আপু রুমের এক কোনায় বসে দেয়ালের দিকে একটানা তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ সে খপ করে কিছু একটা ধরল।
“কোত্থেকে আমার মাথায় একটা চুল এসে পড়ল,” অবাক হয়ে দু আঙুলে একটা লম্বা চুল ধরে রেখেছে। আমি বুঝতে পারছিলাম না ও কি বলছে।
“দ্যাখ, কত বড় চুল!”
ও উঠে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে চুলটা কত লম্বা সেটা মাপার চেষ্টা করল। আন্দাজে মনে হল পঞ্চাশ সেন্টিমিটারের মত হবে।
অবশেষে আমি বুঝতে পারলাম ও কি বলার চেষ্টা করছে। আমার বা আপুর কারো চুলই এত বড় না। তারমানে চুলটা অবশ্যই অন্য কারোর।
“তাহলে কি আমাদের আগে এই রুমে অন্য কাউকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল?”
আপুর মুখ শুকিয়ে গেল। মুখ দিয়ে ভাঙা ভাঙা শব্দ বেরিয়ে এল।
“তাহলে…তাহলে…অবশ্যই…না, না…হয়তো…হয়তো বোকার মত কথা…কিন্তু…তুই কি বুঝতে পারছিস কি বলতে চাইছি? সোতের বিপরীতের রুমগুলোর মানুষগুলো আমাদের চেয়ে বেশি সময় ধরে আছে। দুই নাম্বার রুমের থেকে এক নাম্বার রুমের মেয়েটা এক দিন বেশি আছে। তারমানে হল আমাদের সবাইকে সিরিয়ালি রাখা হয়েছে। প্রথম রুম থেকে।”
আপু মনে করিয়ে দিল প্রত্যেক রুমে কে কয়দিন ধরে আছে।
“তাহলে এখানে কে ছিল?”
“এখানে আর কেউ ছিল? এটা কি আগে খালি ছিল না?”
“হ্যাঁ খালি ছিল ঠিকই। কিন্তু তার আগে?”
আপু রুমের মধ্যে পায়চারি করতে লাগল। এক পাশ থেকে আরেক পাশে মাথা দোলাচ্ছে।
“ভেবে দ্যাখ, গতকাল আমাদের যখন ঘুম ভাংল, সেটা ছিল আমাদের দ্বিতীয় দিন। আমাদের পাশের পাঁচ নাম্বার রুমের মেয়েটার জন্য প্রথম দিন। ছয় নাম্বার রুমটা খালি ছিল, বা বলা যায় শুন্য দিন। কিন্তু সাত নাম্বার রুমের মহিলাটার জন্য কত নাম্বার দিন ছিল? সিরিয়ালি ধরলে মাইনাস এক দিন। তোদের কি স্কুলে নেগেটিভ নাম্বার শেখানো শুরু করেছে?”
“হ্যাঁ ওইটুকু আমি জানি।” কিন্তু সত্যি কথা হল ব্যাপারটা বুঝতে আমার কষ্ট হচ্ছিল।
“বুঝতে পারছিস না তাই না? মাইনাস একদিনে ওই রুমে কেউ ছিল। তারমানে, আমার ধারণা, গতকাল ওই মহিলার এখানে ষষ্ট দিন ছিল। সে নিশ্চয়ই এক নাম্বার রুমের মেয়েটার এক দিন আগে এখানে এসেছিল।”
“তাহলে সে এখন কোথায়?”
