লোকটার হাতে একটা ইলেকট্রিক ল্যাম্প ছিল। বয়স্ক লোক, কিন্তু আবার অতটা বড়োও ছিল না। লোকটা আমার দিকে এগিয়ে এল। একহাত আমার কার্টের উপর দিয়ে রেখেছে। কার্টের উপরের খড় দেখে বলল, “কিডন্যাপারটা আশেপাশের কয়েকটা গ্রামে হানা দিয়েছে। কেউ জানে না নিখোঁজ লোকগুলোর ভাগ্যে কি ঘটেছে। আমার নাতি-নাতনিদের ধারণা মানুষগুলোকে নাকি কেটেকুটে রান্না করে খেয়ে ফেলেছে সে।”
এমন সময় লোকটার চোখ পড়ল খড়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে থাকা এক মহিলার গোড়ালির উপর। সে অবাক হয়ে হাত বাড়াল সেটা স্পর্শ করার জন্য। মত শরীরের শীতলতা অনুভব করে কেঁপে উঠল। আমি। লোকটার গলা টিপে মেরে ফেলে তাকেও কার্টের উপর উঠিয়ে রাখলাম।
বনের ভেতরটা ছিল একদম নিস্তব্ধ। গাছের পর গাছ, গোড়াগুলো লোহার মত শক্ত। বছরের সবচেয়ে ঠান্ডা সময় ছিল সেটা। পাতাগুলো তাদের নিজস্ব রঙ হারিয়ে ফেলেছিল, বেশির ভাগই ঝরে পড়ে গিয়েছিল। আমি লাশগুলো নিয়ে জায়গামত নামিয়ে রাখলাম যেখানে কিনা একটা দেয়াল তৈরি করব।
একদম সাধারণ ধরনের একটা বাড়ি বানালাম, চার কোনা বাক্স আকৃতির। দেয়ালের জন্য লাশগুলো একটা আরেকটার উপর স্তূপ করে রেখেছিলাম, ভেতরে কোন ফাঁক-ফোঁকর ছিল না। কিছু লাশ ছিল পুরুষদের, আর কিছু নারীদের। কেউ কেউ ছিল গ্রামের অধিবাসী, কেউ কেউ ছিল স্রেফ পথিক। বনে নেয়ার পর আমি তাদের পোশাকগুলো খুলে নিয়েছিলাম। তারা ছিল সবাই নগ্ন আর সবার চামড়ার রঙ ছিল একদম সাদা।
দেয়ালটা ঠিক রাখার জন্য কিছু দেহ দেয়ালের ভেতর শুয়ে ছিল আর কিছু বসে ছিল। তাদের কেউ কেউ হাঁটু ভাঁজ করে জড়িয়ে ছিল, কারো কারো হাত অন্যদের গলা ধরে ছিল। দেয়ালগুলো পাতলা ছিল না। এক মানুষ সমান পুরু হলে দেয়ালগুলো দাঁড়িয়ে থাকতে পারত না, দুর্বল হয়ে পড়ত। যে কারনে কয়েক জনের লাশ দিয়ে পুরু করতে হয়েছে। কিছু জায়গায় অতিরিক্ত ঠেক দিতে কাঠ ব্যবহার করতে হয়েছে। বাড়ির কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। মাল মশলা শেষ হয়ে এলে আমি আরো সংগ্রহ করে আনতে যেতাম। দেয়ালগুলো যথেষ্ট উঁচু ছিল। মাল মশলার রঙ যেহেতু সাদা ছিল, বাড়িটার রঙও তাই সাদা ছিল।
শীতের দিন চলতেই থাকল। আমি অর্ধসমাপ্ত দেয়াল ঘেসে ঘুমাতাম। লোকজনের সাথে থাকা খাবারগুলো খেতাম। দেয়ালগুলোর কাজ শেষ হওয়ার পর ছাদের কাজ ধরলাম। গাছের বড় বড় ডাল এনে দেয়ালের উপর রাখলাম তারপর তার উপর আরো কিছু লাশ শুইয়ে দিলাম। ছাদ তৈরি হয়ে গেল। তুষার এখন আর কোন সমস্যা করবে না।
বাড়ির কাজ শেষ। নিরব এক বনের ভেতর ছোট্ট সাদা একটা বাড়ি। লাশগুলোর ত্বক ছিল শীতল আর চাঁদের আলোয় ভয়ংকর রকমের সাদা দেখাত। মনে হত জ্বলজ্বল করছে। গোড়ার কাছের যে লাশগুলো ছিল সেগুলো উপরের ভারে আস্তে আস্তে করে পাতা পচা নরম মাটিতে দেবে যাচ্ছিল।
