নাগায়ো আর সুমাকোকে আনন্দিত দেখাল।
“আমরা যখন বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম তখন তো ব্যাগটা আপনার সাথে ছিল, নাকি? কোন জায়গায় আপনি ফেলে গিয়ে থাকতে পারেন?”
“কোন ধারণা নেই,” ডাঃ ওমোজি মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন। “আমার এমনকি স্পষ্ট মনে নেই, আমরা যখন এখানে এসেছি তখন সেটা আমার কাছে ছিল কিনা। আমি হয়ত সেটা আগের ট্রেনেই ফেলে এসেছি। হতে পারে অন্য কারো লাগেজের সাথে উল্টোপাল্টা হয়ে গিয়েছে।”
আমি আমার স্ত্রী আর ছেলেকে নির্দেশ দিলাম গিয়ে ওদের ব্যাগ পরীক্ষা করে দেখতে।
“সুমাকো আর নাগায়ো যদি তোমার রক্তসহ ব্যাগ খুঁজেও পায় তাহলেও হয়ত ওরা সেটা লুকিয়ে ফেলবে,” সুগুয়ো বলল। ঠিকই বলেছে অবশ্য।
“ঠিক আছে তাহলে একটা কাজ করা যাক: যেই ব্যক্তি আমার রক্তওয়ালা ব্যাগ খুঁজে পাবে, তাকে আমি আমার সব সম্পদ দিয়ে দেব-কোম্পানি, সম্পত্তি, সব। তোমরা যদি টাকাই চাও, তাহলে যাও, গিয়ে রক্ত খোঁজো!”
নাগায়ো আর সুমাকো আমার দিকে তাকিয়ে থাকল, বিস্মিত।
“কোন চিন্তা কোরনা প্রিয়! আমি এখনই খুঁজে বের করছি!”
“আমিও!”
ওরা দুজন উঠে রুম থেকে বেরিয়ে দোতালায় ওদের রুমের দিকে ছুটে গেল। সগুয়োও একই কাজ করল। ডাঃ ওমোজি তার সাদা কোটের হাতা গুঁটিয়ে নিলেন, মনে হচ্ছিল তিনিও তাদের সাথে যোগ দেবেন।
“আপনি না, ডাঃ ওমোজি, আপনি রক্ত খুঁজে পেলে আমি আপনাকে আমার কিছুই দিচ্ছি না।”
“আমিও তাই ভেবেছি।”
“এই বাড়ির অন্য কারো শরীর থেকে কি আমি রক্ত গ্রহণ করতে পারব?।”
“আপনি তো ‘টাইপ ও তাই না? বাকি সবাই এ, বি কিংবা এবি। দুঃখিত সেটা সম্ভব নয়।”
উপরের তলা থেকে ভেসে আসা শব্দে বুঝতে পারছিলাম তিনজন মানুষ তাদের লাগেজ তছনছ করছে। পুরোটা সময় আমার শরীর থেকে রক্ত বেরিয়ে যেতেই থাকল।
“আপনি কি অন্তত কিছু একটা করতে পারেন না যাতে অন্তত রক্তপাতটা বন্ধ হয়?”
তিনি মাথা ঝাঁকালেন। “আমার সাথে আমার প্রিয় স্কালপেল আর সেলাই দেয়ার সুতো আছে। আমি একটা ছোট অপারেশন করতে পারি। সৌভাগ্যজনকভাবে আমাদের অ্যানাস্থাসিয়ার প্রয়োজন নেই।”
“আপনার কাছে হাত জোর করছি। আমাকে আরো খানিকটা সময় বাঁচতে হবে। এই তিনজনের উপর কে নির্ভর করতে পারবে বলুন? বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে আমি এই কোম্পানি দাঁড় করিয়েছি। আপনার কি ধারণা আমি সেটা ধ্বংস করার জন্য ওদের হাতে তুলে দিতে পারব?”
“চিন্তা করবেন না। আপনি এখনই মরছেন না।”
ডাক্তারসাহেব তার পকেট থেকে একটা মরচে ধরা স্কালপেল বের করলেন।
“এক মিনিট দাঁড়ান। এই স্কালপেল দিয়ে অপারেশন চালাবেন? এটাতে তো মরিচা লেগে আছে!”
