আগে যেখানে থেমেছিলাম, সেই গ্যাস স্টেশনটা পার হয়ে যাই। লাইটগুলো নেভানো, সেটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেদিনের মত। একটু পর আমি একটা বিশেষ সাইন দেখতে পাব। সাইনটা দেখার পর আমার দৃঢ়সংকল্প ভেঙে পড়তে শুরু করবে আমি নিশ্চিতভাবে এটা জানি। প্রতি দিন, প্রতিটা রাতে একই ঘটনা ঘটে। “চিড়িয়াখানা। বামে মোড়। ২০০ মিটার সামনে।”
আমি সেটাই দেখার আশা করি। ইংরেজিতে লেখা অক্ষরগুলো আমার চোখের রেটিনা যেন পুড়িয়ে বসে যায়। চিড়িয়াখানা-জু।
ঐ মুহূর্তে ওর সবকিছু আমার মনের ভেতর ফিরে আসতে শুরু করবে। আমরা একসাথে মুভি দেখতে গিয়েছিলাম। একসাথে চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলাম। আমি ওর ছবি তুলেছিলাম। প্রথমবার যখন আমাদের দেখা হয়েছিল। এতিমখানায় আমার বড় হওয়ার গল্প ওকে বলেছিলাম। ও খুব কমই হাসত, প্রথমবার যখন ও আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল। এসব যার মধ্যে ফিরে আসতে শুরু করত। অন্ধকার ফুড়ে সাইনটা বেরিয়ে আসবে আর ও আমার পাশের সিটে বসে থাকবে। বাস্তবে নয়, অবশ্যই। ছবি থেকে ওর মৃতদেহ রহস্যময়ভাবে উঠে বসে আমার দিকে তাকাবে, ওর হাত আস্তে করে আমার চুল স্পর্শ করবে। ঠিক এমনভাবেই ঘটবে সবকিছু।
আমি নিশ্চয়ই বিষণ্ণ। সেটা ভাল কথা নয়। এটা হতে পারে না। আমি ওকে খুন করতে পারি না…আমি এরকমই চিন্তা করব। রাস্তা বেয়ে আরেকটু সামনে গিয়ে রাস্তার মাঝে গাড়ি থামিয়ে আমি বাচ্চার মত কাঁদতে থাকি। আমি আমার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে যাব, প্যাসেঞ্জার সিট থেকে ছবিটা নিয়ে চিঠির বাক্সে ঢুকিয়ে দেব, প্রার্থনা করব কাল যখন সকালে ঘুম থেকে উঠব তখন এই ছবিটা আমাকে সঠিক কাজটা করার জন্য অনুপ্রেরণা দেবে, নয়তো আমি আশা করব ফিল্মটা, এক সেকেন্ডের বারো ভাগের একভাগ লম্বা যেটা, সেটা আমাকে সাফল্যর পথ দেখাবে। ভাঁজ করা পোলারোয়েড ক্যামেরা আর গ্যাস স্টেশনের রিসিটটা গাড়িতে রেখে পরবর্তী সন্ধ্যার জন্য মঞ্চ তৈরি করে রাখব। শো মাস্ট গো অন। শো চলতেই হবে। আর এটাই শেষ কথা।
হ্যাঁ, এটাই ঠিক। শেষ পর্যন্ত আমি তা বুঝতে পারব না। দিনের শেষে আমি কখনোই নিজের কাছে স্বীকার করব না যে আমি ওকে খুন করেছি। কিছুই বদলাবেনা। আমি ঐ চিড়িয়াখানায় খাঁচার মধ্যে পায়চারি করতে থাকা কুৎসিত বানরটার চেয়ে আলাদা কিছু নই। আমি একই জীবন প্রতিদিন বার বার কাটাতে থাকব। কাল আমি চিঠির বাক্সে ছবিটা খুঁজে পাব, আবারও স্তম্ভিত হয়ে যাব। খারাপ তোক ভাল হোক এটাই চলতে থাকবে।
