কাঠের দরজাটা থেকে সাদা রঙের চলটা উঠে গিয়েছে। আমি তার পেছন পেছন ভেতরে গেলাম। মেঝের কাঠের বোর্ডগুলো আমাদের ভারে কাঁচকোঁচ করে উঠল।
বাড়িটায় দুটো তলা আর একটা চিলেকোঠা ছিল। আমাকে নিচ তলায় কিচেনের পাশের রুমটা দেয়া হয়েছিল। ছোট একটা রুম। একটা বিছানা, আর একটা জানালা ছিল শুধ।
সে আমাকে কিচেনে ডাকল।
“প্রথমে আমি চাই তুমি কফি বানাও।”
“আমি জানি কফি কি, কিন্তু কিভাবে বানাতে হয় তা জানি না।”
“সেটা ঠিক আছে।”
সে শেলফ থেকে কফি বিন ভর্তি একটা ছোট কৌটা নামাল আর পানি জ্বাল দিল। দু কাপ কফি বানাল, আমি দেখলাম। তারপর এক কাপ আমার দিকে বাড়িয়ে দিল।
“ধন্যবাদ,” আমি বললাম। গাঢ় তরলে ঠোঁট লাগিয়ে চুমুক দিলাম। “আমি দেখেছি তুমি কিভাবে কফি বানালে। পরেরবার আমি বানাব।” কাপে টোকা দিয়ে আমি তরলটা মখের ভেতর দিয়ে নেমে যেতে দিলাম।
“তবে,” আমি বললাম, “এর স্বাদটা আমার পছন্দ হল না।”
“হ্যাঁ,” সে মাথা ঝাঁকাল। “তোমার মনে হয় কিছুটা চিনি দিয়ে নেয়া উচিত।”
আমি তার কথা মত কাজ করলাম আর নতুন মিষ্টি করা কফিতে চুমুক দিলাম। জেগে উঠার পর এটাই ছিল প্রথম খাবার যা আমার শরীর পরিচিত হয়েছিল। পাকস্থলীর কলকজাগুলো সব পুষ্টি ঠিকমত শুষে নিল।
হাঁটার পর খানিকটা ক্লান্ত বোধ করায় আমি একটু বসলাম আর কাপটা কিচেনের টেবিলের উপর রাখলাম। জানালা থেকে একটা ধাতব ডেকোরেশন ঝুলছে। ধাতুর তৈরি বিভিন্ন সাইজের রড বাতাসের প্রবাহের সাথে দুলছে আর চমৎকার একটা শব্দ হচ্ছে। আমরা চুপচাপ বসে সেই অনিয়মিত শব্দ শুনলাম।
দেয়ালে একটা ছোট আয়না লাগানো ছিল। আমি সেটার সামনে গিয়ে বসে আমার চেহারাটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। মানুষ দেখতে কি রকম হয় তা আমি আগে থেকেই জানতাম, তাই আমাকে একজন নারীর আদলে তৈরি করা হয়েছে দেখে অবাক হলাম না। আমি জানতাম যে আমার শরীরের প্রতিটা খুঁটিনাটি-আমার সাদা ত্বক, লাল চুল, সবকিছু মানুষের সাথে মিলিয়ে ডিজাইন করা।
কিচেনের কাপ বোর্ডে কিছু পুরোনো ছবি খুঁজে পেলাম। ওগুলোতে বাড়িটার সামনে দুজন মানুষকে দেখা যাচ্ছিল। সে আর একজন সাদা চুলের বুড়ো মানুষ। “তোমার সাথের জন কোথায়?” আমি জানতে চাইলাম।
সে একটা চেয়ারে বসে ছিল, আমি শুধু তার পিঠ দেখতে পাচ্ছিলাম। সে আমার দিকে না ঘুরে উত্তর দিল, “কোথাও না।”
“কোথাও না কথাটা দিয়ে কি বোঝাতে চাইছ?”
