আর্মস্ট্রং-এর পর বাকী রইলেন কেবল একজন। তিনি হলেন মিস্ এমিলি ব্লেন্ট। সকলের দৃষ্টি গিয়ে পড়লো তার ওপরে তখন। ব্যাপারটা টের পেয়ে নিজের থেকেই জানতে চাইলেন মিস্ ব্লেন্ট মনে হচ্ছে, আপনারা কিছু জানতে চান আমার কাছ থেকে। কিন্তু আপনাদের নিরাশ হতে হবে। আমার বলার কিছুই নেই।
সে কি বলার কিছুই নেই। ওয়ারগ্রেভের চোখে বিস্ময়। তার মানে আত্মপক্ষ সমর্থনের মতো কিছুই নেই আপনার।
আমার কথার ভুল ব্যাখ্যা করবে না। যে অভিযোগ আমি বিশ্বাস করি না, তা নিয়ে, অযথা মাথা ঘামাতে চাই না। আমি বিশ্বাস করি, অমি নিরাপরাধ, তাই নিজেকে অহেতুক বিব্রত করতে চাই না।
তা বেশ অগত্যা ওয়ারগ্রেভ বললেন, তদন্তের দ্বিতীয় পর্যায়-এর পরিসমাপ্তি এখানেই। তবে তার আগে আরো কিছু আলোচনা দরকার। রগার্সের দিকে ফিরে বললেন তিনি আচ্ছা রগার্স, আমরা ছাড়া অন্য আর কেউ আছেন এই দ্বীপে?
না স্যার।
কিন্তু আশ্চার্য। এখন ভাগ্যের হাতে সঁপে দিতে হবে নিজেদেরকে। মিঃ ওয়েনের মতলবের কথা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তবে তিনি যে ঠিক প্রকৃতিস্থ নন, এ-ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এ অবস্থায় আমি বলি, কি, আজ রাতের মধ্যেই এ-দ্বীপ ছেড়ে আমাদের সকলকেই চলে যাওয়া উচিৎ।
কিন্তু যাবেন কি করে স্যার? দ্বীপে নৌকা-টোকা তো কিছু নেই।
তাহলে ওপারের সঙ্গে তোমরা যোগাযোগই বা করো কিভাবে?
ফ্রেড নারাকট রোজ সকালে আসেন, দিনের খাবার-দাবার চিঠিপত্র প্রতিদিন দিয়ে যায় সে। আর আমাদের কোন কিছুর প্রয়োজন থাকলে জানিয়ে দিই তাকে।
ঠিক আছে, আর রাতটুকু কোন রকমে কাটিয়ে দিয়ে কাল সকালে নারীকটের লঞ্চ এলে আমরা সকলেই ফিরে যাবো এখান থেকে। বলুন আপনাদের কি মত? সকলের মুখের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন ওয়ারগ্রেভ।
প্রায় সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো কেবল মার্স্টান ছাড়া। উঠে দাঁড়িয়ে সে তারা দ্বীপে থেকে যাওয়ার স্বপক্ষে বললো, এখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার কোন যুক্তি নেই। সকলের বিরুদ্ধে যা সব অভিযোগ শুনলাম, বেশ রোমাঞ্চকর গোয়েন্দা কাহিনীর মতো এর রহস্য উন্মোচন না হওয়া পর্যন্ত আমি এখান থেকে এক পাও নড়ছি না।
অবাক করা সকলের দৃষ্টি গিয়ে পড়লো মার্স্টানের মুখের ওপর। তাতে তার কোনো হৃক্ষেপ নেই। তার ঠোঁটে এক অদ্ভুত রহস্যময় হাসি। তেমনি হাসতে হাসতে বললো সে, দেখুন ওসব পুণ্যটুন্যর কথা আমি একেবারেই বিশ্বাস করি না, ওসব বুজরুকি। আমার মোদ্দা কথা হলো পান ছাড়া অন্য কোনো শব্দ আমার জানা নেই। আমি এখানে চুটিয়ে পান করতে এসেছি। তাই পানের শেষ না দেখা দেখা পর্যন্ত আমি এই পৃথিবী থেকে নড়ছি না।
