আরেকবার লাশ পঁচতে থাকার ভিডিওটা চালিয়ে দেখলাম। ভিডিওর শেষে ও পুরোপুরি পঁচে গলে গিয়েছে, এমন কিছুতে পরিণত হয়েছে যা আর পোকামাকড়ের চর্বিত কিছু নেই, না রয়েছে মানুষের সদৃশ কিছু, এমন কিছু যার বর্ণনা দেয়া সম্ভব নয়।
সত্যি বলতে কি দৃশ্যটা দেখে আমার বমি এসে যায়। কাউকে পঁচতে দেখার কোন ইচ্ছে আমার নেই, এমন কাউকে তো নয়ই যাকে কিনা আমি এক সময় ভালবাসতাম। কিন্তু আমাকে দেখতেই হত। শুধু দেখার মাধ্যমেই আমি নিজেকে বোঝাতে পারতাম যে আমিই ওকে খুন করেছিলাম। আমি আমার কাছে অনুনয় করলাম যেন পুলিশ স্টেশনে গিয়ে সবকিছু খুলে বলি। কিন্তু আমার আবেদন আমার বধির কানের সামনে হেরে গেল।
“তুমি শুধু শুধু বসে থাকতে পার না! যাও গিয়ে নতুন তথ্য উদ্ধার কর! গতর খাটাও! তদন্ত করা।”
আমি উঠে দাঁড়িয়ে চোখ থেকে অশ্ন মুছে কম্পিউটার স্ক্রিন আর ওর পঁচে যাওয়ার দৃশ্য থেকে সরে এলাম। ওর একটা ছবি হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। শহর জুড়ে ঘুরে বেড়ালাম যেন ক্রিমিনালকে খুঁজছি।
যে ছবিটা আমি সাথে নিয়ে বের হয়েছিলাম সেটা ওর পঁচতে থাকা লাশের ছবি ছিল না। ও যখন জীবিত আর সুন্দর ছিল তখনকার ছবি ছিল। ছবিতে ওর পেছনে আপনি চিড়িয়াখানায় বেড়া দিয়ে ঘেরা জায়গার মধ্যে থাকা জেব্রা দেখতে পাবেন। কি মনে করে ও ঐ ডিস্পোজাল ক্যামেরাগুলোর একটা সাথে করে নিয়ে এসেছিল। শেষ কয়েক ছবির সময় আমি ক্যামেরা ওর উপর তাক করেছিলাম। সেখান থেকে আমি ওর এই ছবিটা নিয়েছি। ছবিতে ও খানিকটা চোখ রাঙ্গিয়ে তাকিয়ে ছিল।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমি অনেক লোকজনকে ছবিটা দেখালাম, জানতে চাইলাম কেউ ওর সম্পর্কে কোন কিছু জানে কিনা। লোকজন মনে হয় আমাকে পাগল ভাবছিল। নয়ত অন্তত কোন ধরনের অভদ্র ব্যক্তি।
আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলাম কিন্তু কোন উপায় ছিল না। আমাকে কাজটা করতেই হবে। আমি হাত পা খুঁটিয়ে কিছু না করে বসে থাকতে পারি না।
আমার কোন কাজ ছিল না, কাজ করার ইচ্ছা ছিল না, যা সেভিংস ছিল সব শেষ হয়ে যাচ্ছিল। খুব শিগগিরি আমাকে আমার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হবে। সমস্যা নেই, আমি আমার গাড়িতে ঘুমাতে পারব। খাওয়ার কিছু না থাকলে কারো কাছ থেকে টাকা-পয়সা চুরি করে নেব। আমার হাত নোংরা করতে কোন আপত্তি ছিল না। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি খুনিটাকে খুঁজে পাচ্ছি, অথবা তাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য চেষ্টার অভিনয় করছি।
সারাটা সকাল আমি শহরের মধ্যে ঘুরে বেড়াই আর লোকজনকে প্রশ্ন করতে থাকি।
“আপনি কি এই মেয়েটাকে চেনেন? একে দেখেছেন কোথাও? প্লিজ…প্লিজ।”
