নিজের হাতের দিকে চোখ পড়তেই আঁতকে উঠলাম। ওগুলো গাঢ় লাল। কোন লাল জিনিস শুকিয়ে মাখামাখি হয়ে আছে। ভয়ে আমি চিৎকার করে উঠলাম। অতীতে আমার একটা বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছিল আর মনে হচ্ছিল (সম্ভবত) সেটা আবারও হতে যাচ্ছে।
“কি হয়েছে বাবা? আমাকে ভেতরে আসতে দিন!” দরজা ধাক্কানোর শব্দ। আমার মেঝো ছেলে, সুগুয়ে (বয়স সাতাশ বছর) এর গলা। মনে হল, দরজাটা ভেতর থেকে লক করা, তাই সে ভেতরে আসতে পারছে না। আমি বিছানা থেকে উঠে বোঝার চেষ্টা করলাম আমার শরীরের কোন অংশ থেকে রক্তপাত হচ্ছে।
“কো…কো…কো…কোত্থেকে? রক্ত কোত্থেকে বের হচ্ছে?”
আমি থরথর করে কাঁপছিলাম, কিন্তু কোনভাবেই বের করতে পারলাম না কোথায় আঘাত পেয়েছি। আমার চোখে রক্ত থাকায় সবকিছু ঘোলাটে দেখছিলাম। যে মুহূর্তে ভাবছিলাম কোত্থেকে রক্তপাত হচ্ছে সেটা বের করার আশা ছেড়ে দেব আর (কোনভাবে) তখন উঠে দরজার কাছে গিয়ে লকটা খুলতে পারলাম।
“বাবা!”
সুগুয়ে দরজা খুলে হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকল। তারপর আমার অবস্থা দেখে চিৎকার করে উঠল, “অ্যাঁ!”
“কো…কো…কো…কোত্থেকে আমার রক্ত বের হচ্ছে? তাড়াতাড়ি দেখ সুগুয়োয় খুঁজে বের কর!”
সুগুয়োকে সবসময় কাপুরুষ মনে করে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখতাম, আর এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিল সে হয়ত দেখেই দৌড়ে পালিয়ে যাবে। কিন্তু ও (আশ্চর্যজনকভাবে) আমার আকুতি শুনল আর আমার পেছন দিকটা পরীক্ষা করল। আমি ওর মুখ থেকে বের হওয়া ছোট ছোট শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম-আউঃ ইক!
“অ্যাঁ! এই যে পেয়েছি!” ও বলল। “আপনার একপাশে কেটে গিয়েছে বাবা!” আমি হাত দিয়ে জায়গাটা স্পর্শ করার চেষ্টা করলাম আর অনুভব করলাম শক্ত কিছু একটা আমার শরীরে গেঁথে আছে।
সেই সময় আমার দ্বিতীয় স্ত্রী সুমাকো (বয়স পঁচিশ বছর) আর বড় ছেলে নাগায়ো (বয়স চৌত্রিশ বছর) এসে হাজির হল। চোখে রক্ত লেগে থাকার কারনে আমি পরিস্কার করে কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না, কিন্তু এটুকু দেখতে পাচ্ছিলাম যে ওরা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করছে কি হচ্ছে এখানে।
আমি ওদের চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম :
“আয় হায়!”
“এ কি..!”
“সুগুয়ো, আমাকে বল, আমার পিঠে এই শক্ত জিনিসটা কি লেগে আছে?”
