একদম ছোট একটা বাচ্চা। মুখে ভয়ের চিহ্ন। তার পোশাকের রঙ ছিল খুবই গাঢ় নীল রঙের, প্রায় কালোর কাছাকাছি। মেয়েটার ত্বকের রঙ ছিল ফ্যাকাসে সাদা। ঠোঁট ছিল নীলচে, ঠান্ডা বা ক্ষুধা থেকে নয় বরং ভয় থেকে।
“তুমি কি এখানে থাক?” সে আমাকে প্রশ্ন করল, গলা কাঁপছিল। মেয়েটার হাতগুলো ভাঁজ করে বুকের উপর শক্ত করে ধরা, মাথা দুলছিল। “তোমার বাড়ি তো দেখি মানুষ দিয়ে তৈরি!”
সে আমার ছোট বাড়িতে ঢুকে স্তূপ করে রাখা সাদা মৃতদেহগুলো দেখতে লাগল। আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। “তোমার মুখে দেখি একটা গর্ত!”
গর্তটা নিয়ে ওকে আগ্রহী দেখাল, আমার কাছে এগিয়ে এল।
“বেশ বড় একটা গর্ত, পাখি বাসা বানানোর মত যথেষ্ট বড়। গভীর আর অন্ধকার। ঠিকমত দেখতেও পারছি না।” ওকে দেখে মনে হল সে আমার চেহারা নিয়ে সত্যি সত্যি চিন্তিত।
“তুমিই কি ওদের সবাইকে এখানে নিয়ে এসেছ?” ওকে এতটা চিন্তিত দেখাল যে মনে হচ্ছিল যে কোন সময় অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। “আমার সবসময় মনে হত, লোক আমার ভাইকে তুলে নিয়ে গিয়েছে সে এখানেই কোথাও আছে, এই বনের গভীরে কোথাও। আমাকে আমার ভাই ফিরিয়ে দাও! আমি এতদুর এসেছি শুধু আমার ভাইয়ের জন্য।”
মেয়েটা লাশগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল যে কোন মুহূর্তে কেঁদে ফেলবে। শীতল জঙ্গলে, সূর্যের মলিন আলোতে সাদা লাশগুলো মনে হচ্ছিল জ্বল জ্বল করছিল।
“আমি নিশ্চিত আমার ভাই এখানেই কোথাও আছে। সে খুবই সুদর্শন আর স্মার্ট।”
সদর্শন, স্মার্ট দেখতে একটা ছেলে ভেতরের দেয়ালে আছে। ছেলেটা দাঁড়িয়ে থেকে ওর মাথার উপর অন্য দেহগুলোর ভার ধরে ছিল। আমি মেয়েটাকে লাশটা দেখালাম। সে তার ভাইকে দেখতে পেয়ে নাম ধরে ডাকতে লাগল। ওর কণ্ঠের জোর দেখে চমকে গেলাম আমি। মেয়েটা ওর ভাইয়ের মৃতদেহের কাঁধ ধরে দেয়ালের ভেতর থেকে বের করে আনতে চাইল। আমি ওকে বাধা দিলাম। ছেলেটাকে সরিয়ে নিলে পুরো বাড়িটা ভেঙে পড়বে।
“কিন্তু আমাকে আমার ভাইকে বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।” মেয়েটা কাঁদছিল। আমার বাবা আমার চেয়ে আমার ভাইকে বেশি পছন্দ করেন। সবসময় মেজাজ খারাপ থাকে তার। তিনি সবসময় আমার গায়ে হাত তুলেন। আমার ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে বাবা অনেক মনমরা হয়ে থাকেন। তিনি সবসময় আমার মা আর ভাইয়ের সাথে একসাথে বসে খাবার খেতে পছন্দ করতেন। মা এখন বিদেশে গিয়েছেন কাজে, তিনি ফেরত আসার আগেই আমি আমার ভাইকে বাসায় নিয়ে যেতে চাই। প্লিজ আমার ভাইকে ফিরিয়ে দাও।”
