আমি তার দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমার করণীয় কিছু আছে কিনা। সে শুধু হাসল, আর বলল “না।” মাঝে মাঝে আমি তার জন্য এক কাপ কফি নিয়ে এলে সে বলত, “ধন্যবাদ।” তারপর আবার জানালার দিকে ঘুরে যেত। চোখগুলো এমনভাবে কুঁচকে থাকত যেন অতি উজ্জ্বল কোন কিছু দেখছে।
অনেকবার এমন হয়েছে যে আমি তাকে বাড়ির কোথাও খুঁজে পেতাম না। শেষে দেখতাম বাইরে, তার চাচার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ক্রসের সাদা রঙের সাথে ওর পোশাকের সাদা রঙটা চমৎকার মিলে যেত।
কবর সম্পর্কে আমার কিছু ধারণা ছিল। ঐ জায়গায় মৃতদেহ মাটি চাপা দেয়া হয়। কিন্তু এই নির্দিষ্ট কবরটার সাথে ওর সম্পর্কটা আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এতদিনে নিশ্চয়ই ওর চাচার দেহ গলে মাটির সাথে মিশে গিয়ে গাছদের খাবারে পরিণত হয়েছে।
আমার জন্মের পর থেকেই উঠোনের সবজির বাগানটা দেখে আসছি। সে ওখানে চাষ করত। এখন আমি ওগুলোর দেখাশোনা করি।
মাঝেমাঝে খরগোশ এসে সবজিগুলো চিবিয়ে রেখে যায়। পুরো বনের সব গাছপালা রেখে তাদের মনে হয় আমাদের বাগানটাই বেশি পছন্দ।
মাঝেমাঝে যখন আমার কিছু করার থাকে না তখন ঝোঁপের কাছে দাঁড়িয়ে থাকি। যখন ছোট মত সাদা কোন কিছুকে সবজির দিকে এগুতে দেখি তখন দৌড়ে গিয়ে ধরার চেষ্টা করি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার শারীরিক ক্ষমতা কোন প্রাপ্তবয়স্কা নারীর চেয়ে বেশি নয়। তাই কখনোই কোন খরগোশ ধরতে পারিনি। তারা আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে দৌড়ে বনের মধ্যে হারিয়ে যায়।
খরগোশের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে মাঝে মধ্যে আমি কোন কিছুতে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই। তখন পেছনের জানালা থেকে মুখ টিপে হাসার শব্দ ভেসে আসে। বাড়ির দিকে ঘুরে তাকিয়ে দেখতে পাই সে হাসছে। পরাজয় মেনে নিয়ে মাথা নিচু করে উঠে দাঁড়িয়ে আমি আমার সাদা পোশাক থেকে ধুলো কাদা ঝাড়তে থাকি।
“যত দিন যাচ্ছে তুমি তত মানবীয় হয়ে উঠছ, বাড়িতে ফেরার পর সে হাসিমুখে আমাকে বলল। তার কথার অর্থ বুঝতে আমার সমস্যা হচ্ছিল। সে যখন আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল, আমার অনেক মেজাজ খারাপ হচ্ছিল। আমার শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গেল, কিভাবে প্রতিক্রিয়া
জানাবো বুঝতে পারছিলাম না। কিছু না পেয়ে আমার মাথা চুলকালাম আর বলে উঠলাম, “আহা!” বিব্রতকর পরিস্থিতিতে কি এরকম অনুভূতি হয়? আমার জানা নেই। আমি শুধু জানতাম যে আমার উপর হাসার কারনে তার উপর বিরক্ত লাগছিল আমার।
লাঞ্চের সময় সে টেবিলে দুবার চাপড় দিল আমার মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য। আমি এক বাটি সুপ খাচ্ছি আর সে সালাদ খাচ্ছে। লেটুসে বরাবরের মত খরগোশের দাঁতের চিহ্ন লেগে আছে।
“আমার সালাদের সজিতে খরগোশের দাঁতের দাগ আছে অথচ তোমার সুপেরগুলোতে নেই কেন?”
