মাঝে মাঝে আমি আর আপু একজন আরেকজনের সাথে ঝগড়া করছিলাম।
“তোর উচিত ছিল বাসায় থাকা!”
“তুমি একটা স্বার্থপর!”
আপু এবার হাইস্কুলে উঠবে। কিন্তু আমি এরইমধ্যে ওর সাথে তর্কে পারদর্শী হয়ে উঠেছি। আমরা যখন তর্ক করতে করতে এগুচ্ছিলাম তখন পেছনে ঝোঁপের মধ্যে নড়াচড়ার শব্দ কানে আসে। ব্যাপারটা আমার কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছিল। ঘুরে তাকিয়ে দেখতে যাচ্ছিলাম এমন সময় মাথায় ভয়াবহ ব্যথা টের পাই। তারপর আর কিছু মনে নেই।
“কেউ নিশ্চয়ই পেছন থেকে আমার মাথায় বাড়ি দিয়েছিল। তারপর অজ্ঞান অবস্থায় আমাদের এখানে বয়ে এনেছে।”
আপু উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ঘড়ি দেখল।
“শনিবার! তারমানে রাত তিনটা বাজে এখন?”
ওর কব্জিতে একটা রুপালি রঙের এনালগ হাতঘড়ি। ঘড়ির ছোট ডিসেপ্লতে সপ্তাহের কোন দিন তাও দেখা যায়। ও ঘড়িটা এত ভালবাসে যে কখনো আমাকে ছুঁতেও দেয়না।
রুমটার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা তিন মিটার করে হবে। একদম নিখুঁত কিউবের মত। বাল্বের মলিন আলো রুমের শক্ত, রুক্ষ তলে অন্ধকার ছায়া ফেলছিল।
এক দেয়ালে একটা লোহার দরজা লাগানো। ভেতর থেকে কোন হাতল বা খোলার জন্য কিছু নেই। দেখে মনে হচ্ছিল যেন একটা ভারি লোহার পাত কংক্রিটের দেয়ালে গেঁথে আছে।
দরজার নিচে পাঁচ সেন্টিমিটারের মত একটা ফাঁক আছে যেটা দিয়ে বাইরের আলো দেখা যায়।
আমি শুয়ে দেখার চেষ্টা করলাম ফাঁক দিয়ে বাইরের কিছু দেখা যায় কিনা।
“কিছু দেখতে পাচ্ছিস?” আপু কাতর গলায় প্রশ্ন করল, কিন্তু আমি মাথা নাড়লাম।
রুমের দেয়াল আর মেঝে বেশ পরিস্কার। কেউ সম্ভবত কিছুদিনের মধ্যেই পরিস্কার করেছে, কোথাও কোন ধুলো দেখলাম না। আমার মনে হল আমরা যেন একটা ধূসর ঠান্ডা বাক্সের মধ্যে বন্দি হয়ে আছি।
সিলিঙের মাঝখানে লাগানো ইলেকট্রিক বাল্বটা হল আলোর একমাত্র উৎস। আমি আর আপু পুরো রুমটা ঘুরে দেখলাম। আমাদের ছায়াগুলো চার দেয়ালের মধ্যে জেগে উঠে আবার মিলিয়ে যাচ্ছিল। বাল্বের আলো খুবই দুর্বল ছিল, রুমের কোনাগুলোতে পুরোপুরি পৌঁছাতে পারছিল না।
রুমটার একটা ব্যাপার খুব অদ্ভুত ছিল। পঞ্চাশ সেন্টিমিটারের মত চওড়া একটা নালা রুমটাকে সমান দুটো ভাগে ভাগ করেছিল। দরজার দিকে মুখ করে দাঁড়ালে, নালাটা বাম দিকের দেয়ালের মাঝখান থেকে এসে ডানদিকের দেয়ালের ভেতর দিয়ে সোজা চলে গিয়েছিল। নালার পানি ছিল ঘোলাটে আর পানিতে বিদঘুঁটে গন্ধ ছিল। বাম থেকে এসে ডানে বয়ে যাওয়া এই পানি জঘন্য রঙের দাগ ফেলেছিল নালার গায়ে।
আপু দরজায় কিল মারছিল আর চিৎকার করছিল। “হ্যালো? কেউ শুনতে পাচ্ছেন?!”
