আপু আরো একবার দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে চিৎকার করার চেষ্টা করল। আমরা শুনতে পারলাম কোন এক জায়গা থেকে কেউ কিছু একটা জবাব দিল।
“আমি জানতাম, কেউ একজন আছে ওখানে।”
কিন্তু তখনো আমরা কথাগুলো বঝতে পারছিলাম না।
দরজা দিয়ে আর কোন খাবার এলো না। মনে হচ্ছিল আমাদের শুধু সকালে খাবার দেয়া হবে। আপুর কাছে অভিযোগ করলাম কতটা খিদে পেয়েছে আমার। ও শুধু আমার সাথে চিৎকার করল।
রুমে কোন জানালা না থাকায় নিশ্চিত হয়ে কিছু বলা যাচ্ছিল না, কিন্তু আপুর ঘড়ি বলছিল তখন সন্ধ্যা ছয়টা বাজে। দরজার কাছ থেকে আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম দুর থেকে পায়ের শব্দ কাছে আসছে।
আপু রুমের কোণায় বসে ছিল তখন, মুখ তুলে তাকাল। আমি দরজা থেকে সরে এলাম।
পায়ের শব্দ আরো কাছে এল। আমরা ভেবেছিলাম কেউ একজন আমাদের রুমে আসছে। আমরা মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম সে এসে পুরো ব্যাপারটা আমাদেরকে ব্যাখ্যা করবে। আমরা দুজনেই দম বন্ধ করে অপেক্ষা করছিলাম কখন দরজাটা খুলবে। কিন্তু পায়ের শব্দ পার হয়ে গেল। মনে হল, আপুর মুখ থেকে রক্ত সরে গেল। ও দৌড়ে গেল দরজার দিকে।
“দাঁড়ান” ও মরিয়া হয়ে চিৎকার করল। লোটা আপুর অনুরোধ পাত্তা না দিয়ে হেঁটে চলে গেল।
“লোকটা যেই হোক, আমার মনে হয় না আমাদেরকে এখান থেকে বের হতে দেয়ার কোন ইচ্ছা তার আছে।” আমি বললাম।
“কিন্তু সেটা তো ঠিক না,” আপু বলল। ও ঠিক আমার মতই ভয় পেয়েছে।
ঘুম ভাঙার পর একটা পুরো দিন পার হয়ে গিয়েছে। সে সময় আমরা একটা ভারি দরজা খোলার আর বন্ধ হওয়ার শব্দ পেলাম। সেই সাথে মানুষের কণ্ঠস্বর আর ভারি যন্ত্রপাতির আওয়াজ। কিন্তু কোন আওয়াজই স্পষ্ট ছিল না। মনে হচ্ছিল বিশাল কোন প্রাণীর গর্জনের শব্দ শোনা যাচ্ছে-বাতাসের কম্পনের চেয়ে বেশি কিছু নয়।
দরজা আর খুলল না। আমরাও একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
দ্বিতীয় দিন : রবিবার
চোখ খুলেই আমি দেখলাম দরজার ফাঁক দিয়ে আবারো এক স্লাইস পাউরুটি দেয়া হয়েছে। এবার কোন পানি দেয়া হয়নি। আগের দিনের খালি বাটিটা সেখানেই পড়ে আছে। আপর ধারণা আমরা বাটিটা ফাঁক দিয়ে ফেরত দেইনি বলে পানি দেয়া হয়নি।
“ধ্যাত!” আপু বাটিটা তুলে নিতে নিতে বলল। বাটিটা ও এমনভাবে তুলল মনে হচ্ছিল যেন ছুঁড়ে ভেঙে ফেলবে। কিন্তু ভেঙে ফেললে আমাদেরকে হয়ত আর কখনোই পানি দেয়া না হতে পারে। আমি নিশ্চিত চিন্তাটা ওর মাথাতেও এসেছিল।
“আমাদেরকে এখান থেকে বের হতেই হবে।”
“তা তো অবশ্যই, কিন্তু সেটা কিভাবে?” আমি আস্তে করে প্রশ্ন করলাম। আপু এক মুহূর্তের জন্য আমার দিকে তাকিয়ে তারপর রুমের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া নালাটার দিকে তাকাল।
“এই নালাটা নিশ্চয়ই আমাদের টয়লেট করার জন্য রাখা হয়েছে।”
নালা দিয়ে অবিরাম পানি বয়ে যাচ্ছিল তখনো।
“নালাটা আমার জন্য অনেক সরু,” সে বলল, “কিন্তু আমার মনে হয় তুই এর মধ্যে দিয়ে যেতে পারবি, তুই শুকনা আছিস।”
আপুর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝলাম তখন প্রায় দুপুর।
আপু যা চাইছে তা হল আমি নালায় নেমে তারপর দেয়ালের নিচে দিয়ে বেরিয়ে যাই। যদি বিল্ডিঙের বাইরে যেতে পারি তাহলে হয়ত কারো সাহায্য চাইতে পারব। যদি বের হতে নাও পারি তাহলেও আশপাশ সস্পর্কে জানা হবে। ওর চিন্তা ভাবনা আমার পছন্দ হল না।
নালা দিয়ে নামতে হলে আমাকে আন্ডারওয়্যার ছাড়া সব খুলতে হবে। তারপর ওই গন্ধ পানির ভেতর না জানি কি লুকিয়ে আছে সেগুলো ঠেলে বের হতে হবে, এই ব্যাপারটাও আমার পছন্দ হচ্ছিল না। কিন্তু আপু অনুনয় করছিল।
“প্লিজ! তুই পারবি?”