“বিষয়টা পুরোপুরি কাকতালীয়,” আমি বললাম আর খাওয়ায় মনোযোগ দিলাম।
***
দোতালায় একটা রুম ছিল যেটায় কোন বইয়ের শেলফ, ডেস্ক বা চেয়ার কিছুই ছিল না। শুধু প্লাস্টিকের তৈরি কিছু খেলনা ব্লক ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, ছোট বাচ্চাদের খেলনার মত। আমি কখনো সত্যিকারের বাচ্চা দেখিনি কিন্তু ওরা কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে আমার কিছু ধারণা আছে।
প্রথম যখন আমি ঐ রুমে উঁকি দিয়েছিলাম, পুরো রুমটা বিকেলের সূর্যের আলোয় লালচে হয়ে ছিল। তীব্র লাল আলোতে ব্লকগুলোকে আরও গাঢ় লাল লাগছিল।
ব্লকগুলোর কয়েকটা একসাথে জুড়ে অসমাপ্ত একটা জাহাজের মত বানানো হয়েছিল। পুরোটা শেষ করলে এত বড় হবে যে দু হাত লাগবে জড়িয়ে ধরতে। জাহাজের বো টা ছিল না। ভোলা ব্লকগুলো মেঝের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।
“আমি একবার ওটায় লাখি দিয়েছিলাম, তখন ওগুলো ভেঙে খুলে পড়েছিল।” সে আমার পেছন থেকে বলল। সে আমাকে ওগুলো নিয়ে খেলার অনুমতি দিলেও আমি বুঝতে পারছিলাম না কোত্থেকে শুরু করা উচিত। আমার মনে হচ্ছিল হঠাৎ যেন আমার ব্রেনটা জমে গিয়েছিল।
“তোমার জন্য কিছু বানাতে যাওয়াটা কঠিন মনে হতে পারে, সে বলল। খুঁটিনাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বলে দেয়া হলেই শুধু আমি কাজে লাগতে পারি। সে বলল আমি নাকি কখনো শিল্পকর্ম সৃষ্টি বা সঙ্গীত রচনা করতে পারব না। তাই চুপচাপ সেখানে বসে থাকলাম, কিছু করতে পারলাম না।
সূর্য ডুবে যাওয়ার পর বাইরে অন্ধকার নেমে এল। উঠোনের আলোগুলো নিজে নিজে জ্বলে উঠল। সাদা আলোগুলো জানালার কাঁচে প্রতিফলিত হচ্ছে।
সে ঐ রুমে বসে একটা ব্লক আরেকটার উপর সাজাতে লাগল। একটা জাহাজ বানাচ্ছিল। লাল জাহাজটা বানানো শেষে সে সবদিক থেকে ঘুরিয়ে সেটা দেখল। আমারও ইচ্ছা হচ্ছিল যদি তার মত করে ব্লকগুলো নিয়ে খেলতে পারতাম।
ল্যাম্পগুলোর চারপাশে সবসময় মথ উড়াউড়ি করত। আমরা যখন রাতে আমাদের দাঁত ব্রাশ করতাম তখন মাটির উপর মথের উড়ার ছায়া পড়ত। আমরা আমাদের মুখ ধুয়ে পানি নর্দমাতে ফেলতাম। নর্দমাটা বনের কোল ঘেসে পর্বতমালার কাছে একটা নদী পর্যন্ত লম্বা ছিল।
দাঁত ব্রাশ করার পর থেকে বিছানায় যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে আমরা লিভিং রুমে বসে মিউজিক শুনতাম। আমাদের দুজনের কেউই তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যাওয়ার ব্যাপারটা পছন্দ করতাম না। মাঝে মাঝে আমরা হালকা মিউজিক চালিয়ে দাবা খেলতাম। একবার ও জিতলে একবার আমি জিততাম। আমার মানসিক ক্ষমতা একজন সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি দেয়া হয়নি।