“উম…” ও এমন একটা সুরে বলল যার অর্থ অনিচ্ছা আর বুঝতে সময় লাগা দুটোই হতে পারে।
“যত দূর যা মনে হচ্ছে…উম…তোমার পিঠের পাশে যে জিনিসটা লেগে আছে সেটা…একটা কিচেন নাইফ।”
আমার মনে হচ্ছিল জ্ঞান হারিয়ে ফেলব। আমার ডান দিক দিয়ে রক্ত বেয়ে পড়তে থাকল, আর কার্পেটের উপর একটা দাগ হয়ে আস্তে আস্তে বাইরের দিকে যেতে লাগল। ছুরি দিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার কোন স্মৃতি আমার মনে নেই।
২
দশ বছর আগে আমার কারনে একটা ভয়াবহ ট্রাফিক দুর্ঘটনা ঘটেছিল। যে গাড়িটা আমি চালাচ্ছিলাম সেটা ছিল বুলেটপ্রুফ, সেই সাথে স্পিঙ্কলারস দিয়েও সজ্জিত ছিল। এটা ছিল আমার “টাকা কথা বলে” ধরনের গাড়ি যা একটা ট্যাংকের মত করে তৈরি করা হয়েছিল। আমার প্রথম স্ত্রী সে সময় প্যাসেঞ্জার সিটে বসে ছিল।
দুর্ঘটনাটা ছিল ভয়াবহ। আমার গাড়ি, যেটা নিয়ে আমার অনেক গর্ব ছিল, একদলা ভাঙাচোরা ধাতব বস্তুতে পরিণত হয়েছিল। যাইহোক, সৌভাগ্যজনক (অনভিজ্ঞ) অভিজ্ঞতা বলা যায় যে আমি সে যাত্রা বেঁচে গিয়েছিলাম।
হাসপাতালের বিছানায় জ্ঞান ফেরে আমার। আমার পুরো শরীর ব্যান্ডেজ দিয়ে মোড়ানো থাকলেও কোথাও কোন ব্যথা বোধ করছিলাম না। আমি উঠে দাঁড়িয়ে হাসপাতালের ভেতর ঘোরাফেরা করতে লাগলাম, জানার চেষ্টা করলাম আমার স্ত্রীর কি হল।
আমাকে দেখে একজন পুরুষ নার্স চিৎকার করে উঠেছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম যে আমার শরীরে কিছু একটা অন্যরকম লাগছিল, আর তারপর দেখি আমার একটা পা জোড়া দেয়া। আমাকে বলা হল যে আমার অনেক হাড় ভেঙে গিয়েছে তাই আমার উচিত চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকা।
কথাটা গ্রহণ করতে আমার কষ্ট হচ্ছিল। কোন ব্যথা হচ্ছে না, কেন আমাকে শুয়ে বিশ্রাম নিতে হবে?
পরদিন ডাক্তার এসে পরিস্থিতিটা আমার কাছে ব্যাখ্যা করলেন। দুর্ঘটনায় আমার মাথা বেশ ভালভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। এতে ব্রেনের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। দুর্ঘটনার প্রভাবে তখনও ভুগছিলাম। ব্যথা অনুভব করার ক্ষমতা (সম্পূর্ণভাবে) হারিয়ে ফেলেছিলাম।
তখন থেকে, আমি যেকোন ধরনের ক্ষত নিয়ে আতংকে ভুগি। ধরা যাক, হয়ত খবরের কাগজে কমিক্স পড়ছি, আর হোমোবোমো-কুন এর চতুর্থ ফেম লালে ঢেকে আছে। ব্যাপারটা আমাকে বিরক্ত করে তুলল। কে এভাবে আসল অংশটার বারোটা বাজাল? এটা কি ধরনের কার্টুন রে বাবা? কে জানে কার্টুনটার আসল কোন অংশ ছিল নাকি ছিল না? আর সেই মুহূর্তে আমি উপলদ্ধি করলাম আমার আঙুল কেটে যাওয়ায় রক্তপাত হচ্ছিল, আমার নিজের রক্তের দাগ পড়েছিল খবরের কাগজে। হয়ত আমার কুত্তাটা (একটা তোসা প্রজাতির কুকুর) কামড়ে আঙুলের মাংস তুলে নিয়েছে কারন আমি ওকে সকালে খেতে দিতে ভুলে গিয়েছি। নিশ্চিত হওয়ার কোন উপায় আমার কাছে নেই।
কিংবা হয়ত আমি গোসলের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, এন্টার রুমে আন্ডারওয়্যার ছাড়া সব খুলে ফেলেছি, তারপর আমার কাপড়ে লাল লাল বিন্দুর মত চোখে পড়ল। মেজাজটা খিঁচড়ে গেল। চিন্তা করতে লাগলাম কে
