তার মুখের ভাব বদলে যাওয়াতে ছজোড়া চোখ চিন্তাক্লিষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছু একটা শোনার জন্যে।
আপনারা যা ভাবছেন ঠিক তা নয়, মার্স্টানের মৃত্যু দম আটকে গিয়ে হয়নি। শুধু তাইনয়, তার মৃত্যু একেবারে স্বাভাবিক নয়।
সে কি? চমকে উঠলো ভেরা তার মানে আপনি বলতে চান ঐ হুইস্কিতে–
হ্যাঁ, ঠিক তাই, হুইস্কিতেই ছিলো তার মৃত্যুর পরওয়ানা। জোর দিয়ে বলতে না পারলেও তবু বলছি সম্ভবত পটাসিয়াম সায়ানাইডের প্রতিক্রিয়াতেই, তার মৃত্যু ঘটে থাকবে।
পটাসিয়াম সায়ানাইড? এই প্রথম কথা বললেন ওয়ারগ্রেভ। তার হুইস্কির সঙ্গে মেশানো ছিল।
তাহলে কি ধরে নিতে হবে, এবার লম্বার্ড জানতে চাইলো, মার্স্টান যখন নিজেই সকলের ড্রিঙ্কস্ পরিবেশন করেছিল, সে নিশ্চয়ই নিজে তার গ্লাসে বিষ মিশিয়ে থাকবে। তাই কি?
যুক্তিটা ঠিক গ্রহণযোগ্য না হলেও কতকটা দায়সারা গোছের ঘাড় নাড়লেন ডঃ আর্মস্ট্রং আপাতঃ দৃষ্টিতে সেই রকম তো মনে হচ্ছে।
তবে কি এটা আত্মহত্যা? মৃত মার্স্টানের দিকে চকিতে একবার তাকিয়ে চোখ ফেরালেন, ব্লোর তাজ্জব ব্যাপার তো।
না, না উনি আত্মহত্যা করতে যাবেন কেন, অমন হাসিখুশিতে ভরা সুন্দর যুবক শুধু শুধু নিজেকে শেষ করতে যাবে কোন্ দুঃখে? প্রতিবাদ করে উঠলো ভেরা।
ভেরার কথাটা যেন লুফে নিলেন ডঃ আর্মস্ট্রং তাহলে আপনারাই বলুন আত্মহত্যা ছাড়া আর হঠাৎ এভাবে মৃত্যুর পিছনে অন্য আর কিসের সম্ভাবনাই বা থাকতে পারে?
অন্য আর কিই বা সম্ভাবনা থাকতে পারে? ভাবতে পারছে না কেউ। আর ভাববেই বা কি করে? একই বোতলের হুইস্কি থেকে তো আমরা সবাই খেয়েছি। তাছাড়া নিজের হাতে সকলকে মদ পরিবেশন করছিল। অতএব এর থেকেই ধরে নেওয়া যেতে পারে এটা একটা আত্মহত্যা ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।
কিন্তু এর পরেও একটা প্রশ্ন থেকে যায়, কেনই বা সে আত্মহত্যা করতে যাবে?
আমারও হিসাব মিলছে না, আর্মস্ট্রং-এর উদ্দেশে বললেন ব্লোর, ডঃ আর্মস্ট্রং আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মার্স্টানের আত্মহত্যা করার কথা চিন্তাই করা যায় না।
এ প্রশ্নটা তখন থেকে আমকেও যথেষ্ট ভাবিয়ে তুলেছে তাকে সমর্থন করে বললেন আর্মস্ট্রং কিন্তু সঠিক উত্তরটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না।
আর্মস্ট্রং এবং লম্বার্ড দুজনে ধরাধরি করে মার্স্টানের মৃতদেহ রেখে এল তার ঘরে। তার মৃতদেহ সাদা চাদরের ঢেকে ফিরে এলো একতলায় তারা। বসবার ঘরে সকলে তখন স্তব্ধ হয়ে বসেছিলেন, ভয়ে আতঙ্কে কেউ কারোর দিকে তাকাতে সাহস পাচ্ছিলো না।
ওদিকে রাতও তখন বেড়ে চলেছে। দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে এমিলিই প্রথম কথাটা তুললেন, রাত অনেক হলো এবার শুয়ে পড়া উচিত।
এমিলিকে সমর্থন করলেন ওয়ারগ্রেভ, তা যা বলেছেন, এরপর বসে থাকার কোনো মানে হয় না।
রগার্সের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন আর্মস্ট্রং তা তোমার স্ত্রী এখন ভাল আছে তো রগার্ল?
