তার কণ্ঠ কেমন মৃত শোনাল, কোন জোর নেই গলায়।
অন্য রুমের মেয়েদের চেয়ে উনি স্পষ্ট আলাদা রকমের। কংক্রিটের মেঝেতে মাথা চুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। মহিলাটার হাত মুখ ঘর্মাক্ত আর নোংরা হয়ে ছিল। চোখ ভেতরে ঢুকে গিয়েছে, চাপা ভাঙা, দেখে মনে হচ্ছিল যেন একটা কংকাল।
আমি তাকে জানালাম আমি কে আর কি করছি। মনে হল তার অন্ধকার চোখগুলোতে একটু আলোর ফুলকি দেখা দিল।
“তারমানে তুমি বলছ ওদিকে আরো জীবিত মানুষ রয়েছে?!”
জীবিত মানুষ মানে? আমি তার কথার অর্থ বুঝতে পারছিলাম না।
“তুমি তাদের দেখেছ তাই না? না দেখে কিভাবে থাকা সম্ভব! প্রতিদিন, ঠিক সন্ধ্যা ছয়টার সময় এই নালা দিয়ে লাশগুলো ভেসে যায়!।”
***
ফিরে গিয়ে আপুকে সব খুলে বললাম।
“তারমানে সব মিলিয়ে রুমের সংখ্যা সাতটা। হুম…”
আপু যখন বলছিল, আমি তখন রুমগুলোকে নাম্বার দিচ্ছিলাম সহজে ব্যাখ্যা করার জন্য। সোতের শুরু থেকে ধরলে আমি আর আপু যেই রুমে আছি সেটা হল চার নাম্বার। আর শেষ রুম, যেটায় মহিলাটা ছিল সেটা হল সাত নাম্বার।
আমি ভাবছিলাম মহিলা যে পাগলামি কথাগুলো বলেছিল ওগুলো আপুকে বলব কিনা। আমাকে চিন্তা করতে দেখে আপু কিছু একটা আঁচ করতে পারল। কাঁপতে কাঁপতে আপুকে বললাম সাত নাম্বার রুমের মহিলা কি দেখেছে। প্রতিদিন ছয়টার সময় নাকি নালা দিয়ে মানুষের লাশ ভেসে যায়।
কথাগুলো শোনার সময় এরকম ছোট নালা দিয়ে কিভাবে লাশ ভেসে যেতে পারে তা ভেবে আমার আশ্চর্য লাগছিল। তাছাড়া সাত নাম্বার রুমে নালার শেষে একটা লোহার গেট আছে। লাশ যদি কোনভাবে ভেসেও আসে তাহলে গেটে আটকে যাওয়ার কথা না? মহিলা বলেছিল লাশগুলোকে কেটে ছোট ছোট টুকরো করা হয় যাতে গেটের লোহার বারগুলোর ভেতর দিয়ে পার হয়ে যেতে পারে। মাঝে মধ্যে দু-একটা টুকরো আটকে যায় ঠিকই কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই কোন সমস্যা হয় না। একদম প্রথম দিন থেকেই মহিলা নালা দিয়ে লাশগুলোকে ভেসে আসতে দেখছে।
আপু এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে সব শুনল।
“কাল সন্ধ্যায়ও দেখেছে?”
“হ্যাঁ।”
গত সন্ধ্যায় আমরা কোন লাশ ভেসে যেতে দেখিনি। তাহলে কিভাবে সম্ভব? আমরা তো ছয়টা পর্যন্ত জেগে ছিলাম। রুমের যে অংশেই বসে থাকা হোক না কেন, নালা চোখে পড়বেই। যদি নালা দিয়ে অদ্ভুত কিছু ভেসে যায় সেটা আমাদের চোখ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
“আচ্ছা তিন নাম্বার রুমের মেয়েটা কি কিছু বলেছে যে সে এরকম কিছু দেখেছে?”
