“আমার মনে হয় তিনি এখনো তার রুমে ঘুমাচ্ছেন,” সুগুয়ো মাথা নাড়তে নাড়তে বলল। “আমি গিয়ে তাকে ঘুম থেকে উঠাচ্ছি।”
ডাঃ ওমোজির রুম এক তলাতেই ঠিক আমার পাশের রুমটায়। এইসব চিল্লাচিল্লিতে তারই সবার আগে লাফিয়ে ওঠার কথা। কিন্তু কানে বিশাল সমস্যা থাকায় তিনি সম্ভবত টের পাননি। হয়ত তিনি রাতেই বিছানায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। সব কিছুই সম্ভব। তার বেডরুমের দরজাটা লিভিং রুমের দিক থেকে খুলে, যে কারনে আমি পরিস্কার দেখতে পারলাম নাগায়ো দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাক্তারকে ডাকল।
কিছুক্ষণ পর তিনি মাথার পেছনটা চুলকাতে চুলকাতে বেরিয়ে এলেন। উনি আর নাগায়ো এগিয়ে এল আমরা যে টেবিলে বসে ছিলাম সেদিকে। এই পুরোটা সময় আমার শরীর থেকে রক্ত বেয়ে পড়তেই থাকল, কারপেট ভিজে চুপচুপ।
“ডাঃ ওমোজি, আপনার ঘুমে বাধা দেয়ার জন্য দুঃখিত। আপনি একটু দয়া করে দেখবেন? কেউ একজন আমার পিঠে ছুরি মেরেছে মনে হচ্ছে?”
নাগায়ো ডানে বামে মাথা নাড়ল।
“না, বাবা, তুমি ভুল করছ। ডাক্তারসাহেব জেগেই ছিলেন।”
আপাদমস্তক সাদা পোশাক পড়া ডাঃ ওমোজি আমার দিকে এগিয়ে এলেন। কোথাও যাওয়ার সময় তিনি প্রায় সবসময়ই পুরো সাদা পোশাক পড়েন।
“আ…আমি খুবই দুঃখিত। আমি আপনাকে চিল্লাচিল্লি করতে শুনেছি। কিন্তু প্রতিদিন ভোর সোয়া পাঁচটায় একটা ট্রাভেল শো হয় যেটা আমার খুব পছন্দ। আমার কাছে মনে হয়েছে আপনার সমস্যা যাই হয়ে থাকুক না কেন তার চেয়ে এই প্রোগ্রামটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ।”
“বুড়ো হাঁস কোথাকার!” সুমাকো ফেটে পড়ল।
“আচ্ছা যাই হোক, এখন এখানে এসে দেখুন তো আমাকে,” আমি বললাম। ওমোজি কাত হয়ে আমার ক্ষত পরীক্ষা করলেন।
“আহা!” তিনি বললেন। “একটা কিচেন নাইফ গেঁথে আছে আপনার শরীর! এ ব্যাপারে আমার কিছুই করার নেই।”
“ওয়াও! নিজের চোখে একটা শবচ্ছেদ দেখার সুযোগ পাচ্ছি। কখনো ভাবিনি এরকম সুযোগ হবে।” নাগায়ো বলল।
শবচ্ছেদ? কি বলতে চাইছে সে? আমি এখনো মারা যাইনি। “আপনি কি কোনভাবেই কোন সাহায্য করতে পারবেন না ডাক্তারসাহেব?” আমি বললাম, আমার নির্বোধ সন্তানকে উপেক্ষা করার যথাসাধ্য চেষ্টা চালালাম।
“দাঁড়ান, আমাকে একটু চিন্তা করতে দিন। ওরকম একটা ক্ষত নিয়ে আপনি টিভির সকালের খবর পর্যন্তও টিকবেন না। খুব খারাপ অবস্থা।”
টেবিলের অপর পাশে সুমাকোর চোখগুলো যেন বেরিয়ে আসছিল, হাতের তালু দিয়ে মাথা চাপড়াচ্ছিল ও।
“কি হচ্ছেটা কি এখানে? তাহলে আমাদের সাথে একজন ডাক্তার রেখে লাভটা কি হল যদি…।”
এক হাতের আঙুল ওর দিকে তাক করে অন্য হাত দিয়ে ডাঃ ওমোজির হাত আঁকড়ে ধরলাম।
“আমার স্ত্রী আতংকিত। এ থেকে বেঁচে যাই এরকম উপায়ই কি নেই?”