মেয়েটা মরা পাতার উপর হাঁটু গেড়ে বসে আমার কাছে ভিক্ষা চাইতে লাগল। আমি ওর অনুরোধ নাকচ করে দিতে বাধ্য হলাম কারন ওর ভাইকে ছাড়া বাড়ি ভেঙে পড়বে। মেয়েটার চোখ অশ্রুতে ছলছল করছিল। সে আমাকে বলল, “আমি নাহয় ওর জায়গায় দাঁড়াব।”
এই কথার পর আমি ছেলেটার দেহ বের করে আনলাম। মেয়েটা দ্রুত খালি জায়গাটার মধ্যে ঢুকে গেল, যেখানে ওর ভাইয়ের দেহ ছিল এতদিন। সেখানে সে চমৎকারভাবে খালি জায়গাটায় খাপে খাপে লেগে গেল। ও ওর পোশাক পরে ছিল যে কারনে সাদা দেয়ালে একমাত্র রঙটাও ছিল ওর পোশাকের। ছেলেটার দেহ বের করে আনার পরেও লাশটা একইরকম শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
“প্লিজ আমার ভাইকে বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে এসো…”
ওর কথায় কষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছিল। সে আমাকে তার বাড়িতে কিভাবে যেতে হবে তা ব্যাখ্যা করে বলল। তথ্যটা মনে রাখতে আমার কোন কষ্টই হল না।
“তুমি তো দেখি খুব দ্রুত শিখতে পার।” মৃতদেহের ভিড়ের ভেতর থেকে মেয়েটা অবাক হয়ে বলল। আমি ছেলেটার দেহ বাড়ির বাইরে নিয়ে গেলাম আর এমন ভাব করলাম যেন বাসায় ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছি। আসলে আমি লাশটা কিছুদূর নিয়ে ফেলে দিলাম। তারপর সেটার পাশে বসে আমার সাদা বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকলাম। লাশটা ফিরিয়ে দিয়ে আসার কোন ইচ্ছাই আমার ছিল না। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমি চলে গেলে মেয়েটা দেয়াল থেকে বেরিয়ে পালানোর চেষ্টা করবে।
বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম কিন্তু মেয়েটা বের হল না। একটা পুরো দিন পার হয়ে গেল। মেয়েটার বাসায় গিয়ে ফিরে আসতে আমার এরকম সময়ই লাগার কথা। সুতরাং আমি বাড়িতে ফিরে গেলাম আর ভান করলাম যেন ছেলেটাকে বাসায় রেখে এসেছি। মেয়েটা তখনো দেয়ালের ভেতরেই ছিল, এক বিন্দু নড়ছিল না।
“তোমাকে অনেক ধন্যবাদ আমার ভাইকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য। আমি নিশ্চিত যে বাবা এখন খুশি হবে, মাও যখন বিদেশ থেকে ফিরে আসবে সেও খুশি হবে।” খুশিতে কাঁদছিল মেয়েটা। একগাদা সাদা মতদেহের ভেতর মেয়েটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথার উপরের দেহগুলোর ভার রক্ষা করছিল।
এভাবে মেয়েটার সাথে আমার জীবন শুরু হল। সে কথা বলতে পছন্দ করত। ছোট্ট বাড়িটা ওর গলার আওয়াজে পরিপুর্ণ হয়ে থাকত। দেয়ালের অন্য দেহগুলোর চোখগুলো তখনো খোলা থাকত। কিন্তু প্রতিটা দিন পার হত আর দেহগুলোর আকৃতি একটু একটু করে বদলে যাচ্ছিল।
মেয়েটা প্রথম প্রথম একটু ব্ৰস্ত থাকলেও কথা বলতে শুরু করা পর থেকে হাসতে শুরু লাগল। নিস্তব্ধ বনের ভেতর ঠান্ডা, শীতল ছোট ঘরটায় ওর হাসি ছিল সূর্যালোকের মত।
