আমি নালা দিয়ে আমাদের রুমে ফিরে এলাম। আসার সময় আমাকে অন্য দুটো রুমও পার হতে হল। দু জায়গাতেই আমাকে প্রশ্নের উত্তর দিতে হল কোন খবর জানি কিনা। আমার কিছু বলা উচিত কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম না। তাই ঠিক করলাম আপাতত কিছু না বলাই ভাল। আমি শুধু বললাম যে শিগগিরি এসে জানাব।
আপু রুমের এক কোণায় হাঁটু জড়িয়ে ধরে বসে ছিল। আমি নালা থেকে উঠতেই এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল, খেয়াল নেই যে আমি নোংরায় মাখামাখি হয়ে আছি। ওর ঘড়িতে তখন ছয়টা বাজে।
দুজনেই একসাথে খেয়াল করলাম যে নালার পানি লাল হয়ে উঠেছে। আমি আর আপু দুজনেই কথা হারিয়ে নালার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ছোট ছোট সাদা সাদা জিনিস নালার চারকোনা গর্ত দিয়ে ভেসে আসতে লাগল। আমরা প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না ওগুলো কি। পরে মুখের নিচের পাটির একসারি দাঁত ভাসতে দেখলাম। আধ ডোবা অবস্থায় সেটা নালার এক মাথা থেকে ভেসে আরেক মাথায় চলে গেল। শিগগিরি কান, আঙুল, পেশী, হাড় সব পিছু পিছু ভেসে এল। একটা আঙুলে তখনো সোনার আংটি লেগে ছিল। একগাদা লাল চুল ভেসে গেল। ভালো করে তাকালে আমরা দেখলাম শুধু চুল না, চুলের সাথে মাথার তালুর কিছু অংশ লেগে ছিল।
আমি বুঝতে পারছিলাম এটা এক নাম্বার রুমের মেয়েটার লাশ। ঘোলাটে পানিতে ওর শরীরের অসংখ্য টুকরো ভেসে যেতে লাগল। ওগুলো দেখে মনে হচ্ছিল না কোন মানুষের শরীর। আমার কেমন যেন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল।
আপু হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে গোঙাতে লাগল। এক কোণায় গিয়ে বমি করল। পেটে তো তেমন কিছু ছিল না, বমিতে কিছু বের হল না। আমি গিয়ে ওর সাথে কথা বললাম কিন্তু ও কোন উত্তর দিল না। চুপ করে থাকল।
আলাদা আলাদা কিউব আকৃতির রুমে আমাদেরকে আটকে রাখা হয়েছে। খুন করার আগে আমাদেরকে কিছু সময় দেয়া হয়েছে একাকী বসে চিন্তা করার জন্য।
“কোন নরকে এসে পড়লাম?” এক নাম্বার রুমের মেয়েটা আমার দিকে চিৎকার করে বলেছিল। তার খনখনে, কাঁপাকাপা কন্ঠ যেন আমার মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল, কোনভাবে মাথা থেকে সরাতে পারছিলাম না। আমি উপলদ্ধি করতে পারছিলাম এই বন্ধ রুমগুলো শুধু আমাদেরকে আটকে রাখেনি, এরচেয়ে অনেক বেশি কিছু এর সাথে জড়িত। আমার মনে হচ্ছিল রুমগুলো হয়ত অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের জীবন, আমাদের আত্মাকে এখানে আটকে রেখেছিল। আমাদেরকে আলাদা করে ফেলেছিল। আমাদের ভেতর থেকে যেন আলো পর্যন্ত কেছু নিয়েছিল। এই জায়গাটা একটা জেলখানা, যা আমাদের আত্মাকে বন্দি করে রেখেছে। এই রুম আমাকে এমন এক একাকীত্ব শিখিয়েছে যা আমি আগে কখনো দেখিনি, আগে কখনো অনুভব করিনি। ভবিষ্যহীন, মুল্যহীন এক জীবন।
