আমি এসব কথা চিন্তা করছিলাম। সত্যি হল আমি কিছুই ভুলিনি। সবকিছু মনে আছে। কিন্তু এই প্লটটা যেটায় আমি অভিনয় করছিলাম তার মধ্যে আমি আটকা পড়ে গিয়েছিলাম।
“এতদিন ধরে আমি ঐ ক্রিমিনালকে খুঁজছি যে ওকে খুন করেছিল। কিন্তু আমি নিজেই সেই ক্রিমিনাল…ও আমাকে আজেবাজে কিছু কথা বলেছিল যাতে আমি ক্রোধে ফেটে পড়েছিলাম…” আমি চিৎকার করলাম আর গোঙালাম। আমার কণ্ঠ কেবিনটার মধ্যে প্রতিধ্বনি তুলল, কিন্তু শোনার মত কেউ ছিল না। ফ্ল্যাশলাইটটাই রুমের আলোর একমাত্র উৎস ছিল।
ঠাণ্ডা মেঝেতে হাত রেখে আমি উঠে দাঁড়ালাম। আমার পুরো শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে চাইছিল। আমি গর্তের কোণায় গিয়ে নিচে ওর দিকে তাকালাম। গর্তের গভীরে ও ধুলো বালিতে অর্ধেক ঢাকা পড়েছিল, মানুষের মত কিছু ছিল না।
“পুলিশকে জানাতে হবে…আমাকে জেলে ঢোকাতে হবে…” আমি বিড়বিড় করে মনস্থির করে ফেললাম। এই অংশটাও স্ক্রিপ্টের অংশ, কিন্তু এটা আমি মনের গভীর থেকে বিশ্বাস করেছিলাম। আত্মার গভীর থেকে এটাই আমার চাওয়া ছিল।
“আমার কি তা করার সাহস আছে?”
আমার মুঠিগুলো কাঁপছিল। আমি নিজেকে প্রশ্ন করছিলাম, নিজেই সেগুলোর উত্তর দিচ্ছিলাম।
“আমি কি এর জন্য প্রস্তুত আছি?”
যাই হোক না কেন, আমাকে এটা করতেই হবে। আমি যে একজন মানুষকে খুন করেছি, এই সত্য থেকে পালিয়ে যেতে পারব না। সত্য হল, আমি যাকে ভালবাসতাম, তাকেই খুন করেছি। এর ফলাফল আমাকে মেনে নিতেই হবে।
“এটাই সমস্যা…এটা মেনে নেয়া…কঠিন।”
আমি মাথা নাড়লাম। সাহস হারাতে শুরু করেছিলাম, আরো অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আমি কিভাবে নিজেকে ধরিয়ে দিতে পারি? আমি কিভাবে স্বীকারোক্তি করতে পারি?
“কালকের মধ্যে আমি ভুলে যাব এখন আমার কিরকম লাগছে। আমার মনে হচ্ছে আমি সত্য কি তা ভুলে যাব…আমি এই স্মৃতিটাকে আবার কোথাও বন্দি করে রাখব, আমি আবারও অস্তিত্বহীন ক্রিমিনালের খোঁজে বের হব…আমি…”
দুহাতে নিজের মুখ ঢাকলাম। আমার কাঁধগুলো কাঁপছিল। তখন আমার কিছু একটা মনে পড়ল। কিংবা বলা যায় আমি অভিনয় করলাম যে কিছু একটা মনে পড়েছে।
পোলারয়েড ক্যামেরার কাছে গিয়ে শাটার বাটনে চাপ দিলাম। স্যাঁত করে একটা ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল, ওর দেহটা যেন অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ জেগে উঠল। ছোট একটা শব্দ করে ক্যামেরাটা থেকে একটা ছবি বেরিয়ে এল।
“এই ছবিটার দিকে যখন আমি তাকাব তখন আমার অপরাধের কথা মনে পড়বে। যত চেস্টাই করিনা কেন সত্য থেকে মুখ সরিয়ে রাখার কোন উপায় নেই, সত্যকে অস্বীকার করার কোন ক্ষমতা আমার সামনে থাকবেনা। এই ছবিটা আমাকে দেখাবে আমি কি করেছি…আমি এর মূল্য না দিয়ে কোথাও যেতে পারব না।”