অগভীর পানিতে এক পা দিয়েও আমি ইতস্তত করছিলাম। পানির তলে আমার পা সহজেই পৌঁছল। তলাটা পিচ্ছিল। নালার পানি আমার হাঁটু পর্যন্তও গভীর না।
দেয়ালের মাথায় যেখান দিয়ে পানি বেরিয়ে যাচ্ছিল, সেখানে অন্ধকার চারকোনা একটা গর্ত। গর্তটা ছোট হলেও আমার মনে হচ্ছিল সেটার ভেতর দিয়ে বের হতে পারব। পুরো ক্লাসের সবার মধ্যে সবচেয়ে ছোট সাইজ আমার।
মাথা নামিয়ে পানির যতটা কাছে যাওয়া সম্ভব গেলাম। বিচ্ছিরি দুর্গন্ধে চোখে পানি চলে এল। খুবই জঘন্য গন্ধ। চারকোনা গর্তের ওপাশে কি আছে তা দেখা যাচ্ছিল না। পানিতে ডুব দেয়া ছাড়া উপায় নেই।
ভয় পাচ্ছিলাম। যদি টানেলের ওপাশে ভয়ানক কিছু থেকে থাকে? বিপদজনক কিছু? তাহলে হয়ত আর ফেরত আসতে পারব না।
আপুকে কথাটা বলতে আপু আমার সব কাপড় চোপড় জোড়া আর আমাদের বেল্টগুলো দিয়ে একটা লাইফ লাইন বানালো। সেটার সাথে জুতার ফিতা দিয়ে আমার এক পায়ে বাধল। যদি আমি কোথাও আটকে যাই তাহলে ও আমাকে টেনে আনতে পারবে।
“কোনদিকে যাব প্রথমে?” ডান-বামে তাকিয়ে বললাম আমি। স্রোতের দিকে না সোতের বিপরীতে?
“যেদিকে তোর খুশি,” আপু বলল। “কিন্তু যদি মনে হয় টানেলটা অনেক লম্বা তাহলে ফেরত চলে আসবি।”
আমি ঠিক করলাম প্রথমে ঘোতের বিপরীত দিকেই যাব। অর্থাৎ দরজা থেকে বাম দিকের গর্তে। চোখ বন্ধ করে ডুব দিলাম। নোংরা পানিতে মনে হচ্ছিল পোকামাকড় সব আমার গায়ে কিলবিল করছে। দম ধরে রেখে চোখ বন্ধ করে গর্ত দিয়ে প্রথমে মাথা ঢুকালাম। টানেলের সিলিংটা খুবই নিচু আর সরু। মাথার পেছনটা সাথে সাথে সিলিঙের সাথে বাড়ি খেল। চারকোনা গর্তটা একদম আমার শরীরটা ঘষটে ঘষটে ঢুকানোর সমান চওড়া ছিল। মনে হচ্ছিল যেন সুইয়ের ফুটো দিয়ে সুতো ঢুকাচ্ছি। পানির মোত তেমন জোরালো ছিল না, যে কারনে আমাকেও খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।