আপু পায়চারি থামিয়ে আমার দিকে তাকাল। শকড। কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে সে আমাকে ব্যাখ্যা করল। সম্ভবত ওই মহিলা আর এই দুনিয়ায় নেই। সম্ভবত সে এখন মৃত।
গতকাল যে উধাও হয়ে গিয়েছে তার জায়গায় আজকে নতুন মানুষ এসেছে। আমি যা দেখেছি তা নিয়ে চিন্তা করলাম। তথ্যগুলো আপুর কথার সাথে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম।
“একেকটা দিন যায়, আর স্রোতের দিকে একটা করে রুম খালি হতে থাকে। শেষ মাথায় গিয়ে আবার প্রথম রুম থেকে শুরু হয়। সাতটা রুম। সপ্তাহের প্রতিদিনের জন্য একটা করে…”
একেক দিন একেকটা রুমের মানুষকে খুন করা হয় আর নালা দিয়ে তার লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয়। পরের দিন সেই রুমে নতুন মানুষ আনা হয়।
খুন করা হয় আর সে জায়গা নতুন কাউকে দিয়ে পূরণ করা হয়।
গতকাল ছয় নাম্বার রুমে কেউ ছিল না। আজকে সেখানে নতুন একজনকে আনা হয়েছে। নতুন একজনকে কিডন্যাপ করা হয়েছে-শূন্যস্থান পূরণ করা হয়েছে।
গতকাল সাত নাম্বার রুমে একজন ছিল। আজকে সেখানে কেউ নেই, উধাও। কেটে টুকরো টুকরো করে নালা দিয়ে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে তাকে।
আপু মেঝের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলছিল। শুনে মনে হচ্ছিল কোন জাদুমন্ত্র পড়ছে। ওর দৃষ্টি নির্দিষ্ট কোন কিছুতে সীমাবদ্ধ ছিল না।
“সেকারনেই সাত নাম্বার রুমের মহিলাটা নালা দিয়ে লাশ ভেসে যেতে দেখেছে। রুমগুলোতে মানুষ এমনভাবে রাখা যে নালা দিয়ে কেউ ভেসে গেলে সোতের দিকের রুমগুলোর কারো দেখতে পাওয়ার কথা না। মহিলাটা ঠিকই দেখেছিল, হ্যালুসিনেশনে ভুগছিল না সে। শেষ রুমে থাকায় অন্য রুমের লাশগুলোকে সে ভেসে যেতে দেখেছিল।”
আর গতকাল সাত নাম্বার রুমের মহিলাটা খুন হওয়ায় তার লাশ কেউ দেখেনি। আপু আমাকে পুরোটা ব্যাখ্যা করে বোঝাল। পুরো ব্যাপারটা অনেক জটিল মনে হলেও আপ যা বলছিল তা আমি বিশ্বাস করলাম।
“আমাদেরকে এখানে আনা হয়েছে শুক্রবার। আমার মনে হয় ওই দিন পাঁচ নাম্বার রুমে যে ছিল তাকে খুন করে নালায় ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল। পরেরদিন ছয় নাম্বার রুমের জনকে খুন করা হয় আর পাঁচ নাম্বার রুমে নতুন বন্দি আনা হয়। তুই যে সেদিন খালি রুম দেখলি, ওই রুমের বন্দিকে খুন করা হয়েছিল। তারপর রবিবারে সাত নাম্বার রুমের বন্দিকে খুন করা হয়। আমরা সারাদিন তাকিয়ে থাকলেও নালায় কিছু দেখতে পেতাম না কারন লাশ স্রোতের উল্টোদিকে যায় না। আজকে সোমবার…”
প্রথম রুমের বন্দিকে আজকে খুন করা হবে।
***
আমি ছুটে প্রথম রুমে গেলাম।
লাল চুলের মেয়েটাকে আপুর ব্যাখ্যা শোনালাম। কিন্তু সে আমাকে বিশ্বাস করল না। মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল এরকম কোন কিছু কখনোই সত্যি হতে পারে না।
“কিন্তু কোনভাবে যদি সেরকম কিছু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে পালানোর উপায় খোঁজাই কি বুদ্ধিমানের মত কাজ হবে না?”
কিন্তু আমাদের দুজনেরই কোন ধারণা ছিল না কি করা যেতে পারে।
“আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না!” সে ক্ষেপে গিয়ে আমার মুখের উপর চিৎকার করল। “আর এটাই বা কোন নরকে এসে পড়লাম?”
