উত্তরে আমি পাখিটাকে বনের দিকে ছুঁড়ে মারলাম। আমার পেশীগুলো সাধারণ একজন প্রাপ্তবয়স্কা নারীর মতই, তবুও অনেকদূর পর্যন্ত উড়ে গিয়ে গাছের ডালে পড়ে হারিয়ে গেল।
“এরকম করলে কেন?” সে মাথা কাত করে আমাকে জিজ্ঞেস করল।
“কারন ওটা পঁচে গেলে সারে পরিণত হতে পারবে।” আমি উত্তর দিলাম। সে মাথা ঝাঁকাল।
“যখন সময় আসবে, তুমি আমাকে ঠিকমত কবর দেবে। তোমাকে মৃত্যু সম্পর্কে কিছু জিনিস জানতে হবে,” সে বলল।
সে ঠিকই বলেছিল। আমি মৃত্যু কি তা বুঝতে পারছিলাম না। হতবুদ্ধি হয়ে ছিলাম।
২
এভাবে একসাথে আমাদের জীবন শুরু হল।
সকালে উঠে আমি কিচেন থেকে বালতিটা নিয়ে পানি তুলতে কুয়ার দিকে যাই।
এই কুয়ার পানি আমরা রান্না-বান্না আর ধোয়াধুয়ির কাজে ব্যবহার করি। সেলারে একটা ছোট ইলেক্ট্রিক জেনারেটর ছিল, কিন্তু পানি তোলার জন্য কোন পাম্প ছিল না।
পাথর বসানো একটা বাঁকানো পথ দিয়ে বাড়ি থেকে কুয়া পর্যন্ত যেতে হত। প্রতিদিন সকালে আমি ঐ বাঁকানো পথটা বাদ দিয়ে সোজাসুজি কুয়ার দিকে যেতাম। শুধু যে পথটা উপেক্ষা করতাম, তাই নয়। যাওয়া আসার সময় ফুলের গাছগুলোকেও মাড়িয়ে যেতাম।
কুয়াতে দড়ি দিয়ে বাঁধা একটা বালতি লাগানো ছিল। আমি সেটা ছেড়ে দিতাম কুয়ার গভীরে পানিতে পড়ার জন্য। পানিতে পড়ে ছলাৎ করে শব্দ উঠলে বুঝতে পারতাম নিচে পৌঁছেছে। বালতিটা টেনে তোলার সময় পানির ওজন টের পেয়ে অবাক লাগত।
পানি আনার পর দাঁত ব্রাশ করতাম। প্রত্যেকদিন সকালে আমার মুখের ভেতর কেমন বিচ্ছিরি একটা স্তর জমা হত। ঘুমের মধ্যে লালার হজমশক্তি আটকা পড়ত, আর আমি টুথব্রাশ দিয়ে সেটা পরিস্কার করতাম।
জরুরি জিনিস আর খাবার দাবার সব একসাথে ভূগর্ভস্থ গুদাম ঘরে রাখা হত। আমি খেয়াল করলাম যে এই রুমের পাশের রুমেই আমার জন্ম হয়েছিল। আমি ওখানে যেতাম প্রতিদিনের খাবার আনার জন্য। তার সাথে বাগানে চাষ করা শাকসজি দিয়ে ইলেকট্রিক চুলায় ফাইপ্যানে রান্না করতাম। আমি যখন রান্না করতাম তখন সে তার দোতালার রুম থেকে নেমে এসে টেবিলে বসততা। খাবারের সাথে সবসময় কফি খেত।
“তোমার কাছে অতীতের কোন ছবি বা রেকর্ড করা কিছু নেই?” একদিন আমি ব্রেকফাস্টের সময় জিজ্ঞেস করলাম। খাওয়া শেষে আমি সব পরিস্কার করার পর সে আমাকে কিছু ছবি দেখাল। পুরাতন ছবি যেরকম হয়, রঙ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ছবিতে একটা শহর দেখা যাচ্ছে যেখানে অনেক মানুষ বসবাস করত। আমি লম্বা বিল্ডিংগুলো, গাড়িগুলো আর মানুষগুলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম।
একটা ছবিতে তাকে একটা বিল্ডিঙের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম ওটা কি ছিল, সে জানাল ওখানে সে একসময় কাজ করত।