আমি মাথা নাড়লাম। একমাত্র সাত নাম্বার রুমের মহিলাই লাশের কথা বলেছে আর কেউ না। মহিলা কি কোন ধরনের হ্যালুসিনেসনে ভুগছে বা কিছু?
কিন্তু মহিলাটার চেহারা আমি মাথা থেকে দূর করতে পারছিলাম না। ওই ভাঙা মুখ, চোখের নিচের কালো দাগ। চোখগুলোতে এমন গভীর অন্ধকার ছিল যেন মনে হচ্ছিল সে ইতিমধ্যেই মৃত। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল এমন একজন যে কিনা ভীতিকর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। মহিলা যে সত্যিই খারাপ কিছু একটা দেখেছে তা নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই।
“তোমার কি মনে হয় মহিলা সত্যি বলছে?” আপুকে প্রশ্ন করলাম। কিন্তু আপু শুধু মাথা নেড়ে বলল, “জানি না।।” আমার এত ভয় লাগছিল বুঝতে পারছিলাম না কি করা উচিত।
“যখন সময় হবে আমরা সব জানতে পারব।”
আপু আর আমি দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকলাম। অপেক্ষায় থাকলাম কখন আপুর ঘড়িতে ছয়টা বাজে।
এক সময় ঘড়ির বড় কাটা আর ছোট কাটা মিলে সোজা একটা লাইন তৈরি করল। বাল্বের মলিন আলো পড়ে রুপালি কাটাগুলো চকচক করছিল। যেন আমাদেরকে বলতে চাইছিল যে সময় হয়েছে। আমি আর আপু জোরে দম নিয়ে নালার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
দরজার বাইরে মনে হল দূরে কোথাও থেকে কারো যাওয়া কিংবা আসার শব্দ ভেসে এল। সেটা শুনে আমরা দুজনেই উসখুস করছিলাম। ছয়টা বাজার সাথে ওই পায়ের শব্দের কি কোন সংযোগ আছে? আপু কিছু বলল না। হয়ত ও ভাবছিল বলে কোন লাভ নেই।
দুর থেকে মনে হল কোন মেশিনের শব্দ ভেসে এল। কিন্তু নালা দিয়ে কোন লাশ কিংবা লাশের টুকরো ভেসে এল না। স্রেফ আগের সেই ঘোলা পানি আর পানিতে ভেসে থাকা মরা পোকামাকড়।
তৃতীয় দিন : সোমবার
ঘুম ভাঙল যখন তখন ঘড়িতে সকাল সাতটা। আমাদের নাশতা, এক স্লাইস পাউরুটি দরজার ফাঁক দিয়ে বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আগেরদিন আমরা পানির বাটিটা ফাঁক দিয়ে বের করে দিয়েছিলাম। সেটায় পানি ভরে আবার ফিরিয়ে দিয়েছে। যে লোকটা কিংবা মহিলা আমাদের এখানে আটকে রেখেছে সে সম্ভবত পাউরুটির সাথে পানি জগ নিয়ে আসে। আমি কল্পনা করলাম মুখ-মন্ডলবিহীন একজন লোক এক দরজা থেকে আরেক দরজায় যাচ্ছে আর এক পিস করে রুটি দিচ্ছে, বাটিতে পানি ঢালছে।
আপু পাউরুটিটা দু টুকরো করে আমাকে বড় টুকরোটা দিল।
“তোকে একটা কাজ করতে হবে আমার জন্য,” সে বলল। সে চায় আমি নালা দিয়ে গিয়ে সবাইকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে আসব। আমার ইচ্ছা করছিল না, কিন্তু ও তাহলে আমার রুটি ফিরিয়ে নেবে বলল। সুতরাং না করে আমার কোন উপায় ছিল না।
“আমি চাই তুই সবাইকে দুটো প্রশ্ন করবি। তারা কতদিন ধরে আটকে আছে আর নালা দিয়ে কোন লাশ ভেসে যেতে দেখেছে কিনা। এই দুটো প্রশ্ন।”
