এরকম বিদঘুঁটে ধরনের আন্ডারওয়্যার কিনেছে আমার জন্য। তারপর উপলদ্ধি করলাম বিন্দুগুলো আমার নিজের রক্ত। ঘুমানোর সময় একটা পেরেক আমার পিঠের দুই তিন জায়গায় ফুটো করে দিয়েছে। আমি এমনই গভীর ঘুম ঘুমাই (তাই তো মনে হচ্ছে) যে নড়াচড়ার কারনে আরও কয়েক জায়গায় ফুটো হয়ে গিয়েছে।
এই হল আমার অবস্থা। মাঝে মাঝে আমার স্রেফ চোখে পড়ে যে রক্তপাত হচ্ছে। মাঝে মাঝে এরকম পেরেকে গেঁথে যাই আর খেয়ালও করি না। একবার ড্রেসারের কোনায় কড়ে আঙুলে এত জোরে বাড়ি খেয়েছিলাম যে হাড়ই ভেঙে গিয়েছিল। পুরো দুটো দিন আমার চোখে কোন অসঙ্গতি ধরা পড়েনি।
আমি আমার নিজের নিরাপত্তা নিয়ে অত্যন্ত ভীত ছিলাম। ঠিক করলাম প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পারিবারিক ডাক্তার, ডঃ ওমোজি (বয়স পঁচানব্বই বছর) আমাকে পরীক্ষা করে দেখবেন। আমি নিশ্চিত হতে চাই যে কোথাও আহত হইনি।
দুর্ঘটনার পরবর্তী বছরে আমি বেঁচে থাকার সমস্ত উৎসাহ হারিয়ে ফেললাম। স্ত্রীকে হারিয়ে, আকাইম্মা ছেলেপেলের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে, আমার আনন্দ বলতে একমাত্র জিনিস যা ছিল তা হল নিজের কোম্পানিকে বড় থেকে আরো বড় হতে দেখা।
তবে এই উন্নতি আসলে ছিল দুদিকে ধারওয়ালা তলোয়ারের মত। কোম্পানির সম্পদের কারনে আমি ধনী থেকে আরো ধনী হতে লাগলাম। কিন্তু যেহেতু আমার ছেলেদেরকে দায়িত্ব নেয়ার যোগ্য মনে করতে পারছিলাম না তাই কখনো অবসর নেয়ার কথাও কল্পনা করতে পারছিলাম না। হাসি কমে গেল। ব্যথাহীন এক পৃথিবীতে আমি আহত হওয়ার ভয় নিয়ে বসবাস করতে লাগলাম।
৩
আমার জানালা থেকে সকালের নতুন সূর্যের আলোতে পর্বতমালা দেখতে পাচ্ছিলাম। অসাধারণ দৃশ্য। অবশ্য জানালার বাইরে পাখিদের কিচিরমিচির বেশ বিরক্তিকর ছিল। সুগুয়ো আর সমাকে বিছানার পাশের টেবিলে বসল।
“তোমার অনেক রক্তপাত হচ্ছে। ফোয়ারার মত,” সুমাকো বলল। হাত দিয়ে মুখ চেপে রেখেছে। নাগায়ো ফোন শেষ করে টেবিলে ফিরে এল।
“বাবা, এ্যাম্বুলেন্স ডেকেছি। পর্বতমালার গোড়া থেকে এখানে আসতে ওদের আধঘন্টার মত সময় লাগবে। তুমি কি করতে চাও?”
আধঘণ্টা অপেক্ষা করা নিয়ে আমি গজগজ করলাম। তারপর দেহে নিষ্ঠুরভাবে গেঁথে থাকা ছুরিটার দিকে তাকালাম। দেহটাকে একটু ঘুরাতে হচ্ছে ছুরিটার দিকে তাকানোর জন্য। নয়ত চর্বির জন্য দেখা যাচ্ছিল না। কেউ আমাকে ছুরি মেরেছে, এতে কোন সন্দেহ নেই।
“ওরকম করো না, বাবা! তুমি আরো রক্ত চিপে বের করছ, কাপড় মুচড়ে পানি নিংড়ানোর মত!”
