লাথি খেয়ে আমার মুখের এক অংশের মাংস খসে গিয়েছিল। আমি মাংসের দলাটা তুলে নিয়ে আস্তাবল থেকে বেরিয়ে মূল বাড়িতে গিয়েছিলাম সাহায্যর জন্য। বাইরে তখনো দিনের আলো ছিল। লনের উপর ছিল সবুজ ঘাসের সমুদ্র। হাঁটার সময় ঝুলে পড়ছিল আমার মুখ।
খালা তার কুকুর আর মুরগিগুলো ঘরের ভেতর রাখেন, সেগুলো উঠোনে ঘোরাঘুরি করছিল। আমি ঘরের দরজায় টোকা দিলাম, কোন শব্দ করলাম না। আমার মুখ থেকে জানি না কী খসে পড়েছিল, কিন্তু সেটা আমি শক্ত করে মুঠোর মধ্যে ধরে রেখেছিলাম।
খালা দরজা খুলে আমাকে দেখে চিৎকার করে পিছিয়ে গেলেন। তিনি কখনো চান না যে আমি তার বাড়ির ধারে কাছে যাই।
“বাসা ভর্তি মেহমান,” তিনি বললেন। “আস্তাবলের ভেতরে থাকবি। মেহমানরা এভাবে তোকে দেখলে ঘেন্নায় মরে যাবে।”
তিনি হাত দিয়ে তাড়িয়ে আমাকে আস্তাবলে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। রাত নামার পর ঘোড়ার পানি খাওয়ার চৌবাচ্চায় বসে ক্ষত পরিস্কার করলাম। কুয়ার পরিস্কার পানি ব্যবহার করা আমার জন্য নিষেধ। ব্যথায় কয়েকবার অজ্ঞান হয়ে পড়লেও একসময় ঘুমাতে পেরেছি।
আমার কাজিনরা এরপর থেকে ভয়ে আস্তাবল এড়িয়ে চলতে লাগল। না খেয়ে মরে যাওয়া থেকে রক্ষা পেতে আমি ঘোড়ার জন্য দেয়া জাব খেতে লাগলাম। আমার খালা রাতের উচ্ছিষ্ট আমার জন্য নিয়ে এসে অবাক হয়ে গেলেন। “একি? তুই এখনো বেঁচে আছিস? তোর শরীর নিশ্চয়ই শক্ত কোন ধাতুতে তৈরি।”
আমি পুরো একটা মাস পার করলাম মুখে যেন কিছুর ছোঁয়া না লাগে। সেই চেষ্টা করে। প্রায় ছয় মাসের মত ব্যথা ছিল। মুখের যে অংশটা খুলে আলাদা গিয়েছিল সেটা আমি জমিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু এক সময় মাংসের টুকরোটায় পঁচন ধরল। রঙ বদলে কালো হয়ে গেল আর দুর্গন্ধ বের হতে লাগল। তারপরেও আমি অনেকদিন টুকরোটাকে আমার সাথে রেখেছিলাম। আস্তাবলের দেয়ালের পাথরগুলোকে আমার কাছে মানুষের মুখ মনে হত। মাঝে মাঝে আমি আমার মুখের টুকরোটা পাথরগুলোর উপর রেখে নানান জিনিস কল্পনা করতাম। একসময় ক্ষত শুকিয়ে গেল, কিন্তু আমার চেহারা স্থায়ীভাবে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল।
***
মাঝে মাঝে খালার লাল চুলো ছোট মেয়েটা আস্তাবলে এলে আমাদের মধ্যে কথা হত। সে আমার খালা আর তার ছেলে দুটোর চেয়ে একদম অন্যরকম। ছিল, কখনো আমাকে আঘাত করেনি। মাঝে মাঝে সে আমার জন্য বই নিয়ে আসত। ওর দয়াল মনোভাবের কারনে আমি পড়তে শিখেছিলাম। পড়া শিখতে আমার বেশি সময় লাগেনি।
“কি মিথ্যুক রে বাবা!” মেয়েটা আমাকে একদিন বলল। “এত সহজে কেউ বই পড়া শিখতে পারে নাকি”
