“আমাকে বল তো, তোমার চেহারা ওরকম হল কি করে?” সে জানতে চাইল। আমি ওকে আমার খালার বাড়ি সম্পর্কে জানালাম।
“কি দুঃখজনক,” সে সহানুভূতির সরে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল। ওর বাবাও ওকে পেটাত। সে নিজেও বাসা থেকে পালিয়ে গিয়ে আস্তাবলে থাকত। আস্তাবলে ঘোড়ার গোবরের গন্ধের কথা মনে পড়তে নাক কুচকাল।
“এই ঘরের গন্ধও বেশ তীব্র, কিন্তু আস্তাবলের গন্ধের মত নয়।”
এভাবে আমরা একজন আরেকজনকে নিজেদের গল্প বলে সময় পার করতে লাগলাম। আমি ওকে খালার বাসায় পড়া বইগুলোর কথা বলতে ভুললাম না।
দিনগুলো তখন বড়ই অদ্ভুত ছিল। এই দিনগুলোর আগে আমি নিঃসঙ্গ ছিলাম। সারাদিন শুধু হাঁটু ভাঁজ করে বসে দেয়ালের খোলা চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আগে যে ভয় আমার ভেতর কাজ করত তা আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছিল। আস্তে আস্তে আমার হৃদয় শান্তিতে ভরে উঠছিল।
৪
মেয়েটা ঘুমালোও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। কিছুদিন পর ও কথা বলা কমিয়ে দিল। ওর মুখ আরো ফ্যাকাসে হয়ে যেতে লাগল আর এক সময় ওকে আশেপাশের লাশগুলোর মতই সাদাটে দেখাতে লাগল। আমার মনে হল ও বোধ হয় ঠান্ডা আর ক্ষুধায় মারা যাবে।
“একটা গল্প শোনাও,” মেয়েটা আমাকে বলল। আমি আমার মুখস্ত করা বই থেকে একটা অংশ শোনালাম।
একসময় মেয়েটার চোখের পলক পড়া থেমে গেল। চোখগুলো বিস্তৃত হয়ে ছিল। একটা হালকা হাসি ওর মুখে ছড়িয়ে ছিল।
ওর উচ্চতাও খানিকটা কমে গেল। আমি বুঝতে পারছিলাম আস্তে আস্তে ওর মাথার উপর মৃতদেহগুলোর ভার বাড়তে শুরু করেছে। এমনিতে ও ওর ভাইয়ের চেয়ে একটু লম্বা ছিল। মেয়েটার মুখ ঠান্ডায় সাদা হয়ে গেলে শুধু পোশাকের গাঢ় নীল রংটাই বাড়ির একমাত্র রঙ হয়ে রইল। হাঁটু ভাঁজ করে জড়িয়ে আমি মাঝখানে বসে থাকলাম। কথা বলার কেউ যখন আর নেই কথা বলার সব প্রয়োজনও আমার ফুরিয়ে গিয়েছিল। মৃতদেহের। স্তূপ দিয়ে তৈরি বাড়িটায় আবার আগের মত নীরবতা নেমে এল। আমি বুকের ভেতর কোথাও অনুশোচনা অনুভব করছিলাম। মেয়েটাকে দেয়া কথাটা না রাখার জন্য। আমি ঠিক করলাম মেয়েটার বাড়িতে যাব। ওর ভাইকে ফিরিয়ে দিয়ে আসব।
বাইরে ছেলেটার লাশ তখনো পড়ে ছিল। সূর্যের আলোর কারনে পঁচে গলতে শুরু করেছে। লাশটা তুলতে গেলে নরম টুকরোগুলো ভেঙে খসে পড়তে লাগল। মেয়েটাকেও আমি ওর বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইছিলাম কারন সে তার বাবা-মাকে মন প্রাণ দিয়ে ভালবাসত।
মেয়েটার কাঁধ ধরে টেনে দেয়াল থেকে বের করে আনলাম। পুরো বাড়িটা থর থর করে কাঁপতে শুরু করল। লাশটা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হতেই আমার সাধের সাদা বাড়ি পুরো ভেঙে পড়ল। প্যাঁচানো দেহগুলোকে একসাথে দেখে আর মানব দেহ বলে চেনা সম্ভব ছিল না। বরং ওগুলোকে দেখতে বড় এক তাল গোবরের মত লাগছিল।