জেদী মনোভাব নিয়ে হাত বাড়িয়ে সে তার জন্য নির্দিষ্ট পানীয়ের গ্লাসটা তুলে নিলো এক চুমুকে সব পানীয়টুকু নিঃশ্বেস করে বসে পড়লো বললে একটা ভাল বলা হবে, তারপরের ঘটনা অতি সংক্ষিপ্ত। অমন জেদী সাদা উৎফুল্ল মার্স্টানের মুখটা হঠাৎ কেমন সাদা ফ্যাকাসে দেখালো, চোখের মণি দুটো ঠিকরে বেরিয়ে এলো। নিঃশ্বাসে ভীষণ কষ্ট, দম নেবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেও পারলো না সে। তার হাতটা অসম্ভব কাঁপছিল, গ্লাসটা হাত থেকে পড়ে গেলো মেঝের ওপর। আর তারপরেই তার ভারী দেহটা চেয়ার থেকে পড়ে গেলো মেঝের ওপর, পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে সচকিত দৃষ্টিতে সকলে তাকালো তার দিকে, সকলের চোখে তখন একটা ভয়ঙ্কর আতঙ্ক।
০৫. সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাটা
০৫.
যেন চোখের পলক পড়তে না পড়তেই ঘটে গেলো সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাটা। সকলের চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ, সকলের দৃষ্টি এখন স্থির-নিবদ্ধ মার্স্টানের প্রাণহীন দেহের দিকে। কারোর মুখে কথা নেই। কিন্তু সকলের মনে একটাই প্রহ্ন কেবল কিভাবে তার মৃত্যু হলো।
ডঃ আর্মস্ট্রংই প্রথম বিস্ময়ের ঘোরটা কাটিয়ে উঠে দ্রুত ছুটে গিয়ে মার্স্টানের স্পন্দনহীন ডান হাতখানি তুলে নিয়ে নাড়ি টিপে ধরলেন। না, কোনো সাড়া নেই। স্তব্ধ নিঃসাড়।
মাথা নাড়লেন তিনি গভীর দুঃখের সঙ্গে, মার্স্টান মৃত।
আরেক দফা সাত-জোড়া চোখের দৃষ্টি গিয়ে পড়লো মার্স্টানের দিকে। তারা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না, অমন তরতাজা, হাসিখুশিতে প্রাণোচ্ছল যুবক হঠাৎ কি করে মারা যেতে পারে। বোধহয় ডঃ আর্মস্ট্রং-এর হিসেবে কোথাও ভুল হয়ে থাকবে। তাদের ধারণা মার্স্টান মরেনি বেঁচে আছে সে এখনো।
ডাঃ আর্মস্ট্রং আর একবার ভাল করে পরীক্ষা করলেন মার্স্টানকে চোখের পাতা উল্টিয়ে দেখলেন, তার ঠোঁটে নীল রঙের দেখতে পেয়ে কি মনে করে ঈষৎ ফাঁক হয়ে থাকা তার মুখের কাছ থেকে নিয়ে গিয়ে কিসের যেন ঘ্রাণ নিলেন। সব শেষে তার মদের গ্লাসের একটা ভাঙ্গা টুকরো কাঁচ তুলে নিলেন নিজের হাতে তিনি।
তবে কি মার্স্টান দম আটকে মারা গেছে? একটু ইতস্ততঃ করে জিজ্ঞেস করলো ম্যাকআর্থার।
দম আটকে মারা গেছে কি না জানি না, উত্তরে আর্মস্ট্রং বলে মনে হয় হঠাৎ তার নাড়ির স্পন্দন স্তব্ধ হয়ে যাওয়ায় মৃত্যু দ্রুত এগিয়ে এসেছিল। তারপর তিনি কি মনে করে সেই গ্লাসের গায়ে লেগে থাকা অবশিষ্ট তরল পদার্থের এক ফোঁটা হাতে আঙুলে নিয়ে অতি সন্তপর্ণে জিভে ঠেকালেন। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখের ভাব বদলে গেলো।
