নাগায়ো, সুগুয়ো আর সুমাকো প্রত্যেকটা জিনিস সরিয়ে সরিয়ে ভাল করে খুঁজে দেখছিল। আমি বিশ্বাস করতে আরম্ভ করছিলাম যে আমি (বিশেষ করে) অনিচ্ছা সত্ত্বেও মরতে যাচ্ছি। এই মানুষগুলো সবাই অকাট নির্বোধ। আমি শান্তিতে মরতে পারতাম যদি শুধু জানতাম যে আমার উত্তরাধিকারদের মধ্যে কেউ একজন আমার কোম্পানির বারোটা বাজাবে না।
ডাঃ ওমোজির সাহায্য নিয়ে আমি লিভিং রুমের সোফা পর্যন্ত গেলাম। সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। নিজে নিজে হাঁটাচলা করার ক্ষমতা আর ছিল না। পাগুলো থরথর করে কাঁপছিল।
“আহ! তাই তো!” সুমাকো বলে উঠল, ও কিচেনের ভেতর ব্যাগটা খুঁজতে গিয়েছিল। আমার সোফার দিকে এগিয়ে এল। ওর গলা শুনে নাগায়ো আর সগায়েও লিভিং রুমে এসে হাজির হল। “আমি যখন কেক বেড়ে দিচ্ছিলাম, তখন লিভিং রুমের দরজার কাছে কিছু একটায় পা পড়েছিল বলে মনে পড়ল। কি বোকা আমি, সেটা কি রক্তের ব্যাগটা ছিল?”
“কি বলতে চাও? ওটা নিয়ে পরে কি করেছিলে?” শরীর থেকে শক্তিও বেরিয়ে যাচ্ছিল, আমার কণ্ঠও নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিল।
“ওটা আমার মেজাজ খারাপ করে দিয়েছিল। তাই কষিয়ে একটা লাথি দিয়েছিলাম।”
“আমার রক্ত..!”
“কিন্তু ব্যাগটা, ওটা তাহলে কোথায় এখন?”
সুগুয়ো মাথা বাঁকাল। ওটা যদি ওর রুম কিংবা সুমাকোর, নাগায়োর, ডাঃ ওমোজির রুমে না থাকে তাহলে কোথায় থাকতে পারে?
আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমি মরতে যাচ্ছি। ঐ পর্যায়ে, আমার জঘন্য স্ত্রী আর পুত্রদের প্রতি এক রকমের মমতা বোধ জেগে উঠছিল। আমি তাদেরকে শেষবারের মত একবার ভাল করে তাকিয়ে (মমতা পূর্ণ?) দেখলাম।
তখনই মুডটা নষ্ট করে আধমরা ডাক্তারটা চেয়ার টেনে একদম আমার সামনে এসে বসলেন। খবরের কাগজ থেকে খেলার পাতাটা বেছে নিয়ে জোরে জোরে পড়তে লাগলেন। গতকালকের সুমো ম্যাচের একটা বড় ছবি আমার পুরো দৃষ্টি জুড়ে ভেসে উঠল। এরকম কোন দৃশ্য আমার শেষ মুহূর্তে অবশ্যই দেখতে চাইনিঃ এক দল সুমো রেসলার একজন আরেকজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কিন্তু আমি অন্য কিছু লক্ষ্য করলাম।
“ডাঃ ওমোজি! আপনি আপনার পা দিয়ে ঠকঠক করছেন না!”
খবরের কাগজের তলা দিয়ে মেঝের উপর তার পা দেখতে পাচ্ছিলাম। তিনি আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমার মাথায় কোন সমস্যা আছে। “গত কয়েক বছর ধরে আমি আমার অনবরত পা ঠক ঠক করার অভ্যাসের সুইচ বন্ধ করে রেখেছি,” বলে তিনি খবরের কাগজের পাতা উল্টালেন।
আমি একটা সম্ভাবনা নিয়ে ভাবলাম, আর আমার মাথার উপর একটা ছোট বাল্ব জ্বলে উঠল। “সুগুয়ো, আমার রুমে গিয়ে খুঁজে দেখ তো!”