সে আমাকে জানালো পৃথিবীর মানুষেরা প্রায় বিলুপ্তির মুখে। সে ব্যাখ্যা করল যে পৃথিবীর আকাশে জীবাণু ছড়িয়ে পড়েছিল, আর দুই মাসের মধ্যে প্রায় পুরো গ্রহের জনসংখ্যা মুছে যায়। ব্যতিক্রম না হলেও ও ভাগ্যবান। ছিল। আক্রান্ত হওয়ার আগে সে গ্রামের দিকে তার চাচার বাড়িতে চলে আসতে সক্ষম হয়। ওর চাচা এক সময় মৃত্যুবরণ করে আর তাকে পাহাড়ের পাদদেশে কবর দেয় ও। এখানে আসার সময় আমরা যে ক্রসটা দেখেছিলাম।
“দুদিন আগে আমি নিজেকে পরীক্ষা করেছি,” সে বলল। “জানতে পারলাম আমি জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি।”
“তারমানে তুমিও মারা যাবে।”
“হ্যাঁ, কিন্তু আমি সৌভাগ্যবান ছিলাম। কয়েক দশক ধরে জীবাণুগুলো আমাকে খুঁজে পায়নি।”
আমি ওকে ওর বয়স জিজ্ঞেস করলাম। প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি, সে বলল।
“তোমাকে দেখে মনে হয় না। আমি যা বুঝি তাতে তোমাকে দেখে বিশের কাছাকাছি মনে হয়।”
“আমি ব্যবস্থা নিয়েছি।”
যা বোঝা গেল তা হল কিছু সার্জারির মাধ্যমে মানুষ এখন ১২০ বছরের মত বেঁচে থাকতে পারে।
“কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি জীবাণুর হাত থেকে বাঁচতে পারলাম না।”
আমি উঠে গিয়ে কিচেনের বিভিন্ন যন্ত্রপাতিগুলো পরীক্ষা করে দেখলাম। রেফ্রিজারেটরে বিভিন্ন সবজি, সিজনিং, অন্যান্য খাবার রাখা ছিল যা গরম করে খাওয়া যাবে। ইলেকট্রিক জিনিসগুলোর মধ্যে একটা না থোয়া ফায়িং প্যান ছিল। আমি সুইচ অন করলে স্টোভের কয়েল ধীরে ধীরে গরম হয়ে উঠল।
“আমাকে একটা নাম দাও, প্লিজ,” আমি বললাম।
সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে লনের উপর কয়েকটা প্রজাপতির ওড়াউড়ি দেখছে। বোঝা যাচ্ছে অন্যমনস্ক।
“লাভ কি?”
জানালা দিয়ে বাইরের ঝিরঝিরে বাতাস ঘরে ঢুকছে। বাতাসের সোতে রিমঝিম শব্দ তুলছে ধাতুর তৈরি চাইমটা।
“আমি যখন মারা যাব,” সে বলল, “আমি চাই তুমি আমাকে ঐ পাহাড়ের পাদদেশে নিয়ে গিয়ে কবর দেবে। আমি আমার চাচার পাশে বিশ্রাম নিতে চাই। সেজন্যেই তোমাকে তৈরি করেছি।”
সে আমার মুখের দিকে তাকাল।
“বুঝতে পেরেছি। আমাকে তৈরি করা হয়েছে গৃহস্থালি কাজ করার জন্য আর তোমাকে কবর দেয়ার জন্য।”
সে মাথা ঝাঁকাল।
“এগুলোই তোমার অস্তিত্বের মুল কারন।”
আমি ঘর পরিস্কার করা শুরু করলাম। একটা ঝাড়ু নিয়ে মেঝে ঝাঁট দিলাম আর এক টুকরো ত্যানা দিয়ে জানালাগুলো মুছলাম। আমি যখন আমার কাজ করছিলাম তখন সে চেয়ারে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল।
জানালার ধুলো পরিস্কারের সময় আমি খেয়াল করলাম একটা ছোট পাখি স্থির হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। আমার মনে হল ওটা মৃত, তাই বাইরে গেলাম ওটা তুলে দেখতে। পাখির দেহটা একদম ঠাণ্ডা হয়ে ছিল, আমার সন্দেহ সঠিক প্রমানিত হল।
সে এর মধ্যে কোন এক সময় জানালায় এসে দাঁড়িয়েছি। আমার হাতে মরা পাখিটা দেখে বলল, “তুমি এটা দিয়ে কি করবে এখন?”
