তার মানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন ম্যাকআর্থার, সজ্ঞানে আপনি তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে পালিয়ে এলেন?
আপনার যদি তাই মনে হয়, আমি নাচার। নিজেই নিজেকে সমর্থন করলো লম্বার্ড, জানেন তো, আত্মরক্ষার অধিকার সকলেরই থাকে। তাছাড়া আমাদের মতো মরণে ওদের ভয় নেই, আর তাতেই ওরা বেঁচে যায় কি বলেন? বলে হো হো করে হেসে উঠলো সে।
আঁতকে উঠলো ভেরা জেনে শুনে এমন একটা অন্যায় কাজ আপনি করতে পারলেন?
হুঁ, না পারার কি আছে, পাল্টা প্রশ্ন করলো লম্বার্ড।
আর আমার কি দোষ থাকতে পারে বলুন এবার, কৈফিয়ত দিতে এগিয়ে এলো অ্যান্টনি মার্স্টান। জন কোম্ব আর লুসি কোম্বস্ খেলছিল রাস্তায়। হঠাৎ তারা আমার গাড়ির সামনে এসে পড়লো আমি তখন মরিয়া হয়ে ব্রেক কষলাম, কিন্তু তাতে কোন লাভ হলো না। আমার গাড়ির চাকার তলায় তখন দু-দুটো তাজা শরীর পিষ্ঠ হয়ে গেছে। ভাগ্য খারাপ তাই
কারা? আপনার নাকি সেই নিরপরাধ বাচ্চা দুটির। ওয়ারগ্রেভের কথা আর সুরে হুল ফোঁটানো ছিলো।
আমাদের সকলেরই। ফুলের মতো দুটি নিষ্পাপ সম্ভাবনাপূর্ণ জীবন অকালে ঝরে গেলো। আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স এক বছরের জন্যে বাতিল হয়ে গেলো। কিন্তু আমার কি দোষ বলুন।
দোষ আজকালকার নব্য যুবকদের। হাওয়া গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালানোর কি দরকার শুনি? এ সব বদ অভ্যাস এখুনি বদলানো প্রয়োজন।
গলা শুকিয়ে গিয়েছিল মার্স্টানের। এক নিমেষে গ্লাসের সব জলটুকু নিঃশেষ করে ফেললো। স্লান বিষণ্ণ গলায় বললো সে। আপনারা যতোই বলুন দোষ আমার একটুও ছিলো না। এটা একটা অঘটন মাত্র। আর অঘটন ঘটে দোষ-গুণ বিচারের তোয়াক্কা না করেই।
একটু ঢোক গিলে এবারে রগার্স বললো এবার আমিও কিছু বলতে চাই স্যার
বেশ তো বলেই ফেলো তাকে ভরসা দিলো লম্বার্ড।
আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমার স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলে নাকি মিস ব্যাডিকে হত্যা করেছি। একেবারে মিথ্যে কথা, আপনারা কেউ যেন বিশ্বাস করবেন না। আসলে কি জানেন মিস ব্রাণ্ডি সব সময়েই একটা না একটা অসুখে ভুগতেন, ডাক্তার-ওষুধ ছিল তার নিত্য সঙ্গী। ঝড়-জলের রাতে হাঁটা পথে ডাক্তারের বাড়িতে পৌঁছতে অনেক দেরী হয়ে যায়। ডাক্তারবাবুকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এসে দেখি সব শেষ। তিনি তখন সব চিকিৎসার বাইরে চলে গেছেন। তাহলে এর থেকেই আপনারা অনুমান করে নিতে পারেন, চেষ্টার কোন ত্রুটি আমরা করিনি এ ব্যাপারে, কেবল আজই যা করা হলো। যা যা বললাম সবই সত্যি, একটুও বাড়িয়ে কিংবা অতিরঞ্জিত করে বলিনি। তাছাড়া ওঁর মৃত্যুতে আমাদের কি লাভ হলো বলুন?
