ওকে আমি আমার মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসতাম। আমি চিন্তাও করতে চাইনি যে আমার নিজের দুই হাত দিয়ে আমি ওকে খুন করেছি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে এরকম জঘন্য চিন্তাভাবনাকে কোনভাবেই মনের মধ্যে স্থান পেতে দেব না।
দুনিয়ার কোথাও এক খুনি আছে যে কিনা আমি নই, আর আমি যদি আমার গার্লফ্রেন্ডকে খুন করা ঐ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে পারি তাহলে কিছুটা ভাল বোধ করব। নিজের পাপ বোধ থেকে হয়ত মুক্তি পেতে পারব।
“কে এই ছবিগুলো চিঠির বাক্সে ফেলে যাচ্ছে?”
“কেন সে আমাকে এই ছবিগুলো দেখাচ্ছে?”
“আমাকে খালি বল…কে সে? কে ওকে খুন করেছে?!”
পুরোটা একজন মানুষের স্কিট। আমি ভান করছিলাম কিছু জানি না, খুনিকে হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে ঘৃণা করছিলাম, আর নিজের অংশটুকু তীব্র ক্ষিপ্ততার মধ্যে অভিনয় করে যাচ্ছিলাম।
পুলিশকে ছবিগুলো না দেখাতে পারাটা ছিল নিজেকে রক্ষা করার একটা অংশ মাত্র। মনের ভেতর আমি আমাকে বুঝ দিয়েছিলাম যে আমি আমার গার্লফ্রেন্ডের খুনিকে খুঁজে বের করার জন্য পুলিশের সাথে কাজ করে যাচ্ছি। সেজন্য ছবিগুলো আমার কাছে রাখা প্রয়োজন ছিল। পুলিশ, বলা বাহুল্য এসবের কিছুই জানত না। তারা তখনও ওকে একজন নিখোঁজ ব্যক্তি হিসেবেই দেখছিল। আমি আমার কাছে নিজের এমন একটা চিত্র দাঁড় করিয়েছিলাম যে আমি এমন একজন মানুষ যে কিনা তার প্রেমিকার খুনের প্রতিশোধ নিতে চায়, পুলিশের কোন সাহায্য ছাড়াই।
এই ছোট্ট স্ক্রিপ্টটা ধরে আমি অভিনয় করে যেতে যেতে একসময় খেয়াল করলাম আমি ভাবছি আমি ঐ মানুষটা নই যে কিনা তার গার্লফ্রেন্ডকে খুন করেছে। অন্য কেউ করেছে সেটা। আমি নিষ্পাপ, তাই নয় কি?
দুর্ভাগ্যজনকবশত, ছবিগুলো আমার চিঠির বাক্সে আসতেই থাকল, আর আমাকে এই বিভ্রমের দুনিয়া থেকে পুরোপুরি পালাতে বাধা দিচ্ছিল।
অবশ্যই আমি সেই ব্যক্তি যে ওকে খুন করেছিল। ছবিগুলো আমাকে ক্রমাগত সেই কথাই বলছিল।
ওর নিখোঁজ হওয়ার মাস খানেক পরে, নভেম্বরের প্রথম দিকে পুলিশ তাদের তদন্ত বন্ধ করে দিল। এরপর আমি আমার চাকরি ছেড়ে দিলাম যাতে ফুলটাইম নিজেকে ওর খুনি খোঁজার পেছনে কাজে লাগাতে পারি। অবশ্য আমি কিছুই করছিলাম না একজন নিহত নারীর প্রেমিকের রোল করা ছাড়া। আমি নিজেকে একজন ট্র্যাজিক হিরো হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলাম, যে কিনা প্রেমিকার খুনের জন্য বদলা নিতে চাইছে।
ওর বন্ধু-বান্ধব আর কাছের লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ দিয়ে আমি শুরু . করেছিলাম। ও যাকে যাকে চিনত, প্রত্যেক মানুষের সাথে আমি কথা বলেছিলাম-ওর অফিসের কলিগ, ওর পরিবার, যে কনভিনিয়েন্স স্টোরে ও প্রায়ই যেত সেখানকার ক্লার্ক, কাউকে বাদ রাখিনি।