আমার কণ্ঠস্বর ভীষণ দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। সুগুয়ো আমার আর ডাঃ ওমোজির মাঝখান দিয়ে রুমের দিকে তাকাল।
“অ্যাঁ? অসম্ভব! আমি এটা কল্পনাও করতে চাই না। ব্যাপারটা খুবই ভীতিকর। পুরো রুমটা রক্তে থৈ থৈ করছে!”
“ঠিক আছে তাহলে, নাগায়োয় আমার ঘরে গিয়ে ভাল করে খুঁজে দেখ, বিশেষ করে বিছানার তলে!”
আমার বড় পুত্র আমার কথা শুনল আর আমার রুমে গেল। সোফার যেখানে আমি শুয়ে ছিলাম সেখান থেকে খোলা দরজা দিয়ে ওর পিঠ দেখা যাচ্ছিল। বিছানার নিচে খোঁজাখুঁজি করছে। অবশেষে ও বলল, “পেয়েছি!” যখন লিভিং রুমে ফিরে এল তখন ওর হাতে কালো ব্যাগটা দেখা গেল।
একদম সময় মত…।
আমার মনে হল বুকের উপর থেকে বিশাল একটা বোঝা নেমে গেল। ততক্ষণে আমি প্রায় অর্ধেক অচেতন, কিন্তু আমার আত্মবিশ্বাস ছিল যে আরো কিছুক্ষণ টিকে থাকতে পারব।
“কিন্তু ব্যাগটা ওখানে গেল কি করে?” সুমাকো মাথা কাত করে প্রশ্ন করল।
“ডাঃ ওমোজি যখন আমাকে পরীক্ষা করছিলেন তখন তুমি ব্যাগটায় লাথি মেরেছিলে। এখান থেকে দরজার ঠিক পাশেই বিছানাটা হওয়ায় সেটা সোজা বিছানার নিচে চলে যায়।”
ডাঃ ওমোজি যখন আমাকে পরীক্ষা করে দেখছিলেন তখন একটা শব্দ (আসলেই) আমার কানে এসেছিল। আমি ভেবেছিলাম সেটা ডাঃ ওমোজির পা দিয়ে ঠকঠক করার শব্দ। আসলে সেটা ছিল ব্যাগটা পিছলে বিছানার নিচে ঢুকে যাওয়ার শব্দ।
নাগায়ো আর সুমাকো ব্যাগটার দিকে তাকাল। ওদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল বড়ই অসন্তুষ্ট। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম ডাঃ ওমোজি কখন আমার বাহুতে আইভি নিডল পুশ করবেন।
“ডাক্তারসাহেব, দয়া করে তাড়াতাড়ি করুন। আমি আমার সীমায় প্রায় পৌঁছে গিয়েছি।”
“সম্ভব হচ্ছে না,” তিনি বললেন। মুখে আফসোসের ছায়া। ব্যাগটা খুলে ভেতরে দেখালেন। “ব্যাগের ভেতরে কিছু নেই।”
৫
“বুড়ো ভাম কোথাকার, আপনি ব্যাগে রক্ত ভরতে ভুলে গিয়েছিলেন, শেষ চেতনাটুকু আঁকড়ে ধরে আমি বললাম। আমার এক পা ততক্ষণে (নিশ্চিতভাবে) অন্য জগতে। কিন্তু আমার কণ্ঠ শুনে মনে হল কোন ঘোট মেয়ে নাকি কান্না কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ছে। আমি বুঝতে পারছিলাম মৃত্যুর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, একদম হতভম্ব। আমার জীবন তার শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছে।
পুরো শরীর নিস্তেজ হয়ে গিয়েছে, বিন্দুমাত্র শক্তি নেই। বাঁচার আর কোন পথ খোলা নেই মনে হচ্ছে। একমাত্র পথ ছিল চোখ দুটো বন্ধ করে ঘুমের গভীর সাগরে ডুব দেয়া, যেখান থেকে আর কখনো মাথা তোলা হবে না।
আমার দৃষ্টি যখন ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছিল, তখন দেখতে পাচ্ছিলাম ডাঃ ওমোজি তার হাত বাম থেকে ডানে নাড়াচ্ছেন। তিনি নিশ্চয়ই আমার একদম সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু মনে হচ্ছিল অনেক দূরে দাঁড়ানো।
