দুই মিটারের মত যাওয়ার পর আমি টের পেলাম মাথার সাথে সিলিঙের টোকা লাগছে না। নালাটা আবার চওড়া হয়ে গিয়েছে। আমি তাড়াতাড়ি মাথা তুলে উঠে দাঁড়ালাম।
তারপর একটা চিৎকার শুনতে পেলাম।
চোখে নোংরা পানি ঢুকুক সে ইচ্ছা আমার ছিল না কিন্তু এখন চোখ খুলতে বাধ্য হলাম। এক মিনিটের জন্য মনে হল আগের রুমেই ফিরে এসেছি। জায়গাটা ঠিক আমাদের রুমটার মতই ধূসর, কংক্রিটের তৈরি একটা কিউব। সেই একই নালা দুই দেয়াল ভেদ করে চলে গিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম আমাদের রুমের একদিকের গর্ত দিয়ে ঢুকে আরেক দিকের গর্ত দিয়ে রুমে ফেরত এসেছি।
আসলে তা নয়। আমার বোনের বদলে এই রুমে অন্য কাউকে দেখতে পেলাম। একটা অল্প বয়সি মেয়ে। আপুর চেয়ে বয়সে একটু বড়ই হবে মনে হয়। আগে কখনো একে দেখেছি বলে মনে হয় না।
“কে তুমি?!” সে চিৎকার করছিল। বোঝা যাচ্ছিল আমাকে দেখে ভয় পেয়েছে। আমার থেকে যতটা সম্ভব দুরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।
আমি ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে আমি আর আমার বোন পাশের রুমে আছি। স্রোত যেদিকে যাচ্ছে সেদিকের রুমে। পায়ের থেকে ফিতাটা খুলে নিয়ে আমি ঠিক করলাম আরো সামনে যাব।
একইভাবে সামনে আরো দুটো রুম আবিষ্কার করলাম।
সুতরাং মূল বক্তব্য হল, আমাদের রুম থেকে স্রোতের বিপরীত দিকে গিয়ে মোট তিনটা রুম পেলাম। প্রত্যেক রুমেই একজন করে মেয়ে ছিল।
প্রথম রুমে ছিল অল্প বয়সি মেয়েটা।
তার পরের রুমে লম্বা চুলের আরেকটা মেয়ে।
সবচেয়ে দূরের রুমের মেয়েটার চুল লাল রঙ করা ছিল।
তারা সবাই আমাদের মতই বন্দি, এবং কেউই জানে না কেন তাদেরকে বন্দি করা হয়েছে। সবার মধ্যে আমি আর আপই সবচেয়ে ছোট। আমার মনে হয় আমাকে আর আপুকে এক রুমে রাখা হয়েছে কারন আমি এখনো অনেক ছোট। আমাকে পুরো একজন মানুষ হিসেবে ধরা হয়নি। আপু আর আমি মিলে একজন মানুষের সমান বা এরকম কিছু।
লাল চুলো মেয়েটার রুমের পর একটা লোহার খাঁচা দিয়ে নালার মখ বন্ধ করা ছিল যে কারনে আর সামনে যেতে পারিনি। রুমে ফিরে এসে আপুকে সব জানালাম।
ভেজা শরীর শুকিয়ে যাওয়ার পরও আমার গায়ে দুর্গন্ধ লেগে থাকল। ধোয়ার জন্য পরিস্কার পানি না থাকায় মনে হল দুর্গন্ধ পুরো রুমে ছড়িয়ে গেল। আপু অবশ্য গন্ধ নিয়ে কোন অভিযোগ করল না।
“তারমানে সোতের দিক থেকে চার নাম্বার রুমে রয়েছি আমরা।” বিড়বিড় করে বলল ও, কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত সে।
এক সারিতে অনেকগুলো রুম প্রত্যেকটায় একজন করে মানুষ বন্দি। ব্যাপারটা চিন্তা করে আমার আশ্চর্য লাগছিল। আমার মত আরো অনেকে একই অবস্থায় আছে ভেবে একটু স্বস্তি, আবার একটু সাহসও পাচ্ছিলাম যেন।