হ্যাঁ, বেশ ভালই আছে স্যার। অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
বেশ তো ঘুমোক না। রাতে আর জাগিও না।
ঠিক আছে স্যার তাই হবে। রগার্স বলে, আপনারা শুয়ে পড়লে ফটক বন্ধ করে আমিও শুতে চলে যাবো। রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায় রগার্স। আর তারা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন যে যার ঘরে যাওয়ার জন্য।
এতোবড়ো প্রাসাদের আনাচে কানাচে কোথাও এতটুকু অন্ধকারের চিহ্নমাত্র দেখা গেলোনা, চারিদিক আলো আলোকিত প্রাসাদ। কেউ যে কোথাও গা ঢাকা দিয়ে থাকবে, সেরকম অন্ধকারের অবকাশ ছিলো না কোথাও। আর এই আলোয় আধিক্যটাই হয়েছে সব চেয়ে বেশী আতঙ্কের, ভয়ের কারণ। অন্ধকারে বিপদ আছে বটে, তবে আলোয় মৃত্যুর হাতছানি যে আরো বেশী ভয়ঙ্কর….
শুভরাত্রি জানিয়ে যে যার ঘরে প্রবেশ করে চটপট দরজা বন্ধ করে দিলো এমনভাবে যেন বাইরের আলোটা তাদের তাড়া করে ফিরছিলো।
শোয়ার উদ্যোগ করতে গিয়ে একের পর এক স্মৃতি মনে পড়তে থাকলো ওয়ারগ্রেভের মনে….
সিটন-এডওয়ার্ড সিটন। তার সুন্দর মুখখানি যেন তার চোখের সামনে ভাসছে এখনো। মাথা ভর্তি চুল। নীল চোখ, মায়াবী দৃষ্টি, অমন একটা আকর্ষণীয় চেহারা কি ভোলা যায় সহজে। একবার দেখলেই মজে যেতে হয়। তা মজে ছিল জুরীরাও তার চেহারায়–অমন সুন্দর চেহারার মানুষের কোনো অন্যায় যেন অন্যায়ই নয়, জুরীদের মনে এই কথাটাই যেন গেঁথে গিয়েছিল।
আর সরকার পক্ষের উকিল নিলিনও কি কমতি ছিলো, তাকে বাঁচানোর জন্য উঠে পড়ে লেগে পড়েছিল সে। তাছাড়া তার উকিল ম্যাথিও সেই সুযোগে তার মক্কেলের সমর্থনে যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিল। সাওয়াল-জবাবের সময় আগাগোড়া মাথা ঠাণ্ডা রেখে সব সময় তার বক্তব্যের মধ্যে একটা করুণ আবেদনের ছাপ রেখে গিয়েছিল। ফলে যা হওয়ার তাই হলো, জুরীদের মন গেলো গলে। সিটনের নির্দেশিত উপলব্ধি করতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ রইলো না তাদের মনে।
আবার তখন কি চিন্তা। জুরীরা বেঁকে বসলে আসামীর বিরুদ্ধে রায় দেবে কি করে? তাই প্রতিটি জেরা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শুনে নোট লিখতে হলো আমাকে। প্রয়োজনীয় নথিপত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হলে আমাকে। তবু জুরীরা আমাকে দারুণ ভাবিয়ে তুললো, মামলা বুঝি কেঁচিয়ে গেলো, তীরে এসে আমার তরী বুঝি ডুবে গেল।
