ঐ মুহূর্তে আমি উপলদ্ধি করলাম যে ব্লকগুলো দিয়ে করার মত একটা জিনিস আমার জানা আছে। আমার মনে আছে কিভাবে জাহাজ বানাতে হয়। আমি ওকে জাহাজটা বানাতে দেখেছিলাম, সেটা আমার মনে আছে। ও যেভাবে করেছিল সেভাবে আমি একটা একটা করে ব্লক জোড়া দিয়ে জাহাজটাকে আবারও বানালাম।
বানানো শেষ হওয়ার পর আমি কেঁদে ফেললাম। হয়তো, হয়তো। হৃদয়ের গভীরে আমি এই জিনিসটাই চিন্তা করেছিলাম, বার বার, অসংখ্যবার।
***
পরদিন সকালে পুরো আকাশ একদম নীল হয়ে ছিল। শুধুই নীল, আর কিছুই না। এই মাথা থেকে ঐ মাথা পর্যন্ত নীল, কোন মেঘ ছিল না। সে তখনো ঘুমাচ্ছিল। আমি কুয়ার কাছে দাঁড়িয়ে দাঁত ব্রাশ করলাম, মুখ ধুলাম। কুয়া থেকে পানি তুলে বালতিতে ভরলাম। কিছু পানি কাছের ফুল গাছগুলোতে ঢালোম। ফুলগুলোর পাপড়ি পানির ফোঁটার ভারে একদিকে কাত হয়ে ছিল। পানির ফোঁটাগুলো মাটিতে পড়ে সূর্যের উজ্জ্বল আলোয় চকমক করে উঠলে আমি তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম।
এতদিন মেঘলা থাকায় একগাদা জামা কাপড় জমে গিয়েছিল। আমি ঠিক করলাম সব ধুয়ে ফেলা যাক। ভেজা কাপড়গুলো বাইরে শুকোতে দেয়ার সময় আমার শরীরের ব্যান্ডেজ ঢিলে হয়ে গেল। আমাকে থেমে আবার সব ঠিক করে বেঁধে নিতে হল।
লন্ড্রির কাজ শেষ হওয়ার পর আমার খেয়াল হল সে জানালা দিয়ে আমাকে দেখছে। ওর বেডরুমের জানালা নয়, হলওয়ের যে বসার জায়গাতে সূর্যের আলো পড়ে সেখান থেকে। আমি দৌড়ে ওর কাছে গেলাম।
“তুমি কি ঠিক আছ, এভাবে উঠে পড়লে যে?”
“আমি এই জায়গায় বসে মরতে চাই।” মনে হল সে তার শেষ শক্তিটুকু খরচ করে এই জায়গায় এসে বসেছে।
আমি বাড়ির ভেতর গিয়ে তার পাশে বসলাম। মাত্র শুকোতে দেয়া কাপড়গুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। সাদা রঙটা যেন একদম ঠিকরে বের হচ্ছিল। চমত্যার একটা সকাল, মৃত্যুর কোন চিহ্ন কোথাও নেই।
“আর কয় ঘন্টা বাকি?” বাইরে তাকিয়ে আমি জানতে চাইলাম। সে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল, তারপর জানাল আর কতক্ষন বাকি, সেকেন্ডে।
“এই যে মৃত্যুটা ঐ জীবাণুগুলো বয়ে আনে, তাদের সময়জ্ঞান কি খুবই নিখুঁত?”
“কি জানি।”
ওর কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল। আমি প্রশ্ন করলাম, “তুমি কি আমাকে একটা নাম দিতে পারোনি, একইভাবে আমি যেরকম ছবি আঁকতে বা মিউজিক করতে পারি না?”
