ইমারজেন্সি ব্যবস্থার পর থেকে আমার শরীর ব্যান্ডেজ দিয়ে মোড়ানো ছিল। সে আমার ঘাড়ের কাছের ব্যান্ডেজ ঠিক করে দিল। জানালা দিয়ে সূর্যের উষ্ণ আলো এসে আমার কোলের উপর পড়ছিল। সবকিছুই উষ্ণ ছিল। দয়াল আর নরম। এগুলো যখন আমি অনুভব করছিলাম তখন টের পেলাম হৃদয়ের সব বিয়োগাত্মক অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
“আমাকে সৃষ্টি করার জন্য তোমার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ,” কথাগুলো নিজে নিজেই আমার ঠোঁটগুলো থেকে বেরিয়ে এল। “কিন্তু আমি আবার তোমাকে ঘৃণাও করি।”
বুকের উপরে মাথা রাখার কারনে আমি ওর মুখ দেখতে পারছিলাম না, তবে বুঝতে পারছিলাম যে সে মাথা উপর নিচ করল।
“তুমি যদি আমাকে তোমার কবর দেয়ার জন্য সৃষ্টি না করতে, তোমার অসুস্থতার পরিচর্যা করতে না দিতে, তাহলে আমি মৃত্যুভয় কি বা কারো মৃত্যু হলে হারানোর যে অনুভূতি হয় তা কখনোই জানতে পারতাম না।”
ওর দুর্বল আঙুলগুলো আমার চুল স্পর্শ করল।
“আমি যত বেশি কিছু একটাকে ভালবাসব, সেটাকে হারানোর পর ততই বেশি আমার হৃদয় কেঁদে উঠবে। আর বাকি যতটা সময় আমি বেঁচে থাকব, বার বার আমাকে এই কষ্টটা ভোগ করে যেতে হবে। ব্যাপারটা খুবই নিষ্ঠুর। এরকমই যদি হয় তাহলে আমি কখনোই আর ভালবাসতে চাই না। আমি একজন হৃদয়হীন ব্যক্তি হতে চাই…”
বাইরে কোথাও একটা পাখি ডাকছিল। আমি চোখ বন্ধ করে কল্পনা করলাম আকাশে এক সাথে অনেক পাখি উড়ে যাচ্ছে। আমার গাল বেয়ে অণু গড়িয়ে পড়ল।
“এখন অবশ্য আমি কৃতজ্ঞ। আমি যদি এই পৃথিবীতে কখনো জন্ম না নিতাম তাহলে এই ঘেসো পাহাড়টাকে কখনোই দেখা হত না। যদি আমার হৃদয় না থাকত তাহলে একটা পাখির বাসা দেখার মধ্যে কখনোই আনন্দ খুঁজে পেতাম না, তেতো কফিতে চুমুক দিয়ে মুখ বাঁকাতে পারতাম না। এই উজ্জ্বল রত্নের মত মূল্যবান বিষয়গুলো অনুভব করতে পেরে আমার নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। সেভাবে যদি চিন্তা করা হয়, তাহলে আমার হৃদয় থেকে যতই রক্তপাত হোক না কেন, এসবই আসলে আমার বেঁচে থাকার পক্ষে প্রমাণ।”
অদ্ভুত একটা ব্যাপার, তাই না? একই সাথে কৃতজ্ঞতা আর অসন্তোষ দুটোই অনুভব করা? কিন্তু আমার এরকমই মনে হচ্ছিল। আসলে আমার মনে হয় সবাইই এভাবে চিন্তা করবে। এমনকি যে মানুষের সন্তানেরা অনেক বছর আগে মারা গিয়েছে, তারাও তাদের পিতা-মাতা সম্পর্কে এরকমই পরস্পরবিরোধী চিন্তাই করত। ওদেরকে ভালবাসা আর মৃত্যু সম্পর্কে শিক্ষা দিয়ে বড় করা হত। আর তারা তাদের জীবন পার করত এই দুনিয়ার আলোকোজ্জল অংশ থেকে অন্ধকার অংশে ভ্রমনের মধ্য দিয়ে।
আর সেই সন্তানেরা বড় হয়ে একইভাবে দুনিয়াতে নতুন জীবন আনার ভার গ্রহণ করত।
