“না তা সত্যি নয়, একদম সত্যি নয়। আমি ওগুলো ব্যাগে ভরেছিলাম। সত্যি সত্যি ভরেছিলাম। হতে পারে কেউ সেগুলো সরিয়ে ফেলেছে। যাতে আমি আপনাকে রক্ত ট্রান্সফিউজ করতে না পারি। যাতে আপনার মৃত্যু নিশ্চিত করা যায়। আমি সত্যি সত্যি ব্যাগে রক্ত ভরেছিলাম। সত্যি বলছি। আমি এত বুড়ো হইনি। হতে পারে আমাকে এখন এডাল্ট ডায়াপার পড়তে হয়, কিন্তু তাই বলে এত ভুলো মন হইনি। ও টাইপের রক্ত। আইভি টিউবিং। সব আমি ব্যাগে ভরেছিলাম।”
“অ্যাঁ? কি বললেন, আপনি ডায়াপার পড়েন?” সুগুয়ো হাঁ হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“আরে সেটা মজা করার জন্য বললাম। সেফ একটা কৌতুক।” ডাঃ ওমোজ মুখ টিপে হাসলেন।
এটা হাসার কোন সময় হল? এক মুহূর্তের জন্য আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু টিউবিং শব্দটা আমাকে আবার চিন্তায় ফেলে দিল। আমার মাথার ভেতরে সবকিছু সাদা রূপ ধারন করতে শুরু করে দিয়েছিল, কিন্তু তার মধ্যেও সেই ছোট বাল্বটা আরেকবারের জন্য জ্বলে উঠল।
কিন্তু আমি তা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। একবার চিন্তা করেছিলাম যে এরকম কিছু আমার সাথে হতে পারে কিন্তু বিশ্বাস করতে পারিনি যে তা আসলেই সত্যি হবে।
“আমি আনন্দিত যে তোমার জন্য বেশ বড় একটা ইনস্যুরেন্স পলিসি নিয়ে রেখেছিলাম, বাবা,” চেহারায় স্বস্তি নিয়ে নাগায়ো বলল। আমার মেজাজ খারাপ ছিল কিন্তু কিই বা করার ছিল। ক্ষত দিয়ে রক্তের সাথে সব শক্তিও বেরিয়ে গিয়েছে। কথা বলার মত কোন শক্তিও আর অবশিষ্ট নেই। কিন্তু আমার চোখগুলো তখনও খোলা ছিল। কোনরকমে আমার বড় পুত্রের দিকে সেগুলো ঘোরাতে সক্ষম হলাম।
“তুমি নিশ্চয়ই একটা ঠিকঠাকভাবে করা উইল রেখে যাচ্ছ, নাকি?” অবশিষ্ট শক্তি দিয়ে কোনরকমে মাথাটা একটু নাড়িয়ে নড় করতে পারলাম। এটা সত্যি যে বেশ কয়েক বছর আগেই আমি আমার লইয়ারের সাথে বসে আমার সম্পত্তি ভাগাভাগির ব্যাপারটা সেরে ফেলেছিলাম। আমার সবকিছু আমার দুই পুত্র আর স্ত্রীর মধ্যে সমান ভাগে বন্টন করে দিয়েছি।
মৃত্যু আস্তে আস্তে আমার চোখের পাতাগুলোকে গ্রাস করে নিতে শুরু করল। অবশেষে, আমি ভাবলাম। আমার মৃত্যুর মুহূর্ত উপস্থিত টের পেয়ে সবাই সোফাকে ঘিরে ধরে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। নাগায়ো আর সুমাকোর চোখে আশা আর প্রতীক্ষার চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। ডাঃ ওমোজির অভিব্যক্তি বেশ জটিল মনে হচ্ছিল। তবে সুগুয়ো রুমের অন্য মাথা থেকে আমার কাছে এল, আর চোখ টিপল। সেটা দেখা মাত্র সব প্রশ্নের উত্তর পরিস্কার হয়ে গেল আমার কাছে।
সুগুয়ো কিভাবে আমাকে খুনের পরিকল্পনা করেছিল তা আমি আর কখনোই জানতে পারব না। ওর ছোটবেলার কথা আমার মনে পড়ল, জড়সড় অবস্থায় আমাকে কার্ডের জাদু দেখিয়েছিল। আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম, ওর প্রশংসা করেছিলাম, ওর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে সুখি মানুষ। সেটাই হয়ত ছিল বাবা-পুত্রের সম্পর্কের শেষ অভিব্যক্তি।