একবার একটা স্থানীয় দোকানের মালিক আমার নামে পুলিশের কাছে অভিযোগ করল। ঐ অভিজ্ঞতার পর আমি শিখলাম এক এলাকায় খুব বেশি সময় না কাটানোর। একাধিকবার লোকাল গ্যাংগুলোর দৃষ্টিতে পড়েছিলাম। তীব্র পরিস্থিতির সৃষ্টিও হয়েছে কয়েকবার। আমি বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছি কিন্তু একজন এক পেছনের গলিতে আমার উপর চাকু ধরেছিল। আমি চাইছিলাম সে আমাকে মেরে ফেলুক, হৃদপিণ্ড বরাবর একটা কোপ। শেষ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। সবকিছু শেষ হয়ে যেত। ওকে খুন করেছি স্বীকার
করেই আমি মরতে পারতাম। আমার জীবনের অন্ত হত একজন শিকার হিসেবে, কোন খুনি হিসেবে নয়। তাতে অন্তত আমার সম্মান কিছুটা হলেও রক্ষা হত। আমার পাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র পথ ছিল। ওর ছবি নিয়ে আমাকে আর ঘুরতে হত না, শহরে ঘুর ঘুর অস্তিত্বহীন তথ্য খুঁজতে হত না, অস্তিত্বহীন কোন ক্রিমিনালকে আর খুঁজতে হত না।
কিন্তু অল্প বয়সি ছেলেটা আমাকে আঘাত করেনি। আমি ওর চাকু ধরা হাত খপ করে ধরে আমার বুকে এনে ঠেকিয়েছিলাম। ছেলেটা শুধু একটু চাপ, অল্প একটু চাপ দিলেই কাজটা হয়ে যেতে পারত। কিন্তু তা না করে সে কাঁপতে থাকল আর ক্ষমা চাইল। ওর গ্যাঙের বাকি সদস্যদের চেহারাও ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল। এমন সময় পুলিশ এল আর তারা সবাই দৌড়ে পালিয়ে গেল। আমি চিৎকার করে পেছন থেকে ডাকলাম, “আমার জন্য দাঁড়াও! আমাকে সাথে নিয়ে যাও!”
কোন এক নোংরা বুড়ি পুলিশদের ডেকেছিল। রাস্তায় যখন ওরা আমাকে ঘিরে ফেলেছিল তখন মহিলা দূর থেকে সেটা দেখেছিল। ছোট একটা ইতর চেহারার বুড়ি, পুলিশের পেছনে লুকিয়ে ছিল। আর তার পোশাক আর পায়ে যে জিনিস পরে ছিল তা দেখে কেউ তাকে আধুনিক জাপানিজ বলে ভাববেও না। আমি বাজি ধরে বলতে পারি মহিলা ছিল গরিব, টাকা পয়সা ছিল না। হয়ত পেশাব-পায়খানায় ভরা কোন টানেলের মধ্যে ঘুমায়। তার মুখের ভাঁজগুলো ঝুলকালি মাখা ছিল। চুলগুলো ছিল নোংরা। গলার কাছে যে জিনিসটা ঝুলছিল সেটা দেখে কাঠের বোর্ড মনে হচ্ছিল। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম সেটা হয়ত কোন পাচিনকো পার্লারের বিজ্ঞাপন, কিন্তু আমার ভুল হয়েছিল।
ওটা ছিল ভেজা কোন কাঠের তক্তা, সম্ভবত কোন ময়লার ডিব্বা বা সেরকম কোথাও থেকে তুলে আনা। তক্তাটায় বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল, “আপনি কি এই লোককে দেখেছেন?” লেখাগুলোর নিচে একটা অল্প বয়সি ছেলের ছবি দেয়া। আমার হাতে ধরা আমার গার্লফ্রেন্ডের ছবির তুলনায় ঐ ছবিটা অবিশ্বাস্য রকমের পুরাতন। মহিলা আমাকে বলল প্রায় বিশ বছর আগে তার একমাত্র ছেলে নিখোঁজ হয়ে যায় আর এখনো সে রাস্তার কোণায় দাঁড়িয়ে তাকে খোঁজে। পুরাতন ছবিটায় হাত বুলিয়ে সে দুর্বোধ্য কোন আঞ্চলিক উচ্চারে কিছু একটা বিড়বিড় করতে থাকে। ছবিটাই একমাত্র বাস্তব বস্তু যা ছেলের স্মৃতি হিসেবে তার কাছে আছে। মহিলা তার মানসিক অবস্থার শেষ সীমায় প্রায় পৌঁছে গিয়েছিল।
