ও স্রেফ শুনে গেল, হাসল আর মাথা চুলকাতে থাকল। আমি ওকে যত আজেবাজে কথাই বলি না কেন ও খালি হাসবে, বেচারা।
গত রাতে ও যখন কার্ডের জাদু দেখানো শেষ করল তখন আমি খেয়াল করলাম ঘড়িতে ইতিমধ্যে দশটা বেজে গিয়েছে। ডাঃ ওমোজি বলা শুরু করলেন যে তিনি হিকারু উদার একটা গান গাইতে চান, কিন্তু কোন সুযোগ দিলাম না তাকে। অন্যদের চেয়ে আগেই আমি ঘুমুতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ছুটিতে ঘুরতে গেলেও আমি আমার নিয়মমত চলার চেষ্টা করি, রাত দশটায় শুয়ে পড়ি আর ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠি।
ঘুমুতে যাওয়ার আগে ডাঃ ওমোজি আমার রুমে এলেন কোথাও কেটে টেটে গিয়েছে কিনা পরীক্ষা করে দেখার জন্য। আমি শুয়ে পড়ে জানালার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। জানালার ফেমটা ছোট আর একদম চারকোনা, দরজার উল্টোপাশের দেয়ালে লাগানো। বিছানার ঠিক পাশেই। যে কারনে জানালা দিয়ে বাইরের তারাভরা আকাশ দেখা যায়। খালি জানালাটা বাজেভাবে লাগানোর কারনে কয়েক সেন্টিমিটারের বেশি খোলা যায় না। রুমের ভেন্টিলেসনের অবস্থা তাই (খুবই) খারাপ। কেউ আমার সাথে রুম বদলাতে রাজি না হওয়ায় প্রতিবার কেবিনে এলে এই রুমটাতেই আমাকে ঘুমাতে হয়।
রুমের দরজা খোলা ছিল। লিভিং রুমে বসে আমার স্ত্রী আর দুই পুত্রর হাহাহিহি পরিস্কার শুনতে পাচ্ছিলাম। ওরা (মনে হল) কেক খাওয়ার মুডে ছিল।
যেহেতু আমার ত্বক কোনো স্পর্শ অনুভব করতে পারে না তাই ডাক্তার তার হাত দিয়ে কি করছিলেন তা বলা মুশকিল। আমার চিন্তা হচ্ছিল যে তিনি আসলে আমাকে পরীক্ষা না করে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কিনা। বিছানার নিচ থেকে আসা থপথপ শব্দ শুনে নিশ্চিত হলাম তিনি এখনো ঘুমিয়ে পড়েননি। কিন্তু যখন আমি ঘুরে তাকালাম তখন দেখি তিনি শুধু বিছানার পাশের চেয়ারে বসে আছেন। বোঝাই যাচ্ছে ঝিমাচ্ছেন।
খোলা দরজাটা দিয়ে আমি লিভিং রুমের টেবিল দেখতে পাচ্ছিলাম। আমি দেখলাম সুমাকো কিচেন নাইফ দিয়ে কেক কাটছে।
“ডাক্তারসাহেব! ওরা সবাই ওই রুমে কেক খেয়ে শেষ করে ফেলছে,” আমি বিড়বিড় করে বললাম। তিনি চেয়ার থেকে উঠে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন, চিৎকার করে বলতে বলতে, “উপরের চকলেট বারটা কিন্তু আমার।”
আমি বিরক্তির সাথে মাথা নেড়ে বিছানা ছেড়ে উঠলাম আর দরজার দিকে এগুলাম। ওদের চারজনকে কেক ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে চাইছিলাম।
একটু পর দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে ছিটকিনি লাগালাম, আর রুমের ভেতর একা হয়ে পড়লাম। বাতি নিভিয়ে হাই তুলে ঘুমিয়ে পড়লাম।
***
“তুমি যখন রুমে ফিরে গেলে আমরা তখন কেক খাচ্ছিলাম। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে রক্ত ভর্তি ব্যাগটা তখন লিভিং রুমে আর ছিল না।”
