মাঝরাতে উঠে হামাগুড়ি দিয়ে ময়লার ঝুড়ির কাছে যেতাম যেখানে রাতের উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলা হত। এক রাতে খালা আমাকে সেখানে দেখে ফেললেন।
“তুই এখনো এখানে পড়ে আছিস?” তিনি বললেন। তারপর কিছু টাকা ছুঁড়ে ফেলে বললেন, “টাকাগুলো নিয়ে চলে যা এখান থেকে।”
***
এরপর আমি শহরে গেলাম। উঁচু উঁচু বিল্ডিং সবখানে। চারিদিকে খালি মানুষ আর মানুষ। কারো সাথে চোখাচোখি হলে, তারা আমার চেহারা দেখে ঘৃণায় মুখ সরিয়ে নিত। কেউ কেউ আড়চোখে তাকাত। কেউ কেউ আবার হা করেও তাকিয়ে থাকত।
খালার দেয়া টাকাগুলো সামনের বুকপকেটে রেখেছিলাম। এক রাতে এক নির্জন গলিতে কিছু লোক আমাকে ধরল। তারা আমার সাথে বাজে কিছু কাজ করল। আমি উপলদ্ধি করলাম শহর থেকে আমাকে দূরে থাকতে হবে। কেউ যায় না কিংবা ভুলে গিয়েছে এমন সব পথ বেছে নিলাম আমি হাঁটার জন্য।
হাঁটতে হাঁটতে এক সময় এক বনে গিয়ে পৌঁছলাম। আমার মনে হল এখানেই আমি আমার জীবন নতুন করে শুরু করতে পারব। আমি সবসময় লোজন থেকে দূরে থেকেছি। যখনই কোন মানুষের সাথে দেখা হয়েছে তখনই কিছু না কিছু বাজে ঘটনা ঘটেছে। আমি জানতাম থাকার জন্য আমাকে একটা বাড়ি বানাতে হবে। আস্তাবলের পাথরের দেয়ালগুলোর কথা আমার খুব মনে পড়ত। সেরকম কোন কিছু আমাকে বানাতে হবে। পুরো বন ঘুরে মুখ, হাত বা পায়ের সাথে মিল আছে এরকম পাথর খুঁজলাম। কোথাও কোন পাথর পাওয়া গেল না। বনে শুধু গাছ ছাড়া আর কিছু ছিল না। যতদুর যাই খালি গাছ আর গাছ, সেই সাথে পাতা পচা নরম মাটি।
পাথর খুঁজতে গিয়ে পর্বতে উঠার রাস্তায় এক যুবকের সামনে পড়ে গেলাম। সে সেখানে হাইকিং করতে এসেছিল। আমার মনে হয়েছিল মানুষ মানেই জঘন্য ব্যাপার, তাই তাকে খুন করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
তারপর সেটাই করলাম। খুন করলাম যুবকটাকে।
ওর চেহারাটা পরিচিত লাগছিল। আস্তাবলের দেয়ালের একটা পাথরের সাথে কোথায় যেন যুবকটার চেহারার মিল ছিল। তারপর লাশটা বনের
গভীরে বয়ে নিয়ে গেলাম। অবশেষে নিজের বাড়ি বানানোর জন্য কিছু একটা পাওয়া গেল।
২
মানুষের দহ দিয়ে আমি আমার বাড়ি বানাতে লাগলাম। লাশের উপর লাশ শুয়ে বাড়ির দেয়াল উঠতে লাগল। মৃতদেহ সংগ্রহের জন্য আমাকে বন থেকে বেরিয়ে লোকালয়ের দিকে যেতে হত।
