আমি তাই করলাম।
প্রথমে আমি মোতের বিপরীতের রুম তিনটায় গেলাম।
তিনজনই আমাকে দেখে খুশি হল। আমি তাদেরকে আপুর প্রশ্নগুলো করলাম।
রুমগুলোতে কোন জানালা ছিল না। তাই সময়-দিন হিসাব করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু তারপরেও সবারই মোটামুটি ধারণা ছিল তারা কতদিন ধরে বন্দি। ঘড়ি না থাকলেও প্রতিদিন একবার খাবার আসে, সেভাবে বলা সম্ভব কত দিন গেল।
তারপর আমি স্রোতের দিকের রুমগুলোতে গেলা, এবং অদ্ভুত একটা ব্যাপার দেখতে পেলাম।
পঞ্চম রুমে আগের দিনের মেয়েটাই ছিল।
কিন্তু ষষ্ঠ রুমে, যেটা কিনা গতকাল খালি ছিল, সেখানে এখন নতুন একজন মেয়ে। সে আমাকে দেখে ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। নোরায় মাখামাখি অবস্থায় আমাকে দেখে সে সম্ভবত কোন দৈত্য বা সেরকম কিছু একটা ভেবেছে। তাকে বোঝাতে গিয়ে অনেক ঝামেলা পোহাতে হল। সব শুনে একসময় সে কিছুটা শান্ত হল।
যা বুঝলাম তা হল গতকালকেই সে এই রুমে এসেছে। রাস্তায় জগিং করছিল। একটা সাদা স্টেশন ওয়াগন কাছেই পার্ক করা ছিল। গাড়িটা তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ওর মনে হল কিছু একটা এসে মাথায় লাগল। এরপর সব অন্ধকার। মেয়েটা মাথা টিপে দেখল তখনো ব্যথা করছে কিনা।
আমি সপ্তম রুমে গেলাম। যে রুমে আগেরদিন পাগল মহিলাটা আমাকে লাশগুলোর কথা বলেছিল। কিন্তু রুমে কেউ ছিল না। মহিলা। উধাও। খালি কংক্রিটের রুম আর ম্লান হলুদ বাল্ব।
আরেকটা অদ্ভুত জিনিস আমি খেয়াল করলাম সেটা হল রুমটাকে আগের দিনের চেয়ে পরিস্কার দেখাচ্ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল না এখানে কেউ কখনো ছিল। দেয়ালে কিংবা মেঝেতে এক বিন্ধু ধুলো পড়ে নেই। যে মহিলাটার সাথে কথা বলেছিলাম সে কি তাহলে কল্পনা ছিল নাকি আমি ভুল রুমে এসেছি?
চতুর্থ রুমে ফিরে এসে আপুকে যা যা জেনেছি সব জানালাম।
প্রথম প্রশ্নের উত্তর সবার আলাদা আলাদা ছিল। এক নাম্বার রুমের লালচুলো মেয়েটার আজকে ষষ্ঠ দিন। সে নিশ্চিত যে সে ছয়দিন খাবার খেয়েছে।
দুই নাম্বার রুমের মেয়েটার আজকে পঞ্চম দিন। তিন নাম্বার রুমের মেয়েটার চতুর্থ দিন। চার নাম্বার রুমে আমরা আছি। আমাদের আজকে তৃতীয় দিন। পাঁচ নাম্বার রুমের মেয়েটার আজকে দ্বিতীয় দিন। ছয় নাম্বার রুমের মেয়েটাকে গত রাতে ধরে আনা হয়েছে। তারমানে আজকে তার প্রথম দিন।
সাত নাম্বার রুমের মহিলাটা কতদিন ধরে ছিল তা জানার উপায় নেই কারন সে এখন আর সেখানে নেই।
“হয়ত সে বের হয়ে যেতে পেরেছে?” আমি আপুকে বললাম, কিন্তু আপু অতটা নিশ্চিত না।
দ্বিতীয় প্রশ্নটা ছিল কেউ নালা দিয়ে লাশ ভেসে যেতে দেখেছে কিনা। উত্তর হল, কেউ দেখেনি। কিন্তু প্রশ্নটা শুনে সবাই একটু হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল।