প্রথম দেখায় মেয়েরা সবাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তারপর সবার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। দেখে মনে হচ্ছিল এরা সবাই বেশ কিছুদিন ধরে এখানে বন্দি, আর এতদিন কখনো কোন মানুষের দেখা পায়নি। তাদের কারোরই দরজা কখনো খুলেনি। তারা কোথায় আছে, তাদের দেয়ালের বাইরে কি আছে কিছু জানত না তারা। তাদের শরীর ছোট সাইজের না হওয়ায় কেউই নালায় নেমে অন্য পাশে গিয়ে দেখতে পারেনি।
আমি যখন নালার ভেতর দিয়ে রুমগুলোতে গিয়েছিলাম, প্রত্যেকে আমাকে অনুরোধ করেছে আবারও যেন আসি। এসে ওদেরকে যেন জানাই অন্য রুমগুলোতে আমি কি কি দেখেছি।
কে আমাদেরকে এখানে আটকে রেখেছে? আমরা কেউই এই প্রশ্নের উত্তর জানি না। আমরা জানি না এই জায়গাটা আসলে কি, সবাই শুধু জানতে চাইছিলাম কখন আমরা এখান থেকে মুক্তি পাব।
আপুর কাছে সোতের বিপরীতের রুমগুলো নিয়ে রিপোর্ট করার পর তৈরি হলাম সোতের দিকে গিয়ে দেখার জন্য। আগের মতই আরো কয়েকটা কংক্রিটের রুম আবিষ্কার করলাম।
প্রথম রুমটায় আমার বোনের বয়েসি একটা মেয়ে ছিল। আমাকে দেখে সে চমকে উঠল। কিন্তু সব কথা শোনার পর শান্ত হল। বাকি সবার মতই কেউ একজন তাকে এখানে ধরে এনেছে। ওর কোন ধারণা নেই কেন কেউ সেটা করল।
পরের রুমটায় গেলাম। এই রুমটার সবই এক, শুধু একটা জিনিস অন্য রুমগুলোর চেয়ে আলাদা ছিল। সেটা হল, রুমটায় কেউ ছিল না। একদম শূন্য। আরেকটা মলিন বা ম্লান আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। বাকি সব রুমগুলোতে কেউ না কেউ ছিল। এই একটা খালি দেখে আমার কাছে অদ্ভুত লাগল।
নালা ধরে পরের রুমটীয় গেলাম। ফিতা ধরে রাখার কেউ ছিল না কিন্তু সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করছিলাম না। আমি ধরেই নিয়েছিলাম আরো কিছু ছোট ছোট রুম পাবো যে কারনে ফিতা আপুর কাছে রেখে এসেছিলাম।
স্রোতের দিকে তৃতীয় রুমে আম্মুর বয়সি একজন মহিলাকে পেলাম।
তিনি আমাকে নালা থেকে উঠতে দেখে অবাক হলেন না। দূর থেকে দেখেই কেন জানি আমার মনে হচ্ছিল মহিলাটার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু একটা রয়েছে। তিনি জড়সড় হয়ে এক কোণায় বসে কাঁপছিলেন। প্রথম দেখায় যে তাকে আম্মুর বয়সি মনে হয়েছিল সেটা সম্ভবত ভুল, তিনি আরো কমবয়সি হবেন হয়ত।
সামনে তাকিয়ে দেখি নালার মাথায় একটা লোহার গেট লাগানো। এর বেশি আর যাওয়া সম্ভব নয়। তারমানে সোতের দিকের শেষ মাথায় চলে এসেছি।
“আপনি…আপনি ঠিক আছেন?” মহিলাটাকে জিজ্ঞেস করলাম। উনি কাঁধ ভাগ করলেন। ভয় মেশানো দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করলেন, “কে..?”