হয়েছে বৈকি? গলা পরিস্কার করে বলে উঠলেন ব্লোর তোমার মনিবের মৃত্যুতে লাভ তোমাদের কম হয়নি।
না তেমন কি আর লাভ হয়েছে বলুন। সামান্য কিছু টাকা তিনি রেখে গিয়েছিলেন আমাদের জন্যে। তার সেই ভালবাসার দান আমরা গ্রহণ করে কি এমন অন্যায় করেছি বলুন।
তোমরা যা ভালো বুঝেছো তাই করেছে। সে যাই হোক ব্লোর-এর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলো লম্বার্ড। মিঃ ব্লোর, বলুন এবার আপনার কি বলার আছে।
সামান্যই। খানিক আগে আপনারা ল্যাণ্ডারের নাম শুনলেন। জানেন, যে ছিলো এক ডাকাত দলের সর্দার। একটা ব্যাঙ্ক ডাকাতি কেসে ধরা পড়লো সে, আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে।
হ্যাঁ মনে আছে বৈকি। মাথা নাড়ালেন ওয়ারগ্রেভ মামলাটা আমার আদালতে না উঠলেও, তবু এর বিবরণ আমার সব জানা আছে। আপনি এই মামলার তদন্তকারী অফিসার ছিলেন। আপনার সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই শাস্তি হয়েছিল তার। দারুণ আলোড়ন তুলেছিল মামলাটা। কি বলেন?
হ্যাঁ তা যা বলেছেন।
বিচারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল ল্যাণ্ডারের। একবছর পরে ডার্টমুরের জেলে মারা যায় সে। ডাকাত হলেও লোকটা কিন্তু এমনিতে বেশ ভদ্র ছিলো তাই না?
ভদ্র না আর কিছু। মিটমিটে শয়তান। রাতের পাহারাদারটাকে ঐ শয়তানটা তত খুন করেছিল।
সে যাইহোক, এমন একটা জটিল মামলা সুষ্ঠভাবে সমাধান করার জন্যে আপনি তো একটা পুস্কার পেয়েছিলেন, কি রকম পুরস্কার বলুন তো?
পদোন্নতি। তার প্রয়োজন ছিলো না।
আশ্চর্য! গলা ফাটিয়ে হেসে উঠল লম্বার্ড। সব কর্তব্য পরায়ণ লোকগুলো এসে জুটেছে এখানে। আপনাদের মধ্যে আমিই কেবল একটু ব্যতিক্রম। ডঃ আর্মস্ট্রং এর উদ্দেশ্যে এবার বললো লম্বার্ড ডাক্তারবাবু আপনি বা বাকী থাকবেন কেন, আপনার ব্যাপারটা এবার সেরে ফেলুন চটপট। আপনার কি অপরাধ? অবৈধ গর্ভপাত নাকি ভ্রুণহত্যা?
লজ্জায় ঘৃণায় এমিলি এবং ভেরা মুখ ফিরিয়ে মাথা নিচু করে রইলেন।
দেখুন, আমার বিরুদ্ধে সেই অদৃশ্য লোকটার কি যে অভিযোগ ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। ক্লিজ না ক্লিজো যাইহোক, ও দুটো নামের কোনো রোগীকেই আমার মনে পড়ছে না। বহু পুরানো ঘটনা তো অপারেশন কেসও হতে পারে। আমাদের মানে চিকিৎসকদের বড় অসুবিধে কি জানেন? কোনো রোগীর দুরারোগ্য রোগ আমরা সারিয়ে তুলতে রেহাই নেই। দুর্নামের চূড়ান্ত করে ছাড়াবে তারা। একটা বেদনার চাপ পড়লো তার চোখে-মুখে।
কিন্তু মাথায় তখন অন্য আর এক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিলো। সেদিন একটু বেশী মাত্রায় মদ গিলে ফেললাম আমি। বেসামাল অবস্থা, অপারেশন টেবিলে অসম্ভব হাত কাঁপছিল, ঐ অবস্থায় অপারেশন করলাম। ফলে যা হওয়ার তাই হলো, বাঁচলোনা রোগী। অথচ মারা যাওয়ার কথা নয় তার, এমন কিছু জটিল অপারেশন ছিলো না। তবে আমার ভাগ্য ভালো ছিলো, তা নিয়ে রোগীর আত্মীয় স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধব কেউ তেমন হৈ-চৈ করেনি তখন। আমার গাফিলতির কথা জানতো কেবল একজন নার্স, কিন্তু সে-তো মুখ খোলবার মেয়ে নয়। তাহলে? তাহলে কেনই বা দীর্ঘদিন পর সেই ব্যাপারটা নিয়ে অভিযোগ উঠলো আমার বিরুদ্ধে।
