“বুঝতে পেরেছি,” আমি বললাম, কান্নার কারনে আমার কণ্ঠ থেমে যাচ্ছিল। “তোমার জন্য খারাপ লাগছে।”
সে কেন আমাকে তৈরি করেছিল? এই দুনিয়ায় যদি আমার জন্ম না হত তাহলে আমাকে কোন কিছু ভালবাসতে হত না কিংবা কোন আবেগ অনুভব করতে হত না। মৃত্যু ভয়ও পেতে হত না আমাকে।
অপারেটিং টেবিলে শোয়া অবস্থায় আমি ফোঁপাতে ফোঁপাতে এই কথাগুলো মুখ দিয়ে বের করে আনতে সক্ষম হলাম।
“আমি তোমাকে ভালবাসি। তোমাকে কবর দিতে হবে ভাবতে আমার কষ্ট হচ্ছে। আমার হৃদয়ে প্রচণ্ড কষ্ট অনুভুত হচ্ছে। ভাল হত যদি আমার কোন হৃদয় না থাকত। এরকম হৃদয় দেয়ার জন্য আমি তোমাকে ঘৃণা করি।”
তার মুখটা বিষাদপূর্ণ হয়ে ছিল।
***
আমার পুরো শরীর ব্যান্ডেজে মোড়ানো অবস্থায় আমি ঠাণ্ডা শক্ত হয়ে যাওয়া খরগোশটাকে তুলে নিয়ে ভূগর্ভস্থ গুদাম ঘর থেকে বের হলাম। বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গিয়েছে, ঘাস ভূমির উপর ভ্যাপসা রকমের বাতাস ঝুলে ছিল। বাইরে তখন অন্ধকার, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম যে কোন মুহূর্তে ভোর হবে। মেঘগুলো আকাশ জুড়ে সরে যাচ্ছে। আমার পেছনে সে দরজা খুলে বেরিয়ে এল।
ইমারজেন্সি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আমি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছিলাম। অবশ্য মেরামতের সব কাজ শেষ হয়নি। হঠাৎ কোন নড়াচড়া করা আমার জন্য নিষেধ ছিল। আপাতত নিজে নিজে কোন মেরামতির কাজ করার কোন ইচ্ছা আমার নেই। আমাকে এখনো বাড়ির কাজ করতে হবে আর তার জন্য খাবার তৈরি করতে হবে।
আস্তে আস্তে আমরা বাড়ির দিকে হেঁটে গেলাম। সূর্য তখন পুব আকাশে আলো ছড়াতে শুরু করেছে। আমরা ওর চাচার কবরের ক্রসের সামনে থামলাম।
“আর চার দিন,” সে বলল।
ঐ সকালে আমি খরগোশটাকে কবর দিলাম। সবুজ উঠোনটার এক কোণায়, যেখানে অনেক পাখির আগমন ঘটে। আমার মনে হয়েছিল পাখিগুলো হয়ত খরগোশটাকে সঙ্গ দিতে পারবে। আমি যখন মাটি দিয়ে কবরটা ভরাট করছিলাম আমার মনে হচ্ছিল বুকের উপর ভারি একটা বোঝা আমাকে নিচের দিকে টানছে। একই জিনিস আমার ওর জন্যও করতে হবে। এই কথা চিন্তা করে আমার সন্দেহ হল আমার সেই শক্তি আছে কিনা।
এরপর সে একতলার বিছানায় গিয়ে শুল এবং আর উঠল না। সে শুধু বিছানার কিনারায় শুয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকত, আমি ব্রেকফাস্ট বানিয়ে তার জন্য নিয়ে আসতাম। আমি আর হাসতে পারছিলাম না। ওর পাশে থাকা আমার জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