কোন উত্তর নেই। দরজাটা একদম নিরেট, যত কিল ঘুষি মারা যোক, একটুও নড়ল না। ভারি দরজার উপর ওর হাতের বাড়ি রুমের ভেতর প্রতিধ্বনি তুলল। যেন নিষ্ঠুরভাবে আমাদের বোঝাতে চাইল আমরা এখানে কতখানি একা। আমি তখনো শক কাটিয়ে উঠতে পারিনি। কিছুটা বিষণ্ণতাও অনুভব করছিলাম। কি করে আমরা এখান থেকে বের হব? আমার বোনের ব্যাগটা উধাও। ব্যাগে ওর সেল ফোনটা ছিল। তারমানে বাসায়ও ফোন করতে পারব না।
আপু মেঝেতে মুখ চেপে দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে যতটা সম্ভব জোরে চিৎকার করে সাহায্য চাইল। ততক্ষণে ওর পুরো শরীর ঘেমে গোসল হয়ে গিয়েছে, কাঁপছিল।
এমন সময় কিছুটা দূরে কোথাও আমরা মানুষের কণ্ঠের ফিসফিসের মত কিছু একটা শুনতে পেলাম বলে মনে হল। আপু আর আমি একে অপরের দিকে তাকালাম। কাছাকাছি কোন মানুষ আছে বলে মনে হল। কণ্ঠস্বর যেহেতু পরিস্কার নয়, আমরা বুঝতে পারছিলাম না সে কি বলছিল। তারপরেও আমার মনে হল দুশ্চিন্তার ভার কিছুটা কমল।
এরপর বেশ কিছুক্ষণ আমরা দুজনেই পাল্লা দিয়ে দরজায় লাথি ঘুষি চালালাম, কিন্তু কোন কাজ হল না। একসময় দুজনেই হাঁপিয়ে গিয়ে হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম। মেঝেতে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।
***
সকাল আটটার দিকে আমার ঘুম ভাঙল।
আমাদের ঘুমের মধ্যে দরজার নিচ দিয়ে একটা প্লেটে এক স্লাইস পাউরুটি, আর এক বাটি পরিস্কার পানি ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। আপু রুটিটা দুভাগ করে অর্ধেকটা আমাকে দিল।
কে পাউরুটি রেখে গিয়েছে তা নিয়ে আমরা কিছুক্ষণ চিন্তা করলাম। যে আমাদেরকে এখানে আটকে রেখেছে সেই যে হবে তা নিয়ে আমাদের কোন সন্দেহ হচ্ছিল না। আমরা ঘুমালেও নালা দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছিল অবিরাম। বাজে গন্ধটায় আমার গা গুলিয়ে উঠছিল, মনে হচ্ছিল যেন কোথাও কিছু একটা পঁচে গিয়েছে। পানিতে মরা পোকামাকড় আর খাবারের উচ্ছিষ্টও ভেসে আসছিল।
আমার টয়লেটে যাওয়া দরকার ছিল। আপুকে বলতেই আপু দরজার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।
“মনে হয় না আমাদের এই রুমের বাইরে যেতে দেবে। তোকে এই নালাতেই কাজ সারতে হবে।”
আমরা বসে থেকে অপেক্ষা করছিলাম কখন রুম থেকে ছাড়া পাব। কিন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকলেও কেউ দরজা খুলে আমাদের মুক্ত করতে এল না।
“কে আমাদেরকে এখানে আটকে রেখেছে, এবং কেন?” আপু রুমের মধ্যে পায়চারি করতে করতে বিড়বিড় করল। আমি কোন উপায় না দেখে নালায় বাথরুম সারলাম। কংক্রিটের ধূসর দেয়াল, ইলেকট্রিক বাল্বের মলিন আলো আর অন্ধকার ছায়া, আপুর ক্লান্ত চেহারা…সবকিছু আমাকে বিষণ্ণ করে তুলছিল। আমি এই রুম থেকে বের হতে চাই, যত দ্রুত সম্ভব।