“খানিকটা মরিচা নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন কেন? এখন তো জীবন-মরণের প্রশ্ন। প্রত্যেকটা সেকেন্ড এখন মূল্যবান!” তার স্কালপেল ধরা হাতটা পাতার মত কাঁপছিল।
“ডাক্তারসাহেব, শেষ কবে আপনি কারো অপারেশন করেছেন?”
“ওহ, সম্ভবত আপনার জন্মের আগে।”
এক ঝটকায় (বিস্ময়করভাবে) আমি ডাক্তারের হাত থেকে স্কালপেলটা ফেলে দিলাম।
“শুনুন ডাক্তারসাহেব, আমার মনে হচ্ছে আপনার জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভাল হয় যদি মনে করতে পারেন রক্তের ব্যাগটা কোথায় রেখেছেন। ওইটা ছাড়া আমি একদম শেষ।”
আগেরদিন বাসা ছেড়ে বের হওয়ার পর কি কি ঘটেছে তার খুঁটিনাটি মনে করার চেষ্টা করলাম আমি।
***
দুটো ট্যাক্সিতে করে সকাল দশটায় বাসা ছেড়েছিলাম। বাকি সবার মধ্যে একমাত্র আমারই ডাইভিং লাইসেন্স আছে, কিন্তু দুর্ঘটনাটার পর থেকে স্টিয়ারিং হুইলের পেছনে আর বসা হয়নি।
“আপনি কি নিশ্চিত যে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় রক্তের ব্যাগটা আপনার কাছে ছিল?”
“কোন সন্দেহ নেই, আমার কোলের উপরই ছিল।”
দুটো ট্যাক্সিই স্টেশনে পৌঁছলে আমরা ট্রেনে চড়েছিলাম। আমার মনে পড়ল ট্রেনের দোলায় ডাঃ ওমোজিকে কেমন দেখাচ্ছিল। দুই হাত দিয়ে নিজের লাঞ্চ বক্স চেপে ধরে রেখেছিলেন।
“ট্রেনের ভেতর আপনি দুই হাত দিয়ে আপনার লাঞ্চ বক্স ধরে রেখেছিলেন।”
“ঠিক বলেছেন, একদম ঠিক। আমারও সেটা স্পষ্ট মনে আচ্ছে। লাঞ্চটা ভাল ছিল।”
“কিন্তু রক্তের ব্যাগটা কোথায় ছিল তখন?”
“ধুর! আমি কি বোকা! আমি নিশ্চয়ই সেটা ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে ফেলে এসেছিলাম।”
ভুলো মনের বুড়ো ভাম কোথাকার! আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার পেছনে একটা কণ্ঠ বলে উঠল।
“সেটা হয়নি। আমরা ডাক্তারসাহেবের লাগেজ প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনে তুলেছিলাম। আমি নিজে রক্তের কালো ব্যাগটা টেনে তুলেছিলাম।”
কণ্ঠটা সুগুয়োর। এর মধ্যে কোন এক সময় নিশ্চয়ই সে নিচতলায় ফিরে এসেছে।
“তাহলে সুগুয়ো, ব্যাগটা কি তুমি তোমার রুমে নিয়ে গিয়েছিলে?”
“না আমার রুমে সেটা নেই,” সে মাথা নাড়ল। আমি অনুভব করলাম আমার কাঁধগুলো অসন্তুষ্টির ভারে দেবে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল শরীরের তাপমাত্রা পড়ে যাচ্ছে, হাত-পায়ের আঙুলগুলো ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে।
“বাবা তোমাকে ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে।”
“অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে পরিমাণ রক্ত হারিয়েছি। সুগুয়ো, আমি ধূমপান করতে চাই। একটা সিগারেট দাও।”
“সিগারেট তোমার জন্য ক্ষতিকর, জানো না?”
“এখন কি এইসব কথাবার্তা বলার আর সময় আছে?”
ট্রেন থেকে নামার পর আমরা আবার ট্যাক্সি নিয়েছিলাম। তারপর চল্লিশ মিনিটের মত ডাইভের পর এই মাউন্টেইন লজে এসে পৌঁছাই। তবে আমরা প্রথমে স্টেশনের কাছে একটা মুদির দোকানে গিয়েছিলাম। এটা আমাদের সাধারণ রুটিন। গাট্টিবোঁচকা নিয়ে কেনাকাটা করতে যাওয়া বেশ ঝামেলাদায়ক। তাই সুগুয়ো আর ডাঃ ওমোজি আমাদের সবার ব্যাগ নিয়ে কেবিনে চলে গিয়েছিল।