একসময় আমি বুঝতে পারলাম কেন সে সবসময় জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে পছন্দ করত। আমার মত, সেও এই পৃথিবীকে ভালবাসত। তাই মৃত্যু এসে তাকে নিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সে চেয়েছিল ভাল করে সব দেখে মনে গেঁথে নিতে। এরকম একটা মানুষের সাথে আমি যতটা সম্ভব সময় কাটাতে চাইছিলাম। একসময় আমি অনুভব করতে পারছিলাম যে তার মৃত্যু নিকটে চলে এসেছে। বাড়ির যে কোন স্থানেই আমি তা অনুভব করতে পারছিলাম।
সেই ঝড়ের পর থেকে আকাশ এখনো মেঘলা। কোন বাতাস নেই, কিচেনের জানালার উইন্ড চাইমটাও তাই নীরব। রেকর্ডগুলো বাজানোর কোন শক্তি আমাদের ছিল না। পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ হয়ে ছিল। একমাত্র শব্দ যা হচ্ছে, তা হল আমার পায়ের নিচে আলগা কাঠের তক্তার কাঁচকোঁচ শব্দ।
“লাইট বাল্বটা নষ্ট হওয়ার সময় হয়ে এসেছে,” এক সন্ধ্যায় সে বলল, বরাবরের মত জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। উঠোনের বাগুলোর একটা ম্লান হয়ে মিটমিট করছিল। এভাবে কিছুক্ষণ থেকে একবার চমকে উঠে অন্ধকার হয়ে গেল।
“কাল দুপুরের মধ্যেই আমি মারা যাব,” নিভে যাওয়া বাটার দিকে তাকিয়ে সে বলল।
সে যখন ঘুমিয়ে পড়ল, আমি তখন সিঁড়ি বেয়ে দোতালায় গেলাম। ঐ রুমটায় গেলাম লাল রঙের জাহাজটাকে আবার দেখতে। ওটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি চিন্তায় ডুবে দিয়েছিলাম।
আমি ওকে ভালবেসেছিলাম। কিন্তু একই সাথে কিছু একটা আমার হৃদয়ে গেঁথে ছিল। আমাকে এই পৃথিবীতে আনার জন্য তার প্রতি অসন্তুষ্টি অনুভব করছিলাম। একটা কালো মেঘ আমার হৃদয়টাকে ছেয়ে ফেলল।
ওর সাথে আমার সম্পর্কটার সংজ্ঞা ছিল এরকম বিভিন্ন ধরনের জটিল আবেগের সংমিশ্রন। শ্রদ্ধা আর অসন্তোষের সংমিশ্রণ। কিন্তু এর কিছুই আমি বাইরে প্রকাশ করিনি।
আমার ভেতরে যে ঝড় যাচ্ছিল সেটা তার জানার কোন প্রয়োজন নেই। কাল দুপুরে আমি শুধু তাকে আমাকে সৃষ্টি করার জন্য ধন্যবাদ জানাবো। কোন সন্দেহ নেই যে সেটাই ওর মৃত্যুর জন্য সেরা উপায় হবে, কোনরকম কোন অনুশোচনা ছাড়া।
আমি ব্লক জোড়া দিয়ে বানানো লাল রঙের জাহাজটা হাতে নিলাম। ঠিক করেছি আমি আমার সমস্ত অসন্তোষ আর অন্ধকার আবেগগুলোকে আমার হৃদয়ের গভীরে চাপা দেব। কিন্তু যতবারই আমি এসব নিয়ে চিন্তা করছিলাম ততবারই নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। আমি ভীত ছিলাম। আর আমার মনে হচ্ছিল আমি তাকে মিথ্যা বলছি।
হঠাৎ জাহাজের যে জায়গাটায় ধরেছিলাম সে জায়গাটা খুলে এল। জাহাজের হালটা ভেঙে মেঝেতে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। আমি সবগুলো টুকরো এক জায়গায় জড়ো করে ভাবছিলাম কি করব এখন। আমার মত কেউ একজন, যে কিনা মানুষ নয়, যে কিনা কখনো ছবি আঁকতে পারবে না, মূর্তি গর্তে পারবে না কিংবা সঙ্গীত রচনা করতে পারবে বা। সে মারা যাওয়ার পর এই ব্লকগুলো আজীবনের জন্য এরকম খোলাই থেকে যাবে।
