আমি বুড়ি মহিলাটার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিলাম। পায়ের সামনে শুয়ে পড়ে ধুলোয় মুখ ঘষেছিলাম। আমি আমার কান্না থামাতে পারছিলাম না। বুড়ি মহিলাটা আর তার পাশে দাঁড়ানো পুলিশ অফিসারটা আমাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু আমি শুধু এদিক ওদিক মাথা ঝাঁকানো ছাড়া আর কিছু করতে পারছিলাম না।
৩
পর্বতমালার এক পরিত্যাক্ত কেবিনে আমার আর আমার গার্লফ্রেন্ডের মধ্যে বিশাল যুদ্ধ হয়েছিল। ও একটু আবেগপ্রবণ মানুষ ছিল। সেজন্যই আমরা সেদিন চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলাম। রাস্তায় সাইনবোর্ড দেখেই সে যাওয়ার জন্য হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেয়। একইভাবে, আমাদের ঝগড়ার দিনে, একটা পাহাড়ি রাস্তায় আমরা একটা পার্শ্ব পথ আবিষ্কার করি। “চল গিয়ে দেখি এই পথটা কোথায় গিয়েছে, সে লাফিয়ে উঠল। আমার মনে হয়েছিল ও হঠাৎ করেই ঐ পথে কি আছে তা দেখতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। ওকে পছন্দ করার অনেক কারনের মধ্যে এই আবেগি ব্যাপারটাও একটা ছিল।
কিছুক্ষণ ডাইভ করার পর কেবিনটা খুঁজে পাই। কেবিন বললে ভুল বলা হবে, দেখে মনে হচ্ছিল একগাদা পুরোনো তক্তার স্তূপ। আমরা গাড়ি থামিয়ে ভেতরে গেলাম। জায়গাটা থেকে ছাতা পড়া গন্ধ আসছিল। আমরা দুজনেই সিলিঙের দিকে তাকালাম। মনে হচ্ছিল যে কোন সময় আমাদের মাথার উপর ধসে পড়বে। পোলারয়েড ক্যামেরা দিয়ে ওর একটা ছবি তুললাম। চিড়িয়াখানাতে যাওয়ার পর থেকে ফটোগ্রাফির প্রতি আমার খানিকটা আগ্রহ জেগেছে।
ক্যামেরা ফ্ল্যাশ জ্বলে ওঠার সময় সে হাস্যকর একটা চেহারা করল। “বেশি জ্বলে গিয়েছে,” ও ছবিটা দেখে মুখ ভোঁতা করে বলল। তারপর ছবিটা দলামচা করে বল পাকিয়ে ফেলল। ব্যাপারটা আমাকে আহত করল। তারপর ও বলল আমার উচিত ওকে ভুলে যাওয়া। মানে কি? আমি জানতে চাইলাম। তারপর ও আঘাত দিয়ে অনেক কথা বলল। ও আমাকে বলল যে ও আমাকে আর ভালবাসে না।
ঐ দিনটাই ছিল সেদিন, যেদিন ও নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল, বাকি দুনিয়া অন্তত তাই জানত। কারনটা স্পষ্ট। ও আর ঐ কেবিন থেকে বের হয়নি।
ঐদিন ও স্বীকার করেছিল যে ও কখনো কাউকে আমাদের ডেট করার কথা বলেনি। আর এখন সবকিছুর পর আমি ওর কথা বিশ্বাস করি। ও যদি ওর পরিবার, ওর বন্ধুদের, ওর সহকর্মীদেরকে আমার কথা বলত, তাহলে পুলিশ অবশ্যই আমাকে খুনের ব্যাপারে সন্দেহ করত। আর তারা জিজ্ঞাসাবাদ করলে আমি স্বীকার করতাম। শুধুমাত্র একটা ফোনই আমি পেয়েছিলাম, সেটা ওর মায়ের থেকে। তিনি জানতে চাইছিলেন আমি তার মেয়েকে চিনি কিনা! ফোনে কথা বলার সময় আমার মনে হয়েছিল মহিলা সম্ভবত তার মেয়েকে খুব একটা ভালবাসেন না। ওর নিখোঁজ হওয়ার পরও তিনি তেমন একটা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ ছিলেন না।