অবশেষে সে জানালা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমার দিকে তাকাল।
“আমি আমার মৃত্যুর নির্দিষ্ট সেকেন্ডটা জানি, আমার মত কারোর জন্য জীবনের শর্তাবলী পূর্বনির্ধারিত। আর তোমার জন্যও…”
সত্যি কথা হল, জীবাণুগুলো ওকে কখনোই সংক্রমিত করেনি। ও একজন মানুষকে ব্লকগুলো দিয়ে জাহাজটা বানাতে দেখেছিল। যে কারনে ও নিজেও জাহাজটা বানাতে পারত। ও এমন একটা পৃথিবীর একমাত্র উত্তরসুরী ছিল যেখানের সব মানুষ মারা গিয়েছিল। সে আমার মুখের দিকে এক মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে থাকল, তারপর মাথা নিচু করল। ফ্যাকাসে মুখটার উপর ছায়া জমল।
“আমি দুঃখিত, তোমাকে মিথ্যে বলেছি…”
আমি ওকে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে আমার মাথা রাখলাম। ছোট ছোট মোটর চলার ক্ষীণ শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।
“কেন তুমি মানুষ সাজার ভান করেছ?”
নিচু কণ্ঠে সে ব্যাখ্যা করল যে সে তার মন থেকে তার চাচার মত হতে চেয়েছিল। চাচাই ওকে তৈরি করেছিলেন। মাঝে মাঝে আমার মনে হত মানুষ হলে ভাল হত। এখন মনে হচ্ছে ওরও একইরকম মনে হত।
“প্রথমে আমি ভেবেছিলাম তুমি বোধহয় ওভাবে কিছু দেখতে পাবে না।”
ও ভেবেছিল আমাকে যদি বলা হয় যে একজন মানুষ আমাকে তৈরি করেছে, আমার মত কেউ তৈরি করেনি, তাহলে আমার কষ্ট কম হবে।
“তুমি একটা বোকা।”
“এখন সেটা বুঝতে পারছি।” কথাটা বলতে বলতে সে আলতো করে আমার মাথায় হাত রাখল। অন্তত আমার কাছে ও একজন মানুষ কি মানুষ
তাতে কিছু আসে যায় না। আমি ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকলাম। অবশিষ্ট সময়টা আর অল্পই বাকি ছিল।
“আমি চাইছিলাম আমার চাচার পাশে সমাহিত হত। আমার দরকার ছিল এমন কাউকে, যে কিনা কোদাল দিয়ে আমার উপর মাটি ঢেলে দিতে পারে। আর এই স্বার্থপর কারনে আমি তোমাকে তৈরি করেছি।”
“কত বছর ধরে তুমি এই বাড়িতে একা ছিলে?”
“চাচা মারা যাওয়ার পর দুইশ বছর পার হয়ে গিয়েছে।”
যে আবেগগুলো আমাকে তৈরি করার পেছনে ওকে তাড়না দিয়েছে সেগুলো আমি ভাল করেই বুঝতে পারছিলাম।
যে মুহূর্তে মৃত্যু ডাকতে হাজির হয়, সে মুহূর্তে কেউ একজন যদি হাত ধরে বসে থাকে তাহলে কত ভালই না হয়। আর তাই যে মুহূর্তে মৃত্যু ওকে নিয়ে যাবে সে মুহূর্ত পর্যন্ত আমি ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকতে চাইছিলাম। তাহলেই সে বুঝতে পারবে যে সে একা নেই।
একটা সময় আসবে যখন হয়ত আমাকেও মৃত্যুবরণ করতে হবে, তখন ও যা যা করেছে আমিও একই কাজ করব। যা যা যন্ত্রপাতি, প্ল্যান আর পার্টস প্রয়োজন, সবই গুদামঘরে রাখা আছে। যখন আমি আর নিজের একাকীত্ব সহ্য করতে পারব না তখন হয়ত আমি আমাকে কাছ থেকে ধরে রাখার জন্য নতুন একটা জীবন তৈরি করে নেব। আর তাই আমি ওকে ক্ষমা করে দিলাম।
আমরা দুজন একত্রে ঐ বেঞ্চে বসে চুপচাপ একটা সকাল কাটালাম। পুরোটা সময় আমি ওর বুকে আমার কান চেপে রেখেছিলাম। সে কিছুই বলছিল না, শুধু জানালা দিয়ে বাইরে শুকোতে দেয়া কাপড়গুলো বাতাসে নড়তে দেখছিল।