আরেকটা ছবিতে একজন নারী ছিল। তার চেহারা আর চুল হুবহু আমার মত দেখতে ছিল।
“তুমি অনেক জনপ্রিয় ছিলে,” সে বলল।
পর্বতমালা আর পাহাড়টা যেখানে মিলিত হয়েছে, সেখানে আমাদের বাড়িটা ছিল। বাড়ির পেছন দিয়ে পর্বতমালার পাদদেশ পর্যন্ত চলে গেছে একটা রাস্তা। আগাছা জন্মে রাস্তাটা প্রায় ঢেকে গেছে। কেউ সেটা ব্যবহার করে এরকম কোন চিহ্ন ছিল না। রাস্তাটা বাড়ি পর্যন্ত-বলা যায় অন্ধ গলির মত শেষ হয়েছে এখানে এসে।
“তুমি যদি এই রাস্তা ধরে পর্বতমালা পর্যন্ত যাও, সেখানে কি আছে?” আরেকদিন আমি ব্রেকফাস্টের সময় জানতে চাইলাম।
“ওখান থেকে ধ্বংসস্তূপের শুরু, কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে সে উত্তর দিয়েছিল। উঠোনের গাছপালাগুলোর ভেতর দিয়ে পর্বতমালার পাদদেশটা ভাল মত দেখা যেত। সে যেরকম বলেছিল, দেখে মনে হচ্ছিল এক সময় সেখানে কোন শহর ছিল। আমি পরিত্যক্ত বাড়িঘর আর গাছপালা দেখতে পেলাম। কিন্তু কোন মানুষজন থাকার কোন চিহ্ন দেখতে পেলাম না।
আরেকদিন ব্রেকফাস্টের সময় সে কাঁটাচামচ দিয়ে তার সালাদের একটা অংশ আমার সামনে তুলে ধরল। একটা লেটুস পাতার কোনার দিকে ছোট ছোট দাঁতের দাগ। যেন কেউ চাবিয়ে রেখেছে। লেটুসটা আমাদের বাগানের থেকে তোলা।
“খরগোশ,” সে বলল। আমরা অবশ্য রোগ বালাইয়ের ধার না ধেরে খরগোশের চাবানো লেটুস খেয়ে ফেললাম। বেছে নিতে বললে আমি অবশ্য দাঁতের দাগ ছাড়া লেটুস খেতেই আগ্রহ বোধ করতাম।
ব্রেকফাস্টের পর আমি বাড়ির মধ্যে একটু হাঁটাহাঁটি করলাম আর কিছু চিন্তা করলাম। ভাবছিলাম ওর জীবন শেষ হওয়ার পর কি হবে। এক সময় আমিও তো আর নড়াচড়া করতে পারব না। আমার মত অস্তিত্বরও একটা কর্মক্ষম পর্যায় আছে, যা প্রথম থেকেই ঠিক করা থাকে। সেই সময়টা আসতে এখনো অনেক দেরি কিন্তু আমি জানতাম আমার জীবনের আর কতটুকু বাকি। হাতগুলো তুলে কান চাপলাম। ভেতরে ছোট ছোট মোটর ঘোরার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। এগুলোই একদিন বন্ধ হয়ে যাবে, নিজেকে নিজে বললাম।
ভূগর্ভস্থ গুদাম ঘরে গিয়ে নিশ্চিত হলাম যে সেখানে একটা কোদাল রাখা আছে। সে যেহেতু চায় তাকে পাহাড়ের পাদদেশে কবর দিতে, আমার উচিত মাটি খোঁড়াটা একটু অনুশীলন করা।
আমি এখনো কল্পনা করতে পারছি না মৃত্যু ব্যাপারটা কি রকম হতে পারে। সে কারণে হয়ত বা, অনেক গর্ত খোঁড়ার পরেও আমি শুধু চিন্তা করছিলাম, কি হবে?
***
বাড়ির সমস্ত জানালার পাশে একটা করে চেয়ার রাখা ছিল। আর দিনের বেলায় সে ওগুলোর কোন একটা বেছে নিয়ে তাতে বসে থাকত। চেয়ারগুলোর বেশিরভাগই ছিল একজনের বসার মত কাঠের চেয়ার। তবে যে জানালাটা থেকে কুয়া দেখা যেত, সেটার পাশে একটা লম্বা বেঞ্চ ছিল।