আমি ওর মায়ের কাছে প্রায় স্বীকার করেই ফেলছিলাম, কিন্তু আমার মুখ থেকে অন্যরকম কথা বেরিয়ে এল। “কি? নিখোঁজ বলতে চাইছেন? পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেছেন? দাঁড়ান আমি এক্ষুনি আসছি।” তারপর থেকে আমার সেই অর্থহীন দীর্ঘ অভিনয়ের শুরু।
আমি ওর বাসায় গেলাম। পুলিশের জন্য একটা ফর্ম পূরণ করলাম। উদ্বিগ্ন একজন বন্ধুর মত ভান করলাম। নিজের একটা মিথ্যা সত্ত্বা তৈরি করলাম যে ওকে খুঁজে বের করার জন্য মরিয়া, ও খুন হয়ে থাকতে পারে এরকম চিন্তায় যে কিনা পাগল প্রায়।
একদিন আমি আমার প্রাক্তন গার্লফ্রেন্ডের ছবি হাতে শহরের মধ্যে এদিক ওদিক ঘুরে পারকিং লটে আমার গাড়ির কাছে ফিরে এলাম। দিন তখন প্রায় শেষ, সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। আমি আমার চারপাশ ঘিরে থাকা বিল্ডিংগুলোর দিকে মুখ তুলে চাইলাম। ওগুলো সামনে খোলা জায়গাটার উপর গাঢ় ছায়া ফেলতে শুরু করেছিল।
“আরেকটা দিনের শেষ অথচ কোন অগ্রগতি নেই,” আমি বিড়বিড় করে নিজেকে বললাম। আমার মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটা মিথ্যা নিশ্বাস শীতের ঠাণ্ডা বাতাসে সাদা ধোঁয়ার সষ্টি করছিল। আমার ভেঁড়া কোটের পকেট থেকে ওর ছবি বের করে তাকিয়ে থাকলাম। আমার আঙুলের মাথায় একটু কেটে গিয়েছিল, আর ঠান্ডায় আমার চামড়াও শুষ্ক হয়ে গিয়েছিল, তারপরও ছবিতে ওর চেহারার উপর হালকাভাবে আঙুল বোলালাম।
পুরো পারকিং লটে শুধু আমার গাড়িটাই ছিল। কংক্রিটের তলের উপর আমার ছায়া বিস্তৃত হয়ে ছিল।
“কালকে আমি লোকটাকে ঠিকই খুঁজে বের করব…”
সারাদিন হাঁটাহাঁটির জন্য আমার পুরো শরীর ছেড়ে দিয়েছিল। মনে হচ্ছিল যে কোন সময় পড়ে যাব। গাড়ির দরজা খুলে হুইলের পেছনে গিয়ে বসলাম। ঐ সময় নজরে পড়ল যে প্যাসেঞ্জার সিটের নিচে কিছু একটা পড়ে আছে।
“কি এইটা?”,
একটা কাগজের দলা পড়ে ছিল। আমি তুলে দেখি একটা ছবি। হাত দিয়ে ঘষে সমান করলাম।
“কি…!?” ওর ছবি। ওকে একটু গোমড়া দেখাচ্ছিল কিন্তু তাও কিউট। ওর পেছনে কাঠের দেয়াল দেখা যাচ্ছিল। আর ডান দিকের কোণায় একটা তারিখ।
“একি! এই দিনেই তো ও নিখোঁজ হয়েছিল!” আমি যতটা সম্ভবত অবাক হওয়ার ভান করলাম। এইটাই ঐ ছবিটা যেটা দেখে ও ঐদিনে রেগে গিয়েছিল আর দলামচা করে বল বানিয়ে ফেলেছিল।
“এই ছবি আমার গাড়িতে কি করছে? অদ্ভুত তো৷ কিছুই তো বুঝতে পারছি না। ক্রিমিনালটা নিশ্চয়ই এখানে এসে রেখে গিয়েছে। আর কিছু তো মাথায় আসছে না…”
