এই খুনি আসলে স্বয়ং মৃত্যু দেবতা। আপু, আমি, বাকি সবাই-এই উন্মাদ লোকটার ফাঁদে আটকা পড়ে আছি। আমাদের সবার মৃত্যু ঘোষণা করা হয়ে গিয়েছে।
***
আমি দুই নাম্বার রুমে ফিরলাম। ওই রুমের মেয়েটাকে বললাম ওর ছয়দিন বন্দিত্ব হয়ে গিয়েছে। আরো বললাম আপু যা যা আগেরদিন বলেছিল। এই মেয়েটা আমাকে নির্বোধ বলে গালি দেয়নি। ও নালা দিয়ে লাশের টুকরোগুলো ভেসে যেতে দেখেছে। ও বুঝতে পেরেছে ও এখানে একজন বন্দি। যে কিনা আর কোনদিন দুনিয়ার আলো চোখে দেখতে পারবে না। আমার বলা শেষ হওয়ার পর সে চুপ করে থাকল, ঠিক আপুর মত।
“আমি পরে আবার আসব,” বলে রুম নাম্বার তিনের দিকে গেলাম। সেখানে আমি একই কাহিনী আবারো বললাম।
তিন নাম্বার রুমের মেয়েটা খন হবে কালকে। এতদিন ওর কোন ধারণা ছিল না কতদিন পর্যন্ত এখানে বন্দি অবস্থায় থাকতে হবে। এখন স্পষ্ট ধারণা হল।
মেয়েটা যখন মুখে হাত চেপে কাঁদতে শুরু করল। আমি কেন জানি অবাক হলাম না।
আমি জানি না, ঠিক কোন সময়ে আপনি মরতে যাচ্ছেন তা জানতে পারা ভাল নাকি খারাপ। হয়ত কিছু না জানতে পারাই সব থেকে ভাল। তাহলে আপনি সেফ উদ্বিগ্ন হয়ে দিনের পর দিন নালা দিয়ে লাশ ভেসে যেতে দেখবেন। তারপর একদিন হঠাৎ দরজা খুলে যাবে এবং কোনদিন দেখেননি এমন কেউ এসে আপনাকে খুন করবে। আমার সামনে কান্নারত মেয়েটাকে দেখে আমার সাত নাম্বার রুমের মহিলাটার কথা মনে পড়ল। এদের সবার চেহারার অভিব্যক্তি একই রকমের ছিল।
আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে দিনের পর দিন এই চারকোনা কংক্রিটের ঘরগুলোতে আটকে রাখার ব্যাপারটা কারো কাছে খেলার মত। মৃত্যু দেবতা আসবে, আপনার নাম ধরে ডাকবে…পুরো ব্যাপারটাই বিচ্ছিরি রকমের ভীতিজনক।
সাত নাম্বার রুমের মহিলা প্রতিদিন নালা দিয়ে লাশের টুকরোগুলো ভেসে যেতে দেখত, আর পুরোটা সময় চিন্তা করত এরপরের শিকার সে হবে কিনা। ওর ভীতিগ্রস্থ মুখটা আমার চোখে ভেসে উঠল। বুকের ভেতর কোথায় যেন কষ্ট হতে লাগল।
পাঁচ আর ছয় নাম্বার রুমে গিয়েও আমি সব খুলে বললাম। সাত নাম্বার রুমে নতুন একটা মেয়ে এসেছে। আমাকে নালা থেকে উঠতে দেখে সে। ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল।
***
চার নাম্বার রুমে আমি আমার বোনের কাছে ফিরে এলাম।
ওকে নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। সে একভাবে রুমের এক কোণায়। বসে ছিল। আমি ওর কাছে গিয়ে ঘড়ির সময় দেখলাম। ভোর ছয়টা বাজে।
দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। দরজার তলা দিয়ে এক পিস পাউরুটি চলে এল। পানির পাত্রে পানি ঢালার শব্দ পেলাম।
দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে সাদা আলো আসত। ওই জায়গার মেঝে ধুসরের চেয়ে একটু হালকা দেখাত। এক মুহূর্তের জন্য সেখানে একটা ছায়া পড়ল। ছায়াটা নড়ছিল। কেউ একজন সরাসরি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
দরজার বাইরের এই লোকটা না জানি কত মানুষকে খুন করেছে। এমনকি এখনো সে কয়েকজনকে খুন করার জন্য বন্দি করে রেখেছে। শুধু এটুকু চিন্তা করেই আমি দরজার এপাশ থেকে লোকটার অন্ধকার অশুভ ক্ষমতা অনুভব করতে পারছিলাম। আমার বুকের উপর কেমন যেন চাপ বাড়ছিল। নিশ্বাস নিতে পারছি না মনে হচ্ছিল।
আপু ধনুকের ছিলার মত তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল। দৌড়ে গিয়ে দরজার নিচের ফাঁকে মুখ চেপে ধরে চিৎকার করে বলল, “দাঁড়ান!” ফাঁক দিয়ে ও হাত ঢুকানোর চেষ্টা করল কিন্তু হাত আটকে গেল। “প্লিজ! আমার কথা শুনুন! কে আপনি!?”