আপু নিজেকে বলের মত গুটিয়ে নিয়ে হাত দিয়ে হাঁটু জড়িয়ে ধরে বসে ফোঁপাচ্ছিল। আমি নিজের মনে ভাবলাম অতীতে আসলে মানুষ কিরকম ছিল? যখন আমাদের জন্যও হয়নি, কিংবা ইতিহাস শুরুরও আগে? অন্ধকার একটা স্যাঁতস্যাঁতে বাক্সে বসে আমার বোন এখন যা করছে তা কি? আঙুলে গুনে দেখলাম খুন হওয়ার আগে আমাদের হাতে আর কদিন সময় আছে। ষষ্ঠ দিনে অর্থাৎ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ছয়টায় আমাদেরকে খুন করা হবে।
চতুর্থ দিন : মঙ্গলবার
কয়েক ঘন্টা পর নালার পানি থেকে লাল রঙ মিলিয়ে গেল। শেষের দিকে পানির মধ্যে সাবানের ফেনার মত ভাসছিল। যেন কেউ ধোয়ার কাজে নালাটা ব্যবহার করছিল। হয়ত কেউ প্রথম রুমটা পরিস্কার করছিল। কাউকে খুন করলে প্রচুর রক্ত বের হওয়ার কথা। সেগুলো তো কাউকে না কাউকে পরিস্কার করতে হবে তাই না?
আপুর হাতে ঘড়িতে বারোটা বাজল। মাঝরাত। মঙ্গলবারের শুরু। আমাদের এখানে আনার পর চতুর্থ দিন।
আমি নালায় নেমে এক নাম্বার রুমের দিকে গেলাম।
অন্য দুই রুমের দুজন মেয়েই আমাকে নালায় ভাসতে থাকা জিনিসগুলো নিয়ে প্রশ্ন করল। “পরে,” আমি তাদেরকে বললাম। তাড়াতাড়ি প্রথম রুমে যেতে হবে আমাকে।
যেমনটা ভেবেছিলাম। লালচুলো মেয়েটা নেই। রুমটা দেখে মনে হচ্ছিল হোস পাইপ দিয়ে থোয়া হয়েছে। কেউ একজন অবশ্যই রুমটা পরিস্কার করেছে। যদিও সে কে সে ব্যাপারে আমার কোন ধারণা নেই। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে সেই একই লোকই আমাদেরকে এখানে বন্দি করে রেখেছে।
আমি একই রকম নিশ্চিত যে আপু আমাদের রুমে যে লম্বা চুল খ পেয়েছিল তার মালিক আমাদের আগে আমাদের রুমে বন্দি ছিল। এবং খুন হয়েছিল। পরিস্কার করার সময় ওই চুলটা কোনভাবে রয়ে গিয়েছিল।
ভেবে অবাক লাগল কি ধরনের মানুষ হলে আরেক মানুষকে ধরে এনে এই রুমগুলোতে রেখে খুন করতে পারে। ছয়দিন একটা রুমে আটকে রেখে উপভোগ করছে তারপর এসে কেটে টুকরো টুকরো করছে।
আমরা এখন পর্যন্ত লোকটাকে দেখিনি। তার গলার আওয়াজ শুনিনি। কিন্তু আমরা নিশ্চিত যে সে আছে, প্রতিদিন দরজার সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করছে। প্রতিদিন নিয়ে আসছে পাউরুটি আর পানি। আর মৃত্যু। ওই লোকটা এই রুমগুলোর ডিজাইন করেছে, এগুলো তৈরি করেছে, আর সেই সাথে তৈরি করেছে এখানের মৃত্যুর নিয়মগুলোও।
আমরা না চাইলেও বিমর্ষ হয়ে পড়লাম। এক সময় না এক সময় আমি আর আমার বোনও খুন হব! মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই খুনির সাথে আমাদের দেখা হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই।