এক মহিলা, বুকে কাপড়ের একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। আমি রাস্তার পাশের এক ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে বসে ছিলাম। মহিলাটাকে আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে দেখলাম। তারপর ঝোপ থেকে বেরিয়ে পিছু পিছু যেতে লাগলাম। পায়ের শব্দ পেয়ে মহিলাটা পিছনে ফিরে তাকাল। তার চিৎকার ছিল অত্যন্ত জোরালো। বেশিরভাগ মানুষ, আমার বিকৃত চেহারা দেখার পর হয় ভয়ে চিৎকার করে নতুবা রেগে যায়। আমি দু হাত দিয়ে তার গলা চেপে ধরলাম। বুকের কাপড়ের ব্যাগটা খসে পড়ে ভেতর থেকে সবজিগুলো গড়িয়ে গেল। একটা আলু গড়িয়ে আমার পায়ের সাথে এসে লাগল।
মহিলাটার ঘাড়ের হাড় ভাঙা একদম সহজ ছিল। মুহূর্তের মধ্যে যেন তার চিৎকার হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। চোখগুলো কোটর ছেড়ে প্রায় বেরিয়ে পড়েছিল। মরার পরেও লোকজন আমার চেহারার দিকে আতংকিত হয়ে তাকিয়ে থাকে। মৃতদেহটা টেনে ঝোঁপের আড়ালে নিয়ে গেলাম। তারপর সবজিগুলো সব এক জায়গায় জড় করলাম। পরবর্তীতে ওর ঠান্ডা দেহটা আমার বাড়ির মূল খুটি হিসেবে ব্যবহৃত হল। ঠান্ডা, পাতা পচা মাটিতে শুয়ে থেকে দেহটা দেয়ালে স্তূপ করে রাখা মৃতদেহগুলোর ভারসাম্য ধরে রাখত।
মাথায় টুপি পরা একটা লোক একটা হাতে টানা কার্ট নিয়ে ব্রিজ পার হচ্ছিল। কাঠের ছোট ব্রিজ। ছোট নদীটার দুপার আগাছা দিয়ে ভরা ছিল। কাঠের ব্রিজটার ছায়া পড়ছিল নিচের পানিতে। আমি ব্রিজের নিচে লুকিয়ে ছিলাম। কার্টটা আমার মাথার উপর দিয়ে যেতেই লাফিয়ে উঠলাম। সাবধান ছিলাম যেন কোন শব্দ না হয়। লোকটা প্রথমে খেয়ালও করেনি। কিন্তু কার্টটা হঠাৎ ভারি মনে হওয়ায় সে ঘুরে তাকাল। আর আমি হাতে ধরে থাকা পাথরটা দিয়ে তার মাথা দুভাগ করে ফেললাম। লোকটা এমনকি চিৎকার দেয়ার সময়টুকুও পায়নি।
লাশটা কার্টে তুলে নিলাম। কার্টের ভেতরে কাঠের বাক্স রাখা। বাক্সগুলোর উপর ভেতরে রাখা ফলের নাম লেখা। লোকটা সম্ভবত শহরে যাচ্ছিল সেগুলো বিক্রি করতে। আমি পুরো কার্ট ধরে জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে গেলাম। অন্যান্য লাশগুলোর মত লোকটার লাশও দেয়ালের অংশ হয়ে গেল, বাড়ি তৈরির মাল মশলা।
এইসব মাল মশলা আমি বিভিন্ন জায়গা থেকে জোগাড় করতাম। গ্রাম থেকে শহরের যাওয়ার পথে লোকজনকে খুন করে এক জায়গায় নিয়ে জড় করতাম। তারপর কার্টে ভরে খড় দিয়ে ঢেকে রাতের অন্ধকারে জঙ্গলে নিয়ে আসতাম।
এক রাতে আমি কার্ট ঠেলে ফিরছি এমন সময় পেছন থেকে একটা গলার আওয়াজ এল, “থামুন!” একজন পুরুষের গলার আওয়াজ। দ্রুত আমি আমার মুখ লুকিয়ে ফেললাম। কোনভাবেই কাউকে আমার চেহারা দেখানো যাবে না। নয়ত অমঙ্গল কিছু একটা ঘটে যেতে পারে।
“এরকম মাঝরাতে কি মনে করে এখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন অ্যাঁ? জানেন না নাকি? লোকজন বলাবলি করছে এখানে নাকি ইদানিং কিডন্যাপারদের উৎপাত শুরু হয়েছে?”