নীরব, নিস্তব্ধ, শীতল বনের ভেতর অসংখ্য গাছের সারির মাঝে পর্বতের মত একতাল মাংসের স্তূপ পড়ে রইল। যেই কাঠের বাক্সটা আমি লাশ পরিবহনের কাজে ব্যবহার করতাম সেটা কাছেই পড়ে ছিল। একসময় সেটায় ফলমূল পরিবহন করা হত। কোন বাক্সে কোন ফল রাখা তা উপরে লেখা ছিল। মেয়েটা আর ওর ভাইয়ের পঁচে যাওয়া, দেহ আমি বাক্সটায় নিয়ে ভরলাম। ছেলেটার গলে যাওয়া দেহ সুন্দর মত মেয়েটার ভাঁজ করা দেহের সাথে ফাঁক ফোঁকরে ঢুকে গেল। ঢাকনাটা লাগিয়ে বাক্সটা নিয়ে ওদের বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।
ওদের বাড়ির দরজার কাছাকাছি পৌঁছুতে খেয়াল করলাম একজন মহিলা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। মহিলার হাতে বড় একটা ব্যাগ। আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল মহিলাটা মেয়েটার মা হবে, বিদেশ থেকে ফিরছে।
আমি সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে মহিলাটার কাছে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। একসময় সে আমার সামনে এসে থামল। তার মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল।
“আহ তুমি! তুমি বেঁচে আছ!” সে এগিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রাখল।
“ইশ্বরকে ধন্যবাদ। তোমার চেহারা আগের মতই রয়েছে, ওই যে ঘোড়ার লাখি খাওয়ার পর যেমন ছিল, ঠিক তেমনই। গত কয়েক বছর আমি যে কতবার তোমার কথা চিন্তা করেছি!”
মেয়েটার বয়স বাড়লেও চুল এখনো আগের মতই লাল রয়েছে। “তুমি এখন থেকে আমার বাড়িতে কাজ করতে পার। আমি বিদেশে গিয়েছিলাম, অনেকদিন পর ফিরছি। এতদিন পর ছেলেমেয়েদের আবার দেখতে পাওয়ার জন্য তর সইছে না।”
লাল চুলো মহিলাটা আমার হাতে ধরা বাক্সটার দিকে তাকাল। ঢাকনাটা খুলে দেখতে চাইলে আমি তাকে বাধা দিলাম।
“বাজে গন্ধটা কিসের? ভেতরের ফলগুলো নির্ঘাত পঁচে গিয়েছে। তুমি কি আমার হয়ে এটা পিছনের সারের স্তূপে নিয়ে ফেলতে পারবে?”
আমি বাক্সটা নিয়ে বাড়ির আস্তাবলের পেছনে গোবরের স্তূপের দিকে গেলাম। সেখানে সার বানানোর জন্য পাহাড় সমান গোবর স্তূপ করে রাখা, ঠিক যেমনটা আমি ছোট থাকতে দেখেছিলাম। ছেলেটা আর মেয়েটার মৃতদেহগুলোকে আমি ওই গোবরের স্তূপের ভেতর ঢুকিয়ে দিলাম। তারপর আস্তাবলে গিয়ে ঢুকলাম। জায়গাটা ঠিক আগের মতই রয়েছে। আস্তাবলের দেয়ালের পাশে হাঁটু ভাঁজ করে গুটিসুটি মেরে শুয়ে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।
ফাইন্ড দ্য ব্লাড!
১
অ্যালার্ম ক্লক যখন বাজল, আমি (চৌষট্টি বছর বয়স) আমার চোখ খুললাম। ঘড়িটাকে চুপ করালাম, তারপর একই হাত দিয়ে ঘুম তাড়ানোর জন্য চোখ ডলতে লাগলাম। ভোর পাঁচটা বাজছি। বিছানার পাশের পর্দাবিহীন জানালা দিয়ে সূর্যের আলো আসছে। জানালাগুলো এত বাজেভাবে ফিট করা ছিল যে লক তো হয়ই না তার উপর যত চাপাচাপি টানাটানি করা হোক না কেন তিন সেন্টিমিটারের বেশি ফাঁক হয় না। রুম থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় ছিল দরজাটা।
