জানালাগুলোতে পর্দা টেনে দেয়া হত যাতে পোকা ঢুকতে না পারে। কিচেনের জানালা দিয়ে রাতে যখন বাতাস ভেসে আসত, ধাতুর চাইমটা নড়ে উঠে পরিচিত শব্দ সৃষ্টি করত। শব্দটা পরিস্কার এবং সুমধুর।
“জানালার ঐ চাইমের শব্দটা হল বাতাসের মিউজিক। আমার এটা পছন্দ…এই শব্দটা,” আমি ওকে বলেছিলাম। সে তখন দাবার পরবর্তী চাল কি হতে পারে তা নিয়ে চিন্তা করছিল। আমার কথা শুনে প্রথমে ভুরু কুঁচকে তাকাল, তারপর মাথা ঝাঁকাল।
আমি নিশ্চিন্তবোধ করছিলাম। প্রথম যখন আমি এই বাড়িতে এসেছিলাম তখন উইন্ড চাইমের শব্দটা অনিয়মিত ঝনঝন আওয়াজের মত মনে হত। এক সময় আমি অনুভব করলাম সেটা অন্যকিছুতে পরিণত হয়েছে। এরপর পুরো একটা মাস পার হয়ে গিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আমার অজান্তেই আমার হৃদয় বদলে গিয়েছে।
সে রাতে সে তার বেডরুমে যাওয়ার পর, আমি একা বাইরে হাঁটতে গেলাম। কালির মত ঘন অন্ধকার রাত ছিল, কিন্তু একটা ল্যাম্পের নিচে দাঁড়ানোর কারনে আমার চারপাশে আলো ভেসে যাচ্ছিল। আমি ওখানে দাঁড়িয়ে চিন্তা করলাম, আমার মধ্যে কী কী পরিবর্তন এসেছে।
কোন একদিন, আমার মনে নেই সেটা কবে, আমি কিচেন থেকে কুয়াতে সরাসরি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। আমি এখন ঐ পাথর বসানো বাঁকানো পথ দিয়ে ঘুরে যাই আর খেয়াল রাখি যেন কোন ফুলের গাছ মাড়িয়ে না ফেলি। আগে আমার মনে হত এটা সময় আর শক্তির অপচয়। আর এখন আমি হাঁটার সময় চারদিক উপভোগ করি।
যখন আমি প্রথম ঐ ভূগর্ভস্থ কামরা থেকে বের হয়েছিলাম তখন সূর্যের আলো পছন্দ করেছিলাম শুধু এর উজ্জ্বল আলো আর ত্বকের উপর উষ্ণ অনুভুতির জন্য। আর এখন আমি এটাকে আরো ব্যক্তিগতভাবে উপলদ্ধি করতে পারি-যেটা হয়ত শুধুমাত্র কোন কাব্যিক ভঙ্গিতে প্রকাশ করা সম্ভব। এখন মনে হয় সূর্যের সাথে আমার হৃদয়ের কোথাও কোন গভীর সম্পর্ক আছে।
অনেক কিছুই এখন আমার কাছে মূল্যবান মনে হয়: বাড়িটা, এর দেয়ালে বেড়ে ওঠা গাছগুলোসহ। পাহাড়ের ধারের ঘাসভূমি। ভূগর্ভস্থ গুদামঘরে যাওয়ার দরজা, সেটার মাথার উপরে পাখির বাসাটা। মাথার উপরের নীল আকাশ আর ভেসে যাওয়া তুলোর মত মেঘগুলোও ভাল লাগে। তেতো কফি আমার ভাল লাগে না, অনেক চিনি দিয়ে খেলে ভাল লাগত। গরম গরম অবস্থায় মিষ্টি তরলটা জিহ্বাতে ছড়িয়ে যাওয়ার অনভুতিটা আমাকে আনন্দিত করে তোলে। “ আমি খাবার রান্না করা আর ঘরবাড়ি পরিস্কার রাখা চালিয়ে যেতে লাগলাম। সাদা পোশাকগুলো ধুয়ে দিতাম। কোথাও ছিঁড়ে ফেটে গেলে সুই সুতো দিয়ে সেলাই করি। একটা প্রজাপতি জানালা দিয়ে উড়ে এসে রেকর্ড প্লেয়ারের উপর বসল। বাতাসের শব্দ শুনতে শুনতে আমি চোখ বন্ধ করলাম।
