ছবিটা রাখার জন্য গ্লাভ কম্পারটমেন্টটা খুললাম। ভেতরে গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের কাগজ, ম্যানুয়াল আর সন্দেহজনক একটা বাতিল কাগজ।
“এইটা আবার কি?”
কাগজটা ছিল গ্যাস স্টেশনের একটা রিসিট।
“তারিখটা…ঐ একই দিনের, যেদিন ও হারিয়ে গিয়েছিল! গ্যাস স্টেশনের ঠিকানা লেখা আছে! এ কি রকমের খ্যাপামি? আমি তো ঐদিন বাইরেই বের হইনি। সারাদিন বাসায়ই ছিলাম…হয়তো…”
আমার সন্দেহগুলো একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। অন্তত সেরকমই আমি অভিনয় করছিলাম।
“লোকটা যেই হোক সে নিশ্চয়ই এই গাড়িটা ব্যবহার করে ওকে অপহরণ করেছিল। তাই হবে! ক্রিমিনালটা এভাবেই ওকে বোকা বানিয়েছিল। ও নিশ্চয়ই গাড়িটা দেখে ভেবেছিল আমি চালাচ্ছি, তাই চিন্তা না করে উঠে পড়েছিল!”
আমি ইগ্নিসনের চাবি ঘুরিয়ে গাড়ি চালু করলাম। ঠিক কোথায় যেতে হবে তা এখন আমার জানাঃ রিসিটে যেই গ্যাস স্টেশনের ঠিকানা লেখা আছে, সেখানে।
“গ্যাস স্টেশনের কর্মী হয়ত খেয়াল করেছিল সেদিন কে এই গাড়ি চালাচ্ছিল! বুঝতে পারছি না তাদের মনে থাকবে কিনা।”
নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে আমি গাড়ি চালিয়ে শহরের বাইরের দিকে যেতে লাগলাম। রাস্তার ধার ধরে পুরনো আমলের ফার্ম হাউজ আর খালি জমি। ডুবতে থাকা সূর্যের রঙ ছিল লাল, উইন্ডসিন্ডের ভেতর দিয়ে আমার চোখে এসে আলো পড়ছিল।
অবশেষে গ্যাস স্টেশনে যখন পৌঁছলাম ততক্ষণে অন্ধকার নেমে গিয়েছিল। একটা মাঝবয়সি লোক আমার গাড়ির দিকে এগিয়ে এল। পড়নে মেকানিকের জাম্পসুট, তেল-গ্রিজ লাগা হাতগুলো একটা ন্যাকড়া দিয়ে মুছে পরিস্কার করছে। আমি জানালার কাঁচ নামিয়ে তাকে আমার গার্লফ্রেন্ডের ছবি দেখালাম আর কিছু প্রশ্ন করলাম।
“হ্যালো ভাই, একটু এই ছবিটা দেখবেন প্লিজ?”
উত্তর দেয়ার সময় তাকে খানিকটা বিরক্ত দেখাল।
“ও হ্যাঁ, এই মেয়েটা। অনেকদিন আগে এসেছিল। পশ্চিমের দিকে গিয়েছিল।”
“পশ্চিম? কি ধরনের গাড়িতে ছিল সে?”
“মজা করছেন নাকি? আপনি যে গাড়িটা এখন চালাচ্ছেন সেটাতেই ছিল সে।”
“আমি জানতাম!”
“আর আপনিই ডাইভ করছিলেন। কথা শেষ হয়েছে? স্ক্রিপ্ট খতম? বিশ্বাস করতে পারছি না আপনি এখনো প্রতিদিন এই একই কাজ করেন। ক্লান্ত লাগে না? কত মাস হল এখন আপনি আমার সাথে এই খেলা খেলছেন? অবশ্য যাই হোক, আপনি একজন কাস্টমার, খেলে যেতে চাইলে আমি না করতে পারি না।”
“বাজে কথা বলবেন না। আমি ডাইভ করছিলাম? কি ফালতু কথা বলছেন।”
আমি শকড়, কিংবা সেরকম হওয়ার ভান করলাম।
“আপনি বলতে চাইছেন, ঐ দিন যে গাড়িতে ও ছিল, সেটা আমি চাচ্ছিলাম?”
