আমি বুঝতে পারি যে সে তার চাচাকে গভীরভাবে ভালবাসত। সেকারনে চাইত চাচার পাশে সমাহিত হতে। সেজন্যই আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছিল-তার অসুস্থতার সময় তার সেবা করার জন্য, যতক্ষণ না মৃত্যু এসে হাজির হয়।
আমি যেখানে বসেছিলাম তার পাশের মেঝেতে একটা আধ খাওয়া রুটি ধপ করে পড়ল। সে ফেলেছে। ধপ শব্দটা খুবই ক্ষীণ ছিল, বাতাসের মৃদু একটা ঝাপ্টার মত।
ওর ডান হাত হালকা কাঁপছিল। সে সেটা নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। কাঁপতে থাকা হাতটার দিকে শান্তভাবে তাকিয়ে থেকে সে আমাকে প্রশ্ন করল, “তাহলে, এখন কি তুমি বুঝতে পারছ মৃত্যু কিরকম?”
“এখনো না। কি রকম?”
“ভীতিকর।”
আমি রুটিটা তুলে নিয়ে ট্রেতে রাখলাম। সঙ্গত কারনে সেটা না খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি এখনো ভালমত মৃত্যুকে বুঝতে পারছি না। জানি কোন এক সময় আমি নিজেও মারা যাব। কিন্তু আমি ভীত নই। হঠাৎ করে থেমে যাওয়ার মধ্যে কি ভয়ের কিছু আছে? এই বিরাম এবং ভীতির মধ্যে কোথাও কিছু একটা আছে যা আমি দেখতে পাচ্ছি না। আর সেটাই আমাকে জানতে হবে।
আমি মাথা কাত করে তার দিকে তাকালাম। সে হয়ত খেয়াল করছিল যে তার হাতগুলো তখনও কাঁপছে। তার চোখগুলো জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। আমিও বাইরে তাকালাম।
উঠোনটা আলোকিত হয়ে ছিল, উজ্জ্বলতা এতটাই বেশি ছিল যে আমাকে চোখ সরু করতে হল। বাড়িটা ঘিরে থাকা বনের দিকে তাকালাম, পাশেই থাকা জরাজীর্ণ ডাকবাক্স, পরিত্যাক্ত ট্রাক আর বাগান। সবজির সারির উপর ঘোট ঘোট প্রজাপতি উড়াউড়ি করছে।
একটা ছোট সাদা তুলোর বল সবুজ পাতার ছায়ার ভেতর অর্ধেক লুকানো অবস্থায় বসে ছিল। একটা খরগোশ। আমি উঠে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেলাম। আমি জানি এটা সঠিক আচরণ হল না কিন্তু যে মুহূর্তে আমি খরগোশটাকে দেখেছি আমার মনে হয়েছে এটা আমাকে শিকার করতে কিছুটা সুবিধা দেবে।
***
তার মৃত্যুর পাঁচ দিন আগের দিনটাতে আকাশ ছিল মেঘলা। আমি বনে গিয়েছিলাম বন্য সবজি জোগাড় করতে। গুদাম ঘরে প্রচুর খাবার জমা করা থাকলেও সে মনে করত বাগানের টাটকা সবজি আর প্রাকৃতিক খাদ্য খাওয়াই ভাল।
হঠাৎ হঠাৎ কোন খবর না দিয়েই ওর হাত পা কাঁপতে শুরু করত। এই পর্বগুলো বেশিক্ষণ চলত না ঠিকই কিন্তু নিয়মিত ঘটতে লাগল। সে তার মোটর ফাংশন এর নিয়ন্ত্রন হারাতে শুরু করেছিল। যেমন, সে হয়ত এক কাপ কফির জন্য হাত বাড়াল কিন্তু কফিটা টেবিলের উপর ছড়িয়ে ফেলল। এই ক্রমশ খারাপ হতে থাকা শারীরিক অবস্থার মধ্যেও সে তার ধৈর্য ধরে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করত। সে কখনো বিরক্ত হত না, শরীর সাড়া না দিলে সে শুধু ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে থাকত।
বনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি একটা গিরিখাতের কাছে চলে গিয়েছিলাম। সে আমাকে গিরিখাতটার ব্যাপারে সাবধান করেছিল। ওখান থেকে দূরে থাকতে বলেছিল। জায়গাটা বিপদজনক, আমি পড়ে যেতে পারি। কিন্তু গিরিখাতের কোণায় অসংখ্য বন্য সবজি দেখা যাচ্ছে। কাছে না গিয়ে পারলাম না।
আমার কাছে মনে হল হঠাৎ যেন মাটি শেষ হয়ে আকাশে পরিণত হয়েছে। সবজি তুলে তুলে আমার হাতের ঝুড়িতে রাখছিলাম। সেই সাথে গিরিখাতের পর পর্বতমালার সারির দিকে তাকাচ্ছিলাম। পর্বতগুলো আকাশের মেঘের সাথে গিয়ে মিশে গিয়েছিল যেন। ওগুলো দানবাকৃতির ধূসর ছায়ার মত দেখাচ্ছে।
কিনারার এক জায়গায় আমার দৃষ্টি পড়ল। জায়গাটা দুমড়ে মুচড়ে আছে যেন কেউ ওখানে লাথি মেরেছে।
কিনারা থেকে মাথা বের করে নিচে তাকালাম। ত্রিশ মিটারের মত নিচে একটা পানির ধারার মত বয়ে যাচ্ছে যেটাকে দড়ির মত দেখাচ্ছে। বিশ মিটার নিচে একটা টেবিলের সমান পাথর ঝুলে ছিল। উপরে পরিত্যক্ত ঘাসের চাপড় দেখা যাচ্ছে।
সাদা রঙের কিছু একটা দেখতে পাচ্ছিলাম। একটা খরগোশ। ওটা নিশ্চয়ই চলার সময় খাদ থেকে পা ফসকে নিচে পড়ে গিয়েছিল। আর উপরে উঠতে পারেনি।
দূর থেকে বজ্রপাতের গর্জন ভেসে এল। এক ফোঁটা বৃষ্টি আমার হাতের উপর এসে পড়ল।
ঝুড়িটা মাটিতে রেখে আমি খাদের কিনারা দু হাত দিয়ে ধরে আস্তে আস্তে এক পা এক পা করে বেয়ে বেয়ে পাথরটার দিকে নামাতে লাগলাম।
ঠাণ্ডা এক ঝাপ্টা বাতাস এসে আমার চুলের ভেতর দিয়ে বয়ে গেল। এতদিন পর্যন্ত আমি খরগোেশ নিয়ে বিরক্ত হয়ে এসেছি, কিন্তু এখন এটাকে অসহায় অবস্থায় দেখে আমার মনে হয়েছে একে রক্ষা করতে হবে।
আমি খরগোশের দিকে হাত বাড়ালে প্রথমে সেটা প্রতিরক্ষামূলক ভঙ্গিতে ছিল। কিন্তু পরে তুলতুলে সাদা প্রাণীটা আমাকে ওকে তুলে নিতে দিল। আমি এর ক্ষুদ্রতা, এর উষ্ণতা অনুভব করতে পারছিলাম। মনে হচ্ছিল উষ্ণ একটা ছোট বল।
বৃষ্টি শুরু হল। আর পর মুহূর্তেই আমি কিছু একটা নড়াচড়ার শব্দ শুনতে পেলাম। একটা ঝাঁকি আমার পুরো শরীর নাড়িয়ে দিল। খাদটা হঠাৎ উপরে উঠে গেল। পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ায় এক মুহূর্তের জন্য মনে হল আমি বাতাসে ভাসছি। খাদের যেখানে আমার সবজির ঝুড়ি রেখে এসেছিলাম সেটা অনেক দুরে সরে গেল, অনেক ছোট দেখাল। আমি খরগোশটাকে নিরাপদে রাখার জন্য বকের সাথে চেপে ধরে রাখলাম।
একটা শক্ত ধাক্কা অনুভব করলাম। ধুলোর একটা মেঘ ছড়িয়ে পড়ল মুহূর্তখানেকের জন্য। কিন্তু তারপরই বৃষ্টি সেটাকে ধুয়ে ফেলল। গিরিখাতের গোড়ায় পানির ধারার পাশে এক জায়গায় আমরা গিয়ে পড়েছিলাম।