আপু গলার সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করল, কিন্তু দরজার ওই পাশের লোকটার হাবভাব দেখে মনে হল না কিছু শুনতে পেয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে অন্যদিকে চলে গেল। তার পায়ের আওয়াজ আস্তে আস্তে দূরে মিলিয়ে গেল।
“শিট…শিট…” আপু বিড়বিড় করল। দরজার সাথের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসল। লোহার দরজায় কোন হাতল নেই। কজা দেখে মনে হচ্ছে দজা ভেতর দিকে খুলে। এরপর যেদিন দরজা খুলবে সেদিন আমাদের মরতে হবে।
“আমি মরতে যাচ্ছি,” আমি নিজেকেই নিজে শোনালাম। জীবনে অনেকবার কেঁদেছি বাসা থেকে দূরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু কখনো মরতে হবে এই কথা ভেবে চোখের পানি ফেলা হয়নি।
খুন হওয়ার ব্যাপারটা কিরকম? বিষয়টা বুঝতে আমার সমস্যা হচ্ছিল।
কে আমাকে খুন করবে?
কোন সন্দেহ নেই অনেক কষ্টকর হবে ব্যাপারটা। মরে যাওয়ার পর আমার কি হবে? ভয় হচ্ছিল চিন্তা করতে। কিন্তু এরচেয়েও ভয়ের ব্যাপার সম্ভবত যে আপু আমার চেয়ে অনেক বেশি আতংকিত। ওকে অস্থিরভাবে রুমের ভেতর চোখ নাড়াতে দেখে আমি বুঝতে পারছিলাম না কি করা উচিত। আমার সাড়া শরীর কাঁপছিল।
“আপু…” বলে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আপু হাঁটু জড়িয়ে বসে ছিল। শূন্য চোখে আমার দিকে তাকাল।
“তুই কি এই সাত রুমের কাহিনী সবাইকে বলে দিয়েছিস?”
আমি মাথা ঝাঁকালাম, কিন্তু মনে মনে বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম।
“নিষ্ঠুর একটা কাজ করেছিস।”
“বুঝতে পারিনি,” আমি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু আপু মনে হল না কিছু শুনছে।
আমি দুই নাম্বার রুমের দিকে এগুলাম।
***
দুই নাম্বার রুমের মেয়েটা আমাকে দেখে হাসল। মনে হল হাঁফ ছাড়ল। “আমি ভয় পাচ্ছিলাম তুমি বোধহয় আর আসবে না। বুঝতে পারছিলাম না কি করব।”
হাসিটা মলিন হলেও আমার ভেতরটা উষ্ণ করে তুলল। মনে হচ্ছিল কতদিন কাউকে হাসতে দেখিনি। তাই ওর হাসি যেন একই সাথে উষ্ণতা আর আলো ছড়াচ্ছিল।