অন্ধকার ভেদ করে গাড়িটা এগিয়ে যেতে লাগল। একই রাস্তা ধরে প্রতি রাতে আমি ডাইভ করে যাই। কত মাস হল আমি এরকম করছি? আমার সামনে আর কত এরকম মাস পড়ে আছে? সাইনটা শিগগিরি চোখে এসে পড়বে, যেই সাইনটা ওর সমস্ত স্মৃতি নিমেষেই ফিরিয়ে আনবে। আমি শক্ত করে স্টিয়ারিং হুইলটা চেপে ধরে মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি।
“আ…আমি…ওকে…আমি ওকে খুন করেছি…”
দ্য হোয়াইট হাউজ ইন দ্যা কোল্ড ফরেস্ট
১
একসময় আমি ঘোড়ার আস্তাবলে থাকতাম। আস্তাবলটায় ঘোড়া ছিল তিনটা। পুরো জায়গাটা তারা সারাক্ষণ হাগামুতা করে ভরিয়ে রাখত।
“তুই না থাকলে, এখানে আরেকটা ঘোড়া ঢোকানো যেত,” বিরক্ত সুরে আমার খালা বলেছিলেন।
আস্তাবলের দেয়ালের নিচের অর্ধেকটা ছিল পাথর দিয়ে তৈরি। আর উপরের অর্ধেক অংশ ছিল কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো। পাথরগুলো চারকোনা করে না কেটে গোলাকার পাথরগুলোকে স্রেফ একটার উপর আরেকটা রেখে চুন বালি দিয়ে জোড়া দিয়ে দেয়া হয়েছিল। আমি যদি আস্তাবলের এক কোনায় গুটিসুটি মেরে না শুতাম তাহলে ঘোড়াগুলো আমাকে ভর্তা করে ফেলত। শোয়ার সময় আমি সবসময় পাথরগুলোর দিকে মুখ করে শুতাম। বিভিন্ন আকারের পাথরগুলোকে দেখতে আমার কাছে মানুষের মুখের মত লাগত। কোন কোনটাকে দেখে আবার মানুষের হাত, পায়ের পাতা, বুক, এমনকি ঘাড়ের মত মনে হত।
ঘোড়ার গোবরের গন্ধ ছিল খুবই তীব্র, কখনো দুর হত না। কিন্তু তারপরেও আস্তাবলই ছিল একমাত্র জায়গা যেখানে আমি থাকতে পারি। আমার বাড়ি। শীতের রাতগুলোতে প্রচুর ঠান্ডা পড়ত। একগাদা খড় জড়ো করে তার নিচে ঘুমানোর চেষ্টা করতাম। কিন্তু তারপরেও কাঁপুনি থামাতে পারতাম না।
***
আমার কাজ ছিল আস্তাবলের গোবর পরিস্কার করা। কাজটা কখনো শেষ হত না। আস্তাবলের পেছন দিকে সার বানানোর জন্য পাহাড় সমান বিশাল গোবরের স্তূপ জমানো হয়েছিল। প্রতিদিন সেই স্তূপের উপর আমি নতুন করে আরও গোবর ফেলতাম। সেই সাথে খালুর নির্দেশ অনুযায়ী সেই গোবর সার আবার মাঠেও নিয়ে যেতাম। খালু যা যা বলতেন তাই আমাকে করতে হত। তিনি কখনো আস্তাবলের ধারে কাছে আসতেন না। দূর থেকে নাক কুঁচকে সব আদেশ করতেন।
খালার ছেলেমেয়ে ছিল তিনজন-দুই ছেলে আর এক মেয়ে। ছেলে দুটো প্রায়ই আস্তাবলে খেলতে আসত। বড়টা ছড়ি দিয়ে আঘাত করত আমাকে। সেটা দেখে ছোটটা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ত। ছড়ির আঘাতে চামড়া ফেটে রক্ত বের হত আমার।
সবচেয়ে বাজে ব্যাপার হয়েছিল যখন ওরা আমাকে ঘোড়ার সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে দিয়েছিল। ঘোড়ার লাথি খেয়ে আমার চেহারা বদলে গিয়েছিল, সেটা আর ঠিক হয়নি। ছেলেগুলো দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। পরে এমন ভাব করেছিল যেন এই ঘটনার কিছুই তারা জানে না।