ভেতরে এক মানুষ দাঁড়ানোর মত জায়গা ছিল। কাঠামোটা ছিল একদম সাধারণ। একটা ছাদ, চারটা দেয়াল আর ঢোকার জন্য একটা মুখ। কিন্তু ঠান্ডা বাতাস ঠেকানোর জন্য এইটুকুই যথেষ্ট ছিল। মৃতদেহগুলোর সবগুলোর চোখ খোলা ছিল, আমার দিকে তাকিয়ে থাকত তারা। ঠিক আস্তাবলের দেয়ালের পাথরগুলোর মত। দেহগুলো জটিলভাবে একটা আরেকটার সাথে পেঁচিয়ে ছিল। এক মহিলার চুল এত বড় ছিল যে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ঝুলে ছিল, সেই সাথে তার নিচের দেহগুলোর মুখগুলোও সে ঢেকে দিয়েছিল।
আমার জীবন ছিল একদম সাধারণ, চুপচাপ। এই বনে তেমন একটা পাখিও ছিল না, শুধু ছিল আমার এই সাদা বাড়ি। যে বাড়ির সবগুলো চোখ সবসময় আমার দিকে তাকিয়ে থাকত।
দেয়ালের মৃতদেহগুলোর মধ্যে এক লোকের কনুই ভাঁজ করা ছিল। ফলে পাশের লোকের শরীরও বাঁকিয়ে ওই কনুইয়ের সাথে মেলাতে হয়েছে। একটা কম বয়সি ছেলে মাটির উপর সোজা দাঁড়িয়ে মাথার উপর অন্যদের ভার বহন করছিল। সবার হাত-পা এমনভাবে উল্টোপাল্টা পেচিয়ে ছিল যে দেখে মনে হত অনেকগুলো সাপ একসাথে এক জায়গায় কিলবিল করছে। এর মাঝে হাঁটু ভাঁজ করে জড়িয়ে আমি ঘুমাতাম। শীতের ঠান্ডা রাতগুলো শেষ হওয়ার কোন লক্ষণ দেখা গেল না।
প্রায়ই খালার বাসায় থাকার সময়ের কথা আমার মনে পড়ত। যখনই চোখ বুজতাম, সাথে সাথে সেই আস্তাবলে ফিরে যেতাম। লাল চুলো মেয়েটার কথা মনে পড়ত। যে বাড়িতে আমার বাবা-মা এর সাথে থাকতাম সেটার কথাও মনে পড়ত। আমরা তেমন বড়লোক কোন পরিবার ছিলাম না। শীতের সময় বাবা বাইরে গিয়ে ঠান্ডায় জমাট বাধা মাঠে চাষের জন্য মাটি খুঁড়তেন। মা তাকে নিজের হাত লাল না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত সাহায্য করতেন। এক বৃষ্টির দিনে তারা ভয়াবহ এক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যান। একটা ছুটতে থাকা ঘোড়ার গাড়ির সাথে তারা কিভাবে যেন পেঁচিয়ে গিয়েছিলেন। অন্তত আমাকে সেরকমই বলা হয়েছিল
এরপর খালা আমার দায়িত্ব নেন। আমাকে তাদের আস্তাবলে থাকতে দেয়া হয়। মূল বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি ছিল না, কারন আমার শরীর থেকে সবসময় ঘোড়ার গোবরের গন্ধ আসত। আস্তাবলের দেয়ালের নিচের অর্ধেকটা গোলাকার পাথর দিয়ে তৈরি ছিল, যেগুলো দেখে মানুষের মুখের মত মন হত।
সাদা বাড়িতে এভাবে কিছুদিন কাটানোর পর, সেখানে একটা মেয়ে এল।
৩
আমি বাড়িতে বসে চিন্তা করছিলাম এমন সময় বাইরের পড়ে থাকা পাতার উপর কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। কেন জানি মনে হল কেউ নিশ্চয়ই এই গভীর বনে সেফ এই বাড়িটার খোঁজেই এসেছে। ধসর আকাশে একটা মলিন সূর্য বাড়ির প্রবেশ পথে আলো ফেলছিল। একটা ছোট্ট ছায়া সেই আলো ঢেকে ফেলল। কে এসেছে দেখতে আমি মাথা তুললাম। মেয়েটা প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে ছিল।