রাতের আকাশে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকি। বাতাসে গাছগুলো এদিক ওদিক দোলে আর পাতাগুলো ঝিরঝির শব্দ তোলে। আমি এর সবকিছু ভালবাসি, তাকেসহ।
গাছের ফাঁক দিয়ে আমি দূরে শহরের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পেতাম। কোথাও কোন আলো ছিল না। পুরো অন্ধকার।
“আর এক সপ্তাহের মধ্যে আমি মারা যাব,” পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে বলল। একটা মেডিক্যাল টেস্ট ওকে জানিয়েছিল ঠিক কখন সে মারা যাবে। আমি তখনো পুরোপুরি ‘মৃত্যু মানে কি তা বুঝতে পারিনি। কিন্তু আমি তাকে বললাম যে আমি বুঝেছি।
৩
ওর শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। সকালে উঠে নিচে আসতে দেরি হয় এখন। আমরা ঠিক করেছি সে এখন থেকে এক তলায় আমার রুমে ঘুমাবে। এর বদলে আমি দোতালায় গিয়ে ঘুমাবো।
আমি তাকে বিছানা থেকে উঠে জানালার পাশে চেয়ারে গিয়ে বসতে সাহায্য করি। সে অবশ্য বলে যে তার কোন সাহায্যের দরকার নেই আর আমার থেকে দূরত্ব বজায় রাখে। আমি যা করি তার কোনটাকেই নার্সিং বলা যাবে না। সে কখনো জ্বর কিংবা শরীরে ব্যথা নিয়ে কোন অভিযোগ করেনি। তার বক্তব্য হল জীবাণুগুলো নাকি ওভাবে কাজ করে না। ওগুলো কোন ব্যথা সৃষ্টি করে না, শুধু মৃত্যু।
ওর নড়াচড়ার ঝামেলা কমানোর জন্য, সে যেখানে বসে থাকে সেখানেই খাওয়ার অভ্যাস করলাম আমরা। সে যদি বেঞ্চে বসে থাকত তাহলে আমি ট্রেতে করে আমাদের খাবার সেখানে নিয়ে আসি। সে যদি অন্য কোন চেয়ারে বসে থাকে, তাহলে তার পায়ের কাছে বসে রুটি-টুটি কিছু একটা খাই।
সে তার চাচার কথা বলত। কিভাবে তারা ট্রাকে চড়ে ধ্বংসস্তূপের দিকে যেত। সেখানে দরকারি কিছু পাওয়া যায় কিনা ঘাঁটাঘাঁটি করত। আর দিন শেষে বাড়ি ফিরে আসত। যে ট্রাকটা তারা ব্যবহার করত সেটা এখন মরচে ধরে পড়ে আছে, চালানোর জন্য কোন ফুয়েল নেই বলে।
“তোমার কি কখনো মানুষ হওয়ার ইচ্ছা হয়?” সে একদিন হঠাৎ কথার মাঝখানে জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ হয়,” আমি বললাম। “যখনই আমি কিচেনের জানালায় ঝুলানো উইন্ড চাইমের আওয়াজ শুনি, আমার মনে হয় মানুষ হতে পারলে চমৎকার
এমনকি বাতাসেরও ক্ষমতা আছে সঙ্গীত সৃষ্টি করার, আমি নিজের মনে ভাবতাম। আমার কোন কিছু সৃষ্টি করার কোন ক্ষমতা নেই। ব্যাপারটা আমাকে বিষাদগ্রস্থ করে তুলত। কথাবার্তার সময় আমি কাব্যিক ভঙ্গি ব্যবহার করতে পারতাম, এমনকি মিথ্যা বলতেও। আমার শৈল্পিকতার দৌড় ঐ পর্যন্তই।
“হুম…” সে বলল। তারপর আবার তার চাচার গল্পে ফিরে গেল। তারা দুজন মিলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে শহরের ধ্বংসাবশেষ ঘুরে বেরিয়েছিল।