ডাক্তারের ভাঁজপড়া মুখ থেকে একটা হাসি বেরিয়ে এল।
“চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। এরকম কোন কিছু কোন একদিন হতে পারে তা আমি আগেই আন্দাজ করেছিলাম। যে কারনে আমরা কোন টিপে গেলে আমি সবসময় সাথে করে ট্রান্সফিউসনের জন্য প্রয়োজনীয় রক্ত বহন করি।”
এই কথাগুলো শুনে আমি হাঁটু ভেঙে বসে পড়লাম। মাঝে মাঝেই সে আমার বাহুতে সুই ঢুকিয়ে কিছু রক্ত বের করে নিত। এত ঘন ঘন করত যে আমার সন্দেহ পর্যন্ত হয়েছিল বুড়ো আমার রক্ত নিয়ে কোথাও বিক্রি করে কিনা। এখন বুঝতে পারলাম সে আসলে এরকম কোন পরিস্থিতির জন্য রক্ত সংরক্ষণ করছিল। ওর মাথার উপর স্বর্গদূতদের মত পবিত্র আলোর রিং দেখতে পাচ্ছিলাম বলে মনে হল।
আমরা যদি এখন ট্রান্সফিউশন শুরু করি তাহলে আপনি এ্যাম্বুলেন্স আসা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারবেন। কেউ একজন এ্যাম্বুলেন্স ডেকেছে বলে ধরে নিয়েছি আমি।”
আমরা তাকে ব্যাখ্যা করলাম যে লজ পর্যন্ত এ্যাম্বুলেন্স আসতে আধা ঘন্টার মত লাগবে।
“তাহলে তো একদম ক্লোজ কল। যাই হোক, আপনার রক্তের একটা বড় সাপ্লাই আমার রুমে রাখা আছে। আমি গিয়ে সেটা নিয়ে আসছি।”
ডাঃ ওমোজি তার রুমের দিকে ছুটলেন।
“যাক, বেঁচে থাকার প্রতি তোমার যথেষ্ট আগ্রহ দেখে আমি আনন্দিত, বাবা।”
“হ্যাঁ, আমিও তাই বলব। সবচেয়ে আনন্দজনক হবে যদি তুমি বেঁচে থাকো আর আমাদের সাথে নিয়ে লম্বা একটা জীবন পার কর।”
নাগায়ো আর সুমাকোর এইসব ভাবা কথা আমার কাছে খুবই ক্লান্তিকর লাগল। কেউ একজন জিব্বা দিয়ে ইস! ধরনের শব্দ করল।
“বাবা, তুমি যদি মারা যাও, আমাকে তাহলে এই দুজনের সাথে থাকতে হবে? তাহলে অনেক ভয়ের ব্যাপার,” সুগুয়ো বলল, কেঁদে ফেলবে মনে হচ্ছিল। ও আমার কাঁধে হাত রেখে নিজের কথার উপর জোর বাড়াতে চাইল।
হাত সরাও, আমি নিজে নিজে ভাবলাম, তুমি শুধু রক্তপাতটাকেই বাজে অবস্থায় নেবে। ওর হাত সরে গেল (অবশেষে) যখন ডাঃ ওমোজি ফিরে এলেন। তার হাসি এক কান থেকে আরেক কানে গিয়ে ঠেকেছে।
“প্লিজ, ডাক্তারসাহেব, আমাকে রক্ত দিন। আমার মনে হচ্ছে জ্ঞান হারিয়ে ফেলব।”
“আমার মনে হয় সেটা সম্ভব হচ্ছে না।”
মানে?
“আমি দুঃখিত, কিন্তু মনে হচ্ছে আমি আপনার রক্ত রাখা ব্যাগটা কোথাও ফেলে এসেছি।”
পঁচানব্বই বছর বয়সি এক বুড়োকে লজ্জায় লাল হতে দেখাটা অবশ্যই একটা দুর্লভ দৃশ্য।
৪
কোথাও ফেলে এসেছে মানে?
“আমি বুঝতে পারছি না কিভাবে এমনটা হল, কিন্তু জিনিসটা আমার রুমে নেই।’