“এই প্রশ্ন কেন করলে?” প্রত্যেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল। তাদের সবার ধারণা আমি বোধহয় ভেতরের কোন খবর জানি। তা অবশ্য জানি। আমি ছাড়া ওরা কেউ তো নালা দিয়ে এক রুম থেকে আরেক রুমে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারছিল না। ওরা খালি পারছিল কল্পনা করতে। এরকম রুমে বন্দি থেকে কল্পনা করা ছাড়া সময় পার করার কোন উপায় নেই।
“পরে সব বলব।” তাড়াতাড়ি সবার উত্তর জানার জন্য আমি সংক্ষেপে উত্তর দিয়ে পার পেতে চাচ্ছিলাম।
“এটা ঠিক না। আমি তোমাকে এভাবে যেতে দেব না। হয়ত যে গ্যাং আমাকে এখানে আটকে রেখেছে তুমি তাদেরই কেউ। অন্য আরো রুম আছে, সেখানে আরো মানুষ বন্দি আছে এই কথা আমি তোমার থেকে শুনে বিশ্বাস করব কেন?” প্রথম রুমের মেয়েটা আমাকে বলেছিল। নালার উপর দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে দেয়াল আটকে রেখেছিল যেন আমি যেতে না পারি।
আমার আর কোন উপায় ছিল না। তাই ওকে আগের রাতে শোনা পাগল মহিলার কথাগুলো বললাম। সব শুনে মেয়েটার মুখ কাগজের মত সাদা হয়ে গেল আর আমাকে নির্বোধ বলে বকাঝকা করল। সে বলল এই কাহিনী কোনভাবেই সত্যি হতে পারে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আমাকে যেতে দিল।
সবাই বলল তারা কোন লাশ ভেসে যেতে দেখেনি। আমার মনে হল সাত নাম্বার রুমের মহিলা তাহলে নিশ্চয়ই হ্যালুসিনেসন কিংবা এরকম কিছুতে ভুগছিল। মহিলাটা বলেছিল সে নাকি প্রতিদিন একই সময়ে লাশের টুকরো ভেসে যেতে দেখে। কিন্তু অন্য মেয়েরা বলল তারা সেরকম কিছু দেখেনি। এই ধাঁধার কোন অর্থ বের করতে পারলাম না আমি।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি দড়ি দিয়ে শরীর থেকে নোংরা তরলগুলো মুছে ফেলার চেষ্টা করলাম। আপু আর আমি মিলে আমার শার্ট আর প্যান্ট দিয়ে দড়িটা বানিয়েছি। এই কয়েকদিন আমি শুধু আমার আন্ডারপ্যান্ট পরে আছি। রুমটা যথেষ্ট উষ্ণ, যে কারনে ঠাণ্ডা লাগার চিন্তা নেই। দড়িটার এমনিতে আর কোন কাজ নেই, টাওয়াল হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়া। অন্য সময় সেটা রুমের কোণায় পড়ে থাকে।
আমি মেঝেতে দলা পাকিয়ে শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কংক্রিটের মেঝে বুকের হাড়ে লেগে ব্যথা করছিল, কিন্তু কিছু করার ছিল না।
যদিও আমার তথ্যগুলো অবিশ্বাস্য, কিন্তু তারপরেও আমার মনে হল রুমগুলোতে গিয়ে গিয়ে সবার সাথে কথা বলা উচিত। তারা রুমে একা রয়েছে আর সবাই আতংকিত।
কিন্তু অন্যদিকে আমার সাথে কথা বললে ওরা আরো বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারে। আমি জানি না কাজটা ভাল হবে নাকি আরো খারাপ হবে।
