ বিচারপতি আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কি কোনো দাম নেই। আমাকে ফাঁকি দিতে পারবে না কেউ। কেমন, এবার সবাই জব্দ তো…
বাঁধানো দাঁতের সেটটা খুলে ফেলে গ্লাসের জলে ধীরে ধীরে ডুবিয়ে রাখলেন ওয়ারগ্রেভ। এই মুহূর্তে তার দন্তহীন মুখটা ভয়ঙ্কর বিশ্রী একটা আকার ধারণ করলো, ঠোঁট দুটো ঝুলে পড়লো সামনের দিকে, তোবড়ানো গাল কুঁচকে যাওয়া চোয়াল, ঝুলে পড়া থুতনী সব মলে একটা বীভৎস রূপ যেন বিশীর্ণ মুখ। সেই কুৎসিত মুখে অতি কঠিন, অতি নির্মম, অতি নিষ্ঠুর হাসির একটা সুক্ষ্ম রেখা ফুটে উঠতে দেখা গেলো। আর সেই সঙ্গে চোখ দুটো জ্বলে উঠলো ক্ষুধার্ত জানোয়ারের মতো। তার মুখে চিন্তার ছাপ পড়লো কয়েক মুহূর্তের জন্য এবং তারপরেই ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লেন তিনি।
ঠিক সেই মুহূর্তে নিচের তলায় রান্নাঘরে জমে উঠেছিল এক মুকাভিনয়ের নাটক। অভিনেতা নজন আর দর্শক মাত্র একজন রগার্স।
তাজ্জব ব্যাপার তো? এই খানিক আগে কাঁচের আলমারিতে দেখে গেলাম দশজন মুকাভিনেতা অর্থাৎ মোট দশ দশটি পুতুল। আর এখন তাদের মধ্যে একটি উধাও। রইলো এখন নটা।একটি পুতুল গেলো কোথায়? ডান গজালো নাকি তার।
ওদিকে ম্যাকআর্থারের চোখে ঘুম নেই। ঘুম আজ আর আসবে না বোধহয়। তার মন এখন আচ্ছন্ন আর্থার রিচমকে ঘিরে। অনিন্দ্যসুন্দর এক যুবক। মনে পড়ে যায় তার উচ্ছ্বাসে ভরপুর যৌবনের কথা। সত্যি ভাললাগার মতোই চেহারা ছিলো ছোকরার। তাকে দেখে আমার স্ত্রীর মাথা ঘুরে গেলো, তার হাবভাব দেখে আমার অন্তত সেইরকমই মনে হয়েছিল।
এক ছুটিতে জিদ ধরলো রিচমণ্ড আমার বাড়িতে যাবে। অগত্যা সঙ্গে করে নিয়ে এলাম তাকে। প্রথমে আমার আপত্তি ছিলো কে জানে নেসলির যদি পছন্দ না হয় তাকে। যাই হোক রিচমণ্ডকে তার মনে ধরতে দেখে আমার দুশ্চিন্তার অবসান ঘটলো।
তা রিচমণ্ডকে আদর আপ্যায়নের সেকি ঘটা নেসলির। ছুটির কটা দিন রিচমণ্ডকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে লেসলি, একটা মুহূর্তের জন্যও তার সঙ্গ ছাড়েনি সে। হাসি-ঠাট্টা-গল্প মশগুলে কেটেছে রিচমণ্ডকে নিয়ে। অনেকদিন পরে লেসলির মুখে হাসি ফুটে উঠতে দেখে আমার দুচোখ জুড়িয়ে গেছে। সন্তানহীনা লেসলি যেন এতোদিনে মাতৃত্বের স্বাদ পেয়েছে রিচমণ্ডকে দুহাতে বুকে জড়িয়ে ধরে।
মাতৃস্নেহ কথাটা এখন ভাবলে গা ঘিনঘিন করে উঠে। ছিঃ ছিঃ আমি তখন কি বোকাই না ছিলাম। একবারও বুঝতে পারিনি মায়ের আদরের নামে যে রিচমণ্ডকে বুকে জড়িয়ে ধরার পিছনে লেসলির ছেনালিপনার তাগিদ ছিলো, দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে চেয়েছিল সে।
অথচ এই লেসলিকে আমি কতোই না ভালবাসতাম, বিশ্বাস করতাম তাকে আমার পতিব্রতা স্ত্রী হিসেবে। বিদেশে যেখানেই থাকতাম শয়নে-স্বপনে তার কথা ছাড়া অন্য কোন নারীর কথা ভাবতে পারতাম না। সে ছিলো আমার প্রথম এবং শেষ প্রেম। কিন্তু আমার সেই ভুল ভাঙ্গতে বেশী দেরি হল না।