“হ্যাঁ, ওকে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশ ভাবছে ও বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছে, কিন্তু আমি সেটা বিশ্বাস করতে পারছি না। ও পালিয়ে যাবে, ব্যাপারটা কেমন জানি অবিশ্বাস্য মনে হয়, তাই আমি এরকম ঘুরে ঘুরে লোকজন যারা ওকে চিনত সবাইকে প্রশ্ন করতাম। আপনি কি প্লিজ আমাকে সাহায্য করতে পারবেন? ধন্যবাদ। শেষ কবে ওকে দেখেছেন? ওর কথাবার্তায় অস্বাভাবিক কিছু কি চোখে পড়েছিল? যেমন, ওর সাথে কারো সমস্যা ছিল কিনা, ওর এলাকার মধ্যে কোন সন্দেহজনক ব্যক্তিকে ঘুরাঘুরি করতে দেখেছেন কিনা? ও কি আপনাকে এরকম কিছু বলেছিল? ..ও আমাকে কখনো এরকম কোন কিছু বলেনি…যে আংটিটা ও সবসময় পরে থাকত? হ্যাঁ, ওটা একটা এঙ্গেজমেন্ট রিং ছিল, আমি দিয়েছিলাম ওকে…অ্যাঁই, ওভাবে তাকাচ্ছেন কেন আমার দিকে। আমার আপনার সহানুভূতির কোন…”
একজন মানুষও সন্দেহ করেনি যে ওর খুনি ব্যক্তিটি আমি। তারা ভেবেছিল আমি বিভ্রান্ত হয়ে আছি, বেচারা একজন যুবক যার গার্লফ্রেন্ড হঠাৎ বাক্সপেটরা বেঁধে ভেগে গিয়েছে। আমার অভিনয় খুবই ভাল ছিল বলে আমার ধারণা। কেউ কেউ আবার কেঁদেও ফেলেছিল, ওর জন্য না, আমার জন্য। দুনিয়াটা খুবই পাগলাটে ধরনের। কেউ কেন বুঝতে পারল না যে আমি ওকে খুন করেছি? আমি যেহেতু নিজেকে নিজে স্বীকার করাতে পারছি না, আমি ভাবছিলাম অন্য কেউ আমার হয়ে সেটা বের করে নেবে।
আমি আসলেই তাই চাইছি। অপেক্ষায় আছি। আমি চাই কেউ একজন আমাকে অভিযুক্ত করুক, বলুক, “তুমি! তুমিই আসল ক্রিমিনাল!” এমনকি পুলিশও-এটা কি ওদের কাজের মধ্যে পড়েনা?-ওরা আমার অপরাধ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছে।
কিন্তু এখন…আমি ভাবছিলাম। আমি এই অপরাধবোধ থেকে মুক্ত হতে চাই। আমি সবকিছুর স্বীকার করতে চাই, আমার অপরাধের স্বীকারোক্তি দিতে চাই। নাহলে আমাকে এই অভিনয় আজীবন চালিয়ে যেতে হবে। নিজেকে নিয়ে আইনের হাতে তুলে দেয়ার মত সাহস আমার নেই। পুরো ব্যাপারটা অত্যন্ত ভীতিজনক। এই সমস্যা থেকে নিজেকে সরাতে না পেরে আমাকে আমার ছলচাতুরি চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
এভাবে এক সপ্তাহের মত আমার নিজস্ব তদন্ত চলার পর ইন্টারভিউ নেয়ার মত লোকজন ফুরিয়ে গেল। ঐ পর্যায়ে আমার নিজেকে মনে হচ্ছিল গোলকধাঁধার অন্ধগলিতে আটকা পড়া কোন ইঁদুরের মত।
“এই ক্রিমিনালকে ধরার জন্য আমার সামনে কোন সূত্র নেই! কারো কাছে কি কোন তথ্য আছে?” আমি নিজেকে একা আমার রুমের কম্পিউটারের সামনে বসে বিড়বিড় করা অবস্থায় আবিষ্কার করলাম।
