আমার অর্ধেক শরীর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। একটা পা ঝুলছিল, কোন কাজ করছিল না। তলপেট থেকে বুক পর্যন্ত একটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল। আমার ভেতরের যন্ত্রপাতি সব বেরিয়ে আসতে চাইছিল কিন্তু আমি নিশ্চিত ছিলাম নিজের শক্তিতে বাড়ি ফিরে যেতে পারব।
বুকে ধরে থাকা খরগোশের দিকে তাকিয়ে দেখি সাদা পশম লাল হয়ে আছে। আমি বুঝতে পারলাম সেটা ওর রক্তের দাগ। খরগোশের শরীরটা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল। আমার মনে হচ্ছিল আমি অনুভব করতে পারছিলাম যে এর শরীরের সব উষ্ণতা আমার হাত দিয়ে বয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
বাড়ি ফেরার সময় পুরোটা পথ আমি দুহাত দিয়ে খরগোশটা ধরে ছিলাম। আমি এক পায়ে লাফাতে লাফাতে এগুচ্ছিলাম আর আমার শরীর থেকে নাটবল্ট খুলে খুলে মাটিতে পড়ছিল। থামানোর জন্য আমার কিছু করার ছিল না। পিঠে বৃষ্টির ঝাপ্টা লাগছিল।
বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথে আমি তাকে খুঁজতে লাগলাম।
আমার শরীর থেকে পানি ঝরে মেঝে ভেসে গিয়েছে। চুলগুলো ত্বকের সাথে লেপ্টে আছে। আমার সিনথেটিক ত্বকের বেশিরভাগই ঝড়ে খসে গিয়েছিল। সে জানালার পাশে বসে ছিল, যেখান থেকে বাগানটা দেখা যায়। আমার অবস্থা দেখে সে ধাক্কা খেল।
“আমাকে ঠিক কর, প্লিজ,” আমি বললাম। কি ঘটেছে তা খুলে বললাম।
“ঠিক আছে,” সে বলল। “চল গুদাম ঘরে যাই।”
“আর তুমি কি একেও ঠিক করত পারবে?” আমি মিনতির সুরে বললাম, দুহাতে খরগোশটাকে ওর দিকে বাড়িয়ে দিলাম।
সে মাথা নাড়ল। খরগোশটা ইতিমধ্যে মরে গিয়েছে। সে আমাকে বলল। খরগোশটা পতনের ধাক্কা হজম করতে পারেনি। ওটা আমার কোলের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে।
আমার মনে পড়ছিল খরগোশটা যখন বাগানের ভেতর দিয়ে ছুটোছুটি করত, কত চটপটে ছিল সেটা। আর আমি আমার কোলে থাকা মৃত প্রাণীটার দিকে তাকালাম। এর সাদা পশমে লাল রক্তের দাগ, আর চোখগুলো আজীবনের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ও যখন আমাকে গুদাম ঘরের দিকে যেতে তাড়া দিল তখন ওর কণ্ঠ অদ্ভুত কোন কারনে মনে হচ্ছিল দূর থেকে ভেসে আসছে। সে আমাকে দ্রুত পরীক্ষা করে মেরামত করতে চাইছিল।
“আঃ…আঃ।” আমি মুখ হাঁ করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু কোন শব্দ বের হল না। বুকের গভীরে চাপা একটা কষ্ট অনুভব করছিলাম। যদিও সেটার সাথে আমার শারীরিক কষ্টের কোন সম্পর্ক ছিল বলে মনে হচ্ছে না, তবু অন্য কোন শব্দ আমার মাথায় এল না। আমার দেহ শক্তি হারিয়ে ফেলল আর আমি হাঁটু ভেঙে পড়ে গেলাম।
“আ-আমি…” আমি আবিষ্কার করলাম আমার অশ্রু নির্গত করার ক্ষমতা আছে। “আমি এই ছোট প্রাণীটার সাথে অনেক বেশি জড়িয়ে গিয়েছি।”