আমি তখন বিদেশে আমার কর্মক্ষেত্রে। একদিন লেসলি চিঠি লিখলো আমাকে ও রিচমণ্ডকে দুজনকেই। আমার নাম লেখা খামটা জামার ভেতরের চোরা পকেটে পুরে চুপিচুপি এসে ঢুকলাম আমার তাবুতে।
সযত্নে খামের মুখ খুলে চিঠিটা বার করে পড়তে গিয়ে প্রমেই হোঁচট খেলাম। চিঠিটা আমার নয়, রিচমণ্ডকে লেখা। খাপে ভরবার সময় ভুল করে চিঠি অদল-বদল হয়ে থাকবে হয়তো। ওঃ কি মধুর একটা সম্ভাষণ, অমন একটা গভীর অনুরাগপূর্ণ সম্ভাষণ দিয়ে আমাকে কখনো চিঠি লেখেনি লেসলি। আর ভাষারই বা কি ব্যঞ্জনা। চিঠির প্রতিটি লাইনে প্রেমের ছড়াছড়ি। চিঠি তো নয়, যেন একটা প্রেমের কবিতা। লেসলির প্রেমের কবিতা পড়তে গিয়ে রাগে দুঃখে আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে থাকলো। বুকের পাঁজরগুলো এক এক করে ভেঙ্গে যেতে থাকলো যেন। একটা বোবা কান্নায় বুকটা আমার হাহাকার করে উঠলো। এরই নাম প্রেম। এরই নাম জীবন। যাকে আমি বিশ্বাস করে আমার প্রাণের চেয়ে বেশী ভালবেসে এসেছি সেই কি না আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলো, চরম আঘাত দিলো আমার নিঃস্বার্থ প্রেমের ওপর। জীবনটাই যেন একটা বিরাট ফকি। মানুষের ছদ্মবেশে কতকগুলো জানোয়ার যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে। ওৎ পেতে বসে আছে। রক্ত-পিপাসু পশুর মতো, সুযোগ পেলেই যেন তারা মানুষের সৎ ইচ্ছে, সৎ প্রবৃত্ত গুলোকে পদদলিত করে একেবারে নষ্ট করে দেবে।
যেমন করলো লেসলি। আর এই দ্বিচারিণী, বিশ্বাসঘাতিনীকে আমি আমার স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে এসেছি এতোদিন ধরে? ভাবতেও ঘৃণা হয়। কি করবো আমি এখন আমার সামনে এখন একটাই পথ খোলা আছে–প্রতিশোধ, তাদের দুজনের বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত আমি যেন স্বস্তি পাচ্ছিলাম না তখন।
তা সুযোগটা এসে গেলো কদিন পরেই। যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে একজনকে পরীক্ষা করে দেখে আসতে হবে। এসব ব্যাপারে একজন সাধারণ সৈনিকই যথেষ্ট। কিন্তু তা না করে রিচমণ্ডকেই পাঠাবার ব্যবস্থা করলাম। এখানে কাজটা গৌণ গৌণ নয়, আমার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিলো রিচমকে যে ভাবেই হোক একেবারে যুদ্ধক্ষেত্রে কোনরকমে পাঠাতে পারলে হয়, তাহলে চিরদিনের জন্য তার বিশ্বাসঘাতকতার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যেতে পারে। সেই সঙ্গে দ্বিচারিণী লেসলির ওপরেও চরম আঘাত হানা যেতে পারে, তার হাত দিয়ে রিচমণ্ডের উদ্দেশ্যে প্রেমের কবিতা আর কখনো বেরুবে না। এবং হোও তাই, অন্যদের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে তার ফেরা আর হলো না। সে তার প্রেমিকা লেসলিকে ভালবাসতে আর কখনো ফিরে আসবে না। কদিন পরে শত্রুপক্ষের গুলিতে তার নিহত হওয়ার দুঃসংবাদ এসে পৌঁছালো। হ্যাঁ, এইরকমই তো আমি চেয়েছিলাম। খবরটা পেয়ে আমার কোন দুঃখ হলো না বরং মনটা অনেকটা হাল্কা হয়ে গেলো।