লোকটা আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আর কোন কথা বলতে চায়না। আমি গ্যাস প্যাডেলে চাপ দিয়ে পশ্চিমের দিকে এগুতে লাগলাম।
“শিট! কোথায় যেতে হবে কোন ধারণা নেই আমার আর!” স্টিয়ারিং হইলের উপর কিল মারতে লাগলাম।
“গ্যাস স্টেশনের ঐ লোকটা বলল আমি ড্রাইভ করছিলাম…কিন্তু সেদিন তো আমি সারাদিন বাসাতেই ছিলাম! কি হচ্ছে এসব?! কোনটা বাস্তব আর কোনটা ফ্যান্টাসি?!”
ঐ মুহূর্তে আমার নিজের উপর সন্দেহ জন্মাচ্ছিল। গ্যাস স্টেশনের মেকানিকের সাথে হওয়া কথাবার্তা আমাকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। আমি নিজেকে সামলানোর জন্য বললাম। সামনে যা আসছে তার জন্য আমাকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
এক পর্যায়ে আশেপাশের এলাকা বদলে গিয়ে রাস্তার দুপাশে ঘন জঙ্গল শুরু হল। গাড়ির হেডলাইটে একটা কম চলাচল হওয়া পার্শ্বপথ দেখা গেল। আমি জোরে ব্রেক কষলাম।
“এই জায়গাটা আমি আগে দেখেছি, বিশেষ করে এই দৃশ্যটা। বোকার মত কথা। এরকম ভাবার কোন কারনই থাকতে পারে না।”
স্টিয়ারিং হুইল ঘুরিয়ে গাড়িটা পাশের রাস্তায় নামালাম। একটা গাড়ি যাওয়ার মত চওড়া একটা পথ। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা ভোলা জায়গা এসে পড়ল। গাড়ির হেডলাইটের আলোতে অন্ধকার ভেদ করে একটা পুরাতন কাঠের কেবিন আমার সামনে দেখা গেল।
“এই জায়গাটা আমি চিনি…আমি…”
গাড়ি থেকে নেমে আশেপাশে তাকালাম। কোন মানুষজন নেই। জঙ্গলের বাতাসটা ঠাণ্ডা আর স্থির হয়ে ছিল। ট্র্যাঙ্ক থেকে আমি একটা পকেট ফ্ল্যাশলাইট বের করে কেবিনটার দিকে এগুলাম। প্রথম যে জিনিসটা আমার চোখে পড়ল সেটা ছিল একটা ট্রাইপড আর একটা ক্যামেরা। ক্যামেরাটা ছিল পোলারয়েড ক্যামেরা।
কেবিনের মেঝেটা ছিল ভোলা মাটির, মাঝখানে একটা গর্ত খোঁড়া ছিল। ক্যামেরার লেন্সটা ঐ কালো গর্তের দিকে মুখ করে রাখা। আমি আরো কাছে গেলাম। গর্তটার ভেতরটা যেন পানির মত অন্ধকার দিয়ে পূর্ণ। আমি ফ্ল্যাশলাইটের আলো গর্তের ভেতর ফেললাম।
তারপর ওটা দেখতে পেলাম।
হাঁটু ভেঙে পড়ে গেলাম আমি। “এখন আমার মনে পড়ছে। কিভাবে আমি…”
আমি আমার অভিনয় চালিয়ে গেলাম। ওয়ান ম্যান শো, এক চরিত্রের নাটক। আমিই অভিনেতা, আমিই দর্শক।
“…আমি ওকে খুন করেছি…”
কান্নায় ভেঙে পড়লাম। অণুগুলো আমার গাল বেয়ে খোলা মাটির উপর গড়িয়ে পড়ল। আমার পাশে থাকা গর্তটার মধ্যে সে শুয়ে ছিল। ওর শরীর পুরোপুরি ক্ষয়ে মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল, পোকামাকড় আকর্ষণ করার মত কিছু আর অবশিষ্ট ছিল না। ও একদম সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল।
“আ…আমি…ওকে। আমি নিশ্চয়ই স্মৃতিটা কোথাও আটকে রেখেছিলাম…”