নাগায়োর কণ্ঠ শুনে আমি চোখ খুললাম আর বর্তমান আলোচনায় ফিরে এলাম। টেবিলে চারজন বসে আছে, আর আগের মতই আমার শরীর থেকে রক্ত (এখনো) বেরিয়ে যাচ্ছে, আমি তখনো দেখতে পাচ্ছিলাম ছুরিটা শরীরে বিঁধে আছে। এক সময় মনে হল, প্লাটিপ্লাসের অনুকরণ নিয়ে আলোচনা শেষ হলে রুমের ভেতর নীরবতা নেমে এল।
“নাগায়ো, যদি তোমাকে আমার বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে রাত দশটায় আমি যখন রুমে ঢুকেছিলাম তার আগেই ব্যাগটা ঢোকার মুখ থেকে। নাই হয়ে গিয়েছিল।”
সুমাকো কথা বলে উঠল। ওর মুখে অদ্ভুত এক অভিব্যক্তি। “সম্ভবত এগারোটা কিংবা তারও পরে, আমরা সবাই আমাদের যার যার রুমে ফিরে গিয়েছিলাম…এই কথায় আরেকটা কথা মনে পড়ল, এই কেবিনে শুধু একটাই ছুরি আছে।”
মানে কি? “আহ হা! আমি বুঝতে পেরেছি?” সুগুয়ে বলল, সুমোকোর কথার মূল বক্তব্য ধরতে পেরে। তার মানে বাবার শরীরের ছুরিটা অবশ্যই….”
“হ্যাঁ, ভাল করে দেখ, ব্লেডের শেষ মাথায়, হাতলের কাছে, একটু খানি হুইপড ক্রিম লেগে আছে।”
সেই মুহূর্তে, ডাঃ ওমোজি রক্তাক্ত ছুরিটা টেবিলের উপর রাখলেন। দেখে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছিল এই একই ছুরি দিয়ে কেকটা কাটা হয়েছিল।
“অ্যাঁই, এক মিনিট দাঁড়াও! ছুরি! কেউ একজন সেটা আমার শরীর থেকে টেনে বের করেছে!”
আমি হাত দিয়ে স্পর্শ করে টের পেলাম ছুরিটা আর আমার শরীরে গেঁথে নেই।
“হেঃ হেঃ হেঃ এবার কে বোকা হল? আমি আপনার শরীর থেকে ছুরিটা টেনে বের করে ফেলছি আর আপনি একদমই টের পাননি!”
“আপনি! আপনি কি আসলেই কোন ডাক্তার?”
নাগায়ো ওর হাত দুটো ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে ছিল। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়ানো কোন সেলসম্যানের মত, যারা কিনা সরল গৃহিণীদের পটানোর ধান্দায় থাকে।
“হ্যাঁ, বাবা রুমে ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা কেক কাটিনি।”
আমি মাথা ঝাঁকালাম। দরজা বন্ধ করার আগ মুহূর্তে আমি যা দেখেছিলাম তা ছিল সুমাকো ছুরি দিয়ে এক পিস কেক কেটে প্লেটের উপর রাখছে।
“এরপরই তুমি দরজা লাগিয়ে দিলে,” নাগায়ো বলল। “তাহলে এই হুইপড ক্রিম মাখানো ছুরিটা তোমার রুমের ভেতর গেল কি করে। আমি নিশ্চিত তুমিও এই প্রশ্নর উত্তর জানতে চাও, এমনকি সেটা অন্য দুনিয়াতে যাওয়ার পর হলেও…”
আমি এখনো মারা যাইনি..
রক্তশুন্যতার কারনে আমার মাথা ঘোরাচ্ছিল। আমি আমার স্ত্রী আর দুই পুত্রকে আবারও ঝাড়লাম রক্তের ব্যাগটা কোন কিছুর নিচে আড়াল হয়ে পড়ে আছে কিনা ভাল করে দেখতে। আমার জিহ্বা ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল, শব্দগুলো উচ্চারণের সময় ঠিকমত বের হচ্ছিল না।