“ওহ, ঠিক বলেছ, তুমি ঠিক বলেছ।” সুগুয়োর দরদ মাখা কণ্ঠ শুনে আমি আমার ক্ষতের দিকে তাকানো বাদ দিলাম। এভাবে যদি রক্তপাত হতে থাকে তাহলে আমি কোনভাবেই ত্রিশ মিনিট টিকব না। এখানে আমাদের মাউন্টেইন লজের একদম কাছাকাছি কোন হাসপাতাল নেই।
“সুমাকো…” নাগায়ো আমার স্ত্রীকে নাম ধরে ডাকে কারন সে ওর চেয়ে বয়সে ছোট। “তুমি হাত দিয়ে মুখ চেপে আছ কেন? অসুস্থ বোধ। করছ?”
সুমাকো মাথা নাড়ল। “না তা নয়। আমি আসলে আমার হাসি চাপার চেষ্টা করছি। আমি অনেক আনন্দিত। অবশেষে আমার এই বুড়ো স্বামী আসলেই মরতে বসেছে।”
আমার কমবয়সি সুন্দরি স্ত্রী আমাকে বিয়ে করেছে শুধু আমার টাকার জন্য।
“কি বলছ এসব?” নাগায়ো আমার দিকে ঘুরল, মুখে তোষামুদে হাসি ধরে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা। আমার সবসময়ই মনে হয়েছে আমার বড় ছেলে এক নাম্বারের একটা ভণ্ড। “বাবা, তুমি নিশ্চয়ই আশা করছ না তোমার সম্পত্তি আমরা এই নারীর সাথে ভাগাভাগি করব? কোম্পানি আমার উপর ছেড়ে দিয়ে তুমি নিশ্চিন্তে মরতে পার।”
“কি বলে দেখ। তুমি এতটাই ঋণে ডুবে আছ যে ওই টাকায় হাত দেয়ার জন্য তর সইছে না।”
“আমি এই দুজনকে বিশ্বাস করতে পারছি না,” সুগুয়ে, আমার কাপুরুষ সন্তান বলল। নিজের চেয়ার ওদের থেকে আরেকটু দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল।
“কি বলছ, নিজেদের কথাগুলো শুনেছ? তোমরা সবাই আজেবাজে কথা বলছ আর আমি এদিকে মরতে বসেছি।”
“এসব হচ্ছেই কারন তুমি মরতে বসেছ,” সুমাকো ছোট একটা নিশ্বাস ছেড়ে হালকাভাবে বলল।
হারামজাদি, ওকে উইল থেকে বাদ দিব আমি।
“বাবা, তোমার রেগে যাওয়া উচিত হচ্ছে না। রক্তচাপ বেড়ে গেলে রক্তপাতের অবস্থা আরো খারাপ হবে।” সুগুয়োর কষ্ট আমাকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনল। আমি জোরে নিশ্বাস নিয়ে রাগ সংবরণ করার চেষ্টা করলাম। তারপর হঠাৎ খেয়াল হল যে সকাল হওয়ার পর থেকে একজন ব্যক্তিকে আমি এখনো দেখিনি।
“ভাল কথা, ডাঃ ওমোজি কোথায়?” তাকে ছাড়া আমি কোথাও ভ্রমণ করি না, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আমরা পাঁচজন একসাথে ছুটি কাটাতে কেবিনে এসেছি।
ডাঃ ওমোজি রীতিমত একজন প্রাগৈতিহাসিক ফসিল। আপনাদেরকে তার বয়সের ধারণা দেয়ার জন্য বলছি, বেশিরভাগ মানুষ তাকে দেখে সাধারণত বলে, “এই বুড়ো কুটের (এক ধরনের হাঁস) এখনো মেডিক্যাল লাইসেন্স আছে? আমি আমার জীবন এরকম কোন বুড়ো ভামের হাতে দিতে চাই না যে কিনা শোগানের (১১৮৫-১৮৬৮ সাল পর্যন্ত জাপানে চলা সামরিক স্বৈরতন্ত্রের নেতৃবৃন্দ) সময় ঘোরাফেরা করেছে। যে কারনে ডাঃ ওমোজির ক্যালেন্ডার সবসময়ই ফাঁকা থাকত। আর আমি আমার সাথে কোন যাত্রায় যেতে বললে তিনি সবসময় দ্রুত উত্তর দিতেন, “আনন্দের সাথেই যাব।” যাওয়ার জন্য তার কোন রিজার্ভেশন ছিল না যে বাদ দিতে হবে (কিচ্ছু না)।