আমি পাহাড়ের পাদদেশে, তোমার চাচা যেখানে ঘুমিয়ে আছে তার পাশে তোমার জন্য কবর খুঁড়ব। সেখানে তোমাকে শুইয়ে চাদরের মত মাটি দিয়ে ঢেকে দেব। একটা ক্রুশ দাঁড় করাব আর কুয়ার কাছ থেকে বুনো ফুলের চারা এনে লাগিয়ে দেব। প্রতিদিন সকালে আমি তোমাকে অভিবাদন জানাবো। আর সারাদিন কি হল তা প্রতি সন্ধ্যায় এসে রিপোর্ট করব।
এরপর ঐ বেঞ্চে আমরা চুপচাপ একজন আরেকজনকে ধরে বসে থাকলাম। দুপুর প্রায় হয়ে এসেছিল। ওর শরীরে মোটরগুলোর শব্দ আরো ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে আমি আর কোন শব্দ শুনতে পেলাম না। অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ফিস ফিস করে বললাম, “গুড বাই।”
সেভেন রুমস
প্রথম দিন : শনিবার
জ্ঞান ফেরার পর প্রথমে বুঝে উঠতে পারছিলাম না কোথায় আছি। খুব ভয় হচ্ছিল। প্রথম যা মনে পড়ে তা হল একটা দুর্বল হলুদ বা অন্ধকারে মলিন আলো ছড়াচ্ছিল। চারদিকে ধূসর কংক্রিটের দেয়াল। চারকোনা রুমটায় কোন জানালা ছিল না। আমি মেঝেতে পড়ে ছিলাম, যেন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম।
হাতে ভর দিয়ে ফ্লোরের উপর উঠে বসলাম। কংক্রিটের মেঝের রুক্ষতা ভালই টের পাচ্ছিলাম। রুমে চোখ বোলাতে গিয়ে মাথার ভেতর ব্যথায় ছ্যাঁত করে উঠল, মনে হল যেন ব্যথায় দুভাগ হয়ে যাচ্ছে।
এমন সময় কোথাও গোঙানির শব্দ পেলাম। আমার বড় বোন দুহাতে মাথা চেপে এক পাশে পড়ে আছে।
“আপু, কি হয়েছে! তুমি ঠিক আছ তো?”
আমার শরীর কাঁপছিল। আপু চোখ খুলল। আমার মত চারদিকে তাকিয়ে দেখল।
“আমরা কোথায়?”
“জানি না,” সাবধানে মাথা নেড়ে বললাম।
ছাদ থেকে ঝুলে থাকা নগ্ন বাটা ছাড়া পুরো রুমে আর কিছু নেই। কিছু না। আমাদের দুজনের কারোরই মনে নেই কিভাবে এখানে এসেছি।
আমার শুধু মনে আছে শহরতলীর একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের কাছে দুপাশে গাছে ঢাকা একটা রাস্তা দিয়ে আমি আর আপু হাঁটছিলাম। আম্মু শপিং করছিল, আর আপু আমার দেখাশোনা করছিল। আমরা দুজনেই ব্যাপারটা নিয়ে বিরক্ত ছিলাম। আমার বয়স দশ, আমাকে বেবিসীট করার কিছু নেই। আর আমার বোনেরও ছোট ভাইকে দেখাশোনা করা ছাড়া
জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। কিন্তু আম্মু কিছুতেই আমাদের একা ছাড়তে রাজি ছিলেন না।
তাই আমরা একজন আরেকজনের সাথে কথা না বলে চুপচাপ রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। আমার মনে আছে যে রাস্তার চারকোনা ইটগুলো একটা বিশেষ প্যাটার্ন ধরে বসানো ছিল। রাস্তার সাথের গাছগুলো আমাদের মাথার উপর ছাদের মত ছড়িয়ে ছিল।