সে আমার দিকে তাকাল, তার চোখে সমবেদনার চিহ্ন। “এরই নাম মৃত্যু,” সে বলল, আমার মাথার উপর হাত রাখল। তখন আমি বুঝতে পারলাম। মৃত্যু অর্থ হারানোর উপলদ্ধি।
৪
ও আর আমি একসাথে হেঁটে হেঁটে ভূগর্ভস্থ গুদাম ঘরে গেলাম। প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে, ঝড়ের ভেতর প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আমি তখন এক পায়ে লাফাচ্ছিলাম, খরগোশটা বুকের কাছে ধরে রাখা। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সে বলেছিল খরগোশটা বাড়িতে রেখে যেতে কিন্তু আমি সেটা করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত অপারেটিং টেবিলে যখন আমার উপর ইমারজেন্সি প্রক্রিয়া চলছিল তখন খরগোশটা আমার পাশের ডেস্কে রাখা ছিল।
আমি সিলিঙের লাইটের ঠিক নিচে চিত হয়ে পড়ে ছিলাম। প্রায় দুই মাস আগে এখানে এভাবেই শুয়ে ছিলাম আমি। চোখ খুলে তাকানোর পর সে আমাকে “গুড মর্নিং” জানিয়েছিল। এটাই আমার প্রথম স্মৃতি।
সে আমার দেহের ভেতরটা পরীক্ষা করল। কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। বিরতি নিয়ে নিয়ে কাজ করছিল। ক্লান্ত হয়ে পড়লে চেয়ারে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে।
পরীক্ষা করার সময় আমি আমার মাথাটা একদিকে ঘুরিয়ে রেখেছিলাম যাতে খরগোশটাকে দেখতে পাই। খুব শিগগিরি সেও খরগোশটার মত নিশ্চল হয়ে পড়বে। শুধু সেই নয়, এক পর্যায়ে সবকিছুরই মৃত্যু ঘটবে, আমারও। এখন আমি তা জানি। আগে কখনো এই জানাটার সাথে ভয় যুক্ত ছিল না, যেটা এখন আছে।
আমি আমার মৃত্যুর কথা চিন্তা করলাম। এর অর্থ একসময় শুধু থেমে যাওয়া নয়। এর অর্থ পৃথিবীর সবকিছু থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া, এমনকি নিজের থেকেও। আর এই কথাটা সবসময় সত্যিই থাকবে যতই আমি কোন কিছু ভালবাসি না কেন। এই ব্যাপারটাই মৃত্যুকে ভয়ানক রকমের বিষাদগ্রস্থ করে তোলে।
একজন যত বেশি ভালবাসে, মৃত্যুর অর্থ ততটাই ভারি হয়, হারানোর অর্থ ততটাই গম্ভীর হয়। ভালবাসা আর মৃত্যু কোন আলাদা বিষয় নয়, একই জিনিসের সামনের আর পেছনের দিক।
সে যখন আমার শরীরের জিনিসপত্র ঠিক করছিল, পুরোটা সময় আমি নীরবে ফোঁপাচ্ছিলাম। অর্ধেকের মত মেরামত হলে সে বিশ্রাম নেয়ার জন্য বসল।
“ইমারজেন্সি কাজটুকু কালকের মধ্যে শেষ হবে। তবে পুরো কাজ শেষ। করতে আমার আরো তিনদিন সময় লাগবে।
ওর শরীর তার শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। এর মানে হল মূল কাজ শেষ হওয়ার পর বাকি কাজ আমাকেই করতে হবে। আমার শরীরের সাধারণ কাজ কিভাবে হয় তা আমার জানা ছিল। যদিও আমার কোন অভিজ্ঞতা ছিল না কিন্তু যদি চেষ্টা করি তাহলে আমি নিশ্চিত, প্রয়োজনীয় সব কাজ নিজেই সারতে পারব।