যখন বুঝতে পারলাম আমাকে কি করতে হবে, আমার কণ্ঠ কাঁপতে লাগল। ছবিটা নিয়ে আমি গাড়িতে ফিরে এলাম।
“আমাকে পুলিশের কাছে যেতে হবে…আমি ওদেরকে এই ছবিটা দেখিয়ে বলব যে আমি ওকে খুন করেছি…”
ফ্ল্যাশলাইটটা ট্রাংকে রেখে গাড়ির ভেতর ঢুকলাম। ছবিটা মাত্র ডেভেলপ হতে শুরু করেছিল। আমি ওটা প্যাসেঞ্জার সিটে রেখে গ্যাস পেডেলে চাপ দিলাম।
অন্ধকার ভেদ করে ডাইভ করে গেলাম। এস্কেলারেটরে চাপ বাড়াতে ইঞ্জিন গর্জন করে উঠল। আমার চারপাশে ছিল শুধু নিঃসঙ্গ খালিভূমি। রাস্তার উপরে হেডলাইটের সাদা আলোগুলো মনে হল ভাসছিল। রাস্তার পিচের কালোটাকে আশেপাশে অন্ধকারের চেয়ে বেশি কালো দেখাচ্ছিল।
প্যাসেঞ্জার সিটে আমার পাশে ছবিটা পড়ে ছিল, যেটাতে আমার প্রাক্তন গার্লফ্রেন্ডের ক্ষয়ে যাওয়া দেহ মনে হচ্ছিল জেগে উঠে আমাকে সঙ্গ দিচ্ছিল।
“আমি স্বীকারোক্তি দেব। আমি পুলিশের কাছে যাব। আমি আমার অপরাধ স্বীকার করব। পালিয়ে যাব না। আমি অবশ্যই পালাবোনা। আমিই ওকে খুন করেছি। এটা হতে পারে না। কিন্তু তাই হয়েছে। এটাই সত্যি। আমি এটা স্বীকার করতে চাই না। এরকম কাজ করার মত মানুষ আমি নই। আমি ওকে ভালবাসতাম। কিন্তু আমিই ওকে খুন করেছিলাম…”
আমি বারবার এসব কথা বলছিলাম, নিজেকে ফোকাসে রাখার জন্য।
কিন্তু আমি জানতাম, জানতাম এরপর কি হবে। যদিও আমি স্ক্রিপ্ট অনুসারে চলছি কিন্তু আমি কখনোই পুলিশের কাছে যাব না। এমন না যে আমি যেতে চাই না, আমি যেতে পারি না। সত্যি হল, আমি চাই যেতে আর এসব থেকে মুক্তি পেতে। কিন্তু আমি জানি আমি আমার সিদ্ধান্ত ধরে রাখতে পারব না।
প্রতিটা দিন, প্রতিটা রাত আমি এই প্যাটার্নটার পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছিলাম। শুধু আজকেই নয়। এই একই নাটক আমি বার বার অভিনয় করে যাচ্ছিলাম। প্রতি বিকেলে সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় আমি আমার গাড়ির ভেতর ওর ছবি আবিষ্কার করি। ঐ মুহূর্তে আমার নিজের উপর সন্দেহ গজিয়ে উঠতে শুরু করে। আমি গ্যাস স্টেশনে যাই আর ওখানের লোকটার সাথে কথা বলি যে আমাকে সাহায্য করে। প্রতিদিনই আমি প্রায় একই সময়ে হাজির হই আর একই লাইন আউরে যাই। জঙ্গলের ভেতরের কেবিনটায় যাই, ওর মৃতদেহের দিকে তাকাই, আর মনে পড়ে আমি কি করেছি।
আর তারপর আমি সিদ্ধান্ত নেই পুলিশের কাছে যাওয়ার। এই অংশটাও অভিনয় হলেও আমি মনে থেকে তা করতে চাই।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারি না। আমি যদি অত্যন্ত বিষণ্ণ না হতাম, তাহলে হয়ত জেলে বসে একটা সহজ জীবন কাটাতে পারতাম।