আমি যে মিথ্যা বলছি না তা ওকে দেখানোর জন্য একটা বই খুললাম আর কিছু অংশ পরে শোনালাম। মেয়েটা অবাক হয়ে গেল।
আমি পুরো বই মুখস্ত করে ফেলতাম। আস্তাবলের ভেতর রাতে কোন আলো ছিল না। দিনের বেলা ফাঁক ফোঁকর দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকত। সেই আলোতে আমি সারাদিন বই পড়তাম। মেয়েটা আমাকে বলেছিল বইগুলোর কথা যেন আর কেউ না জানে। অনেক সময় আমি মাত্র একবার দেখেই বইয়ের লেখাগুলো মনে রাখতে পারতাম।
লাল চুলো মেয়েটা আমাকে অংক কষাও শিখিয়েছিল। পাটিগনিত। সেইসাথে বই পড়েও অনেক সূত্র সম্পর্কে জানলাম। অনেক জটিল হিসাব যা মেয়েটা নিজেও পারত না, সেগুলোও আমি নিমিষেই করতে পারতাম।
“তুমি সত্যি অনেক বুদ্ধিমান!” সে বলেছিল।
একবার খালা আস্তাবলে এসে আমাকে বই পড়া অবস্থায় ধরে ফেললেন। বইটা খড়ের নিচে কানোরও সময় পাইনি। খালা এসে বইটা আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিলেন। আমাকে বললেন বই খুবই মূল্যবান জিনিস, সেগুলো কোনভাবেই আমার স্পর্শ করা উচিত না। তারপর একটা ছড়ি দিয়ে আমাকে পেটাতে লাগলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন না কি করে বইটা এখানে এল।
“মা থামো!” লাল চুলো মেয়েটা চিৎকার করে বলল, সে মাত্রই তখন আস্তাবলের ভেতর ঢুকছিল। “এই ছেলেটার মাথা অনেক ভাল! অন্তত আমার দুই ভাইয়ের চেয়ে সে অনেক মেধাবী!”
আমার খালা ব্যাপারটা মেনে নিতে পারলেন না। প্রমাণ দেয়ার জন্য মেয়েটা আমাকে বলল স্মৃতি থেকে বাইবেলের একটা অংশ আবৃত্তি করে শোনাতে। আমি ওর কথামত আবৃত্তি করে শোনালাম।
“হেহ, এতে কোন প্রমাণ হয় নাকি?” অবজ্ঞার সুরে খালা বললেন। কথাটা বলে নড়তে গিয়ে ঘোড়ার গোবরে পা পিছলে ধপাস করে পড়লেন।
***
আস্তে আস্তে আমাদের সবার বয়স বাড়ল। ছেলে দুটো সাধারণত আস্তাবল থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলত। শুধু শিকারে যাওয়ার জন্য ঘোড়ার দরকার পড়লেই তারা আস্তাবলে আসত। লাল চুলো মেয়েটা দূরের কোন একটা বোর্ডিং স্কুলে চলে গিয়েছিল পড়াশুনা করতে। এমনকি আমার খালাও উচ্ছিষ্ট আনা বন্ধ করে দিলেন। খালু আস্তে আস্তে তার জমিগুলো অন্য লোকদের কাছে বিক্রি করে দিতে লাগলেন।
আমি আস্তাবলের এক কোনায় পড়ে থাকতাম। সবাই ভুলেই গিয়েছিল আমার কথা। কারো সাথে আমার দেখা হত না। বছরের পর বছর খড়ের নিচে লুকিয়ে থাকার কারনে লোকজন হয়ত ধরে নিয়েছিল আমি বোধহয় অনেক আগেই কোথাও পালিয়ে গিয়েছি। রাতের বেলা আস্তাবল পরিস্কার করতাম। কেউ আস্তাবলের কাছে এলে কোথাও লুকিয়ে পড়তাম। দেয়ালের পাথরগুলোকে আমার কাছে তখনো মানুষের চেহারার মত লাগত। আমি তাদের হাত আর গোড়ালিও দেখতে পেতাম। দেখতে দেখতে একসময় ঘুমিয়ে পড়তাম।