আমার জেনে শান্তি লাগল যে ওর মাথার ভেতর অন্তত এই বুড়োকে খুন করার মত মগজ আছে। আমি সবসময় ওকে দুর্বল আর কাপুরুষ ভেবেছি, কিন্তু এখন আমার মনে হল ওর হাতে কোম্পানিটা নিরাপদেই থাকবে।
আমার ধারণা ও এই ট্রিপ শুরুর আগেই এই পরিকল্পনা সেরে রেখেছিল। লজে আসার সময় পথেই কোথাও ডাঃ ওমোজির ব্যাগ খালি করে ফেলেছিল-সম্ভবত আমরা যখন ট্রেনে উঠছিলাম, তখনই।
পরদিন ভোরে পাঁচটার সময় বরাবরের মত ঘুম থেকে উঠলাম আমি। পরিবারের প্রত্যেকটা সদস্য আমার এই অভ্যাসের কথা জানে। কিন্তু তার আগেই সুগুয়ো আমাকে খুনের সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল।
আইভি টিউব আর সংরক্ষিত রক্ত নিয়ে ও বাড়ির বাইরে গিয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে আমার ঘুমন্ত শরীরে আমারই ও-টাইপ রক্ত ছিটিয়ে দিয়েছিল। সবাই জানত আমার রুমের জানালা কয়েক সেন্টিমিটারের বেশি খোলা যায় না, আমি সবসময় এটা নিয়ে চিল্লাচিল্লি করতাম।
তারপর ও টিউবিং আর রক্তের বোতল সরিয়ে ফেলে লিভিং রুমে ফিরে আসে আর অ্যালার্ম ক্লক বাজার জন্য অপেক্ষা করে। আমি কখনোই জানতে পারব না ও কেন একটা হুইপ ক্রিম লাগানো ছুরি ব্যবহার করল, কিংবা সুমাকো যদি সেটা না কিনতে চাইত তাহলে ও কি করত। যাই হোক, পাঁচটার সময় আমি জেগে উঠলাম।
জানালার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো যখন ঢুকল তখন আমি খেয়াল করলাম রক্তে মাখামাখি হয়ে আছি। আমাকে চিৎকার করতে প্রথম শুনেছিল সুগুয়োই, আর ও ওর স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী খেলতে থাকল। দরজা ধাক্কাতে লাগল, আমাকে লক খুলতে বলল। আমার শরীরে ক্ষত কোথায় হয়েছে তা পরীক্ষা করার নাম করে পেছন থেকে ছুরি বসিয়ে দিল। যেহেতু আমি কোন ব্যথা অনুভব করতে পারি না তাই অদ্ভুত হলেও আমি ব্যাপারটা খেয়াল করিনি।
সোফায় শুয়ে আমি আমার দিকে নিচু হয়ে তাকিয়ে থাকা চার জনের মুখের দিকে তাকালাম। ওদের মাথা ছাড়িয়ে ফুরোসেন্ট বাতির আলোটাকে অনেক বেশি উজ্জ্বল মনে হচ্ছিল। আমি হাসলাম, আর অন্যদের থেকে একটু আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুগুয়ের দিকে মুখ করে একটা শব্দহীন ইঙ্গিতের মাধ্যমে জানিয়ে দিলাম, “আমি জানি।”
“কেন, কেন সে হাসছে এভাবে?” সুমাকোর হতবুদ্ধি গলা আমার কানে এল। বুক ভর্তি শান্তি নিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করলাম আমি।
মুখবন্ধ
জু – অৎসুইশি / অনুবাদ : কৌশিক জামান / প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৯
মুখবন্ধ
অৎসুইশি এর ‘গথ’ পড়ে পাঠকদের কেউ কেউ জানতে চেয়েছিলেন ‘জু’ কবে আসবে। পুরো বই অনুবাদ করার পরিকল্পনা প্রথমে ছিল না। অনেককে এমনকি বলেও দিয়েছিলাম যে ‘জু’ বের হওয়ার খুব একটা সম্ভাবনা নেই। এর তিনটি গল্প অন্য সংকলন, ম্যাগাজিন আর অনলাইনে প্রকাশিতও হয়েছিল। তারপরেও সবার চাপাচাপিতে বাকি গল্পগুলো অনুবাদ করে বইমেলা ২০১৯ এর জন্য বইটি শেষ করলাম। আমি যে অলস, চাপাচাপি ছাড়া কাজ হয় না! তাছাড়া “কাজারি অ্যান্ড ইয়োকো” এবং “সো-ফার” এর মত গল্পগুলো অনুবাদ করতে মানসিকভাবে কিঞ্চিৎ চাপেও পড়তে হয়েছে। পাঠকগণ গল্পগুলো পড়লেই কারনটা বুঝবেন।
