আমরা মুভি থিয়েটার থেকে বের হওয়ার পর ও আর আমি ঠিক করলাম স্থানীয় চিড়িয়াখানায় যাব। আমি ডাইভ করছিলাম আর ও আমার পাশে বসে রোড সাইনগুলো পড়ছিল। “দেখ,” সে বলল, উত্তেজনার সাথে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে ইঙ্গিত করছিল। “ব্যাপারটা কাকতালীয় না?”
“চিড়িয়াখানা। বামে মোড়। ২০০ মিটার সামনে।”
সাইনে তাই লেখা ছিল। উপরে জাপানিজে, নিচে ইংরেজিতে। আমার স্পষ্ট মনে আছে ইংরেজি অক্ষরে ‘জু লেখাটার কথা।
আমি স্টিয়ারিং হুইল বাম ঘুরিয়ে মেইন রোড থেকে নামিয়ে পারকিং লটে ঢুকলাম। লোজন প্রায় ছিলই না বলা যায়। সময়টা ছিল শীতের মাঝামাঝি। কেউ ঐ সময় চিড়িয়াখানায় যায় না। বরফ পড়ছিল না, কিন্তু আকাশে ঘন মেঘ ছিল, অন্ধকার হয়ে ছিল চারিদিক। সবদিক থেকে জন্তু জানোয়ার আর ভেজা খড়ের গন্ধ ভেসে আসছিল-আমন্ত্রণ জানানোর মত দারুণ কোন গন্ধ না আমার মতে। আমার গার্লফ্রেন্ড আর আমি হাত ধরাধরি করে পাশাপাশি হাঁটছিলাম। আমি বলতে পারি, যতক্ষণ আমরা ওখানে ছিলাম পুরোটা সময় ও কাঁপছিল।
“এখানে কেউ নেই,” সে বলল। “আমি এই ব্যাপারে কিছু একটা শুনেছিলাম। সারা দেশের চিড়িয়াখানা আর এমিউজমেন্ট পার্কগুলো দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে কারন কেউ আর ওগুলোর ব্যাপারে আগ্রহী নয়।”
চিড়িয়াখানার সার্কিটের মত পথগুলো দিয়ে আমরা হেঁটে গিয়েছিলাম আর আমার নিশ্বাস মুখ থেকে সাদা ধোঁয়ার মত বেরিয়ে এসে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছিল। লোহা দিয়ে বানানো খাঁচাগুলোর সামনে দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলাম। প্রাণীগুলো যার যার খাঁচার মধ্যে বসে ছিল, নড়াচড়া করছিল না। একটা বানর অবশ্য, সত্যিকারের কুৎসিত দেখতে একটা বানর, তার খাঁচার মধ্যে অনবরত আগপিছ করছিল। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ওটার কান্ডকারখানা দেখেছিলাম। বানরটা খুবই নোংরা ছিল আর ওর শরীরের বিশাল অংশের নোম খসে গিয়েছিল। খাঁচাটার ভেতর সে একাই ছিল, সরু কংক্রিটের জায়গাটার মধ্যে হাঁটাহাঁটি করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।
একটা গার্লফ্রেন্ড পাওয়া ছিল অনেকদিন পর্যন্ত আমার জীবনের সেরা ঘটনা। হেমন্তে ও উধাও হয়ে যায়, মনে হয় যেন সেই কবেকার কথা।
আমি অসংখ্য মানুষকে আমার সন্দেহের কথা বলেছিলাম, যে ও হয়ত কোন অস্বাভাবিক ঘটনার সাথে জড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু পুলিশ কখনোই আমার কথা গুরুত্ব দেয়নি, তাড়া ওর উধাও হওয়ার ঘটনাটাকে সাধারণ বাড়ি পালানোর কেস হিসেবেই ধরে নিয়েছিল। ওর পরিবারের একইরকম ধারণা ছিল। মনে হচ্ছিল সবাই যেন ধরেই নিয়েছিল যে ও কোন একদিন বাসা থেকে পালিয়ে যাবে। তাই যখন সেটা হল কেউ একদমই অবাক হয়নি।
ইমেজ ফাইলগুলো কম্পিউটারে ঢোকানোর পর আমি মল ছবিগুলো অযত্বের সাথে আমার ড্রয়ারে ফেলে রাখি। এতদিনে ড্রয়ারটায় একশরও বেশি ছবি জমে গিয়েছে।
কম্পিউটারের কার্সর নাড়িয়ে মুভি চালানোর একটা সফটওয়্যারে ক্লিক করলাম। এই সফটওয়্যারটা ভিডিও এডিটও করতে পারে। “ওপেন ইমেজ সিকোয়েন্স” ফাংশনটা থেকে ওর প্রথম ছবিটা সিলেক্ট করলাম। তারপর “সেট ইমেজ সিকোয়েন্স,” সিলেক্ট করে দিলাম। তারপর প্রতি সেকেন্ডে বারো ফেম” সিলেক্ট করলাম।
ছবিগুলো এখন পরপর সাজিয়ে একটা ভিডিও হিসেবে দেখার জন্য তৈরি। প্রতি সেকেন্ডে বারোটা করে ছবি পার হবে। এই সিস্টেমটা প্রথমে ডিজাইন করা হয়েছিল এনিমেশন বানানোর জন্য।
প্লেব্যাক মোডে আমি ওর ক্ষয় হতে থাকা দেখি। পোকামাকড়গুলো ওর সারা মুখে কিলবিল করে ছোটাছুটি করতে থাকে। ওর মাংস ছিঁড়ে খেতে থাকে। মনে হয় যেন পোকামাকড়ের সাগরের ঢেউ।
প্রত্যেক সকালে আমি চিঠির বাক্সের কাছে গিয়ে নতুন করে একটা ছবি পাই, যা পুরো ভিডিওটার দৈর্ঘ্য এক সেকেন্ডের বারো ভাগের এক ভাগ বৃদ্ধি করে। “আমি এই ক্রিমিনালকে খুঁজে বের করব,” বিড়বিড় করে নিজেকে শোনাই।
যে লোক এই ছবিগুলো তুলছিল, সেই ওর খুনের জন্য দায়ী। আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত।
“ওকে এর জন্য মূল্য চুকাতে হবে,” পুলিশ যখন তদন্ত বন্ধ করে দিল তখন আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম।
কিন্তু আমার একটা সমস্যা ছিল। সমস্যাটা নিরেট, আর তা আমাকেই ধ্বংস করে ফেলার জন্য যথেষ্ট ছিল। সেজন্য আমি সমস্যাটা স্বীকার না করে এড়িয়ে চলছিলাম।
“শিট, এই ক্রিমিনাল কোথায় থাকতে পারে?!”
আমার কথাগুলো ছিল স্ক্রিপ্টে লেখা লাইনের মত। অতি নাটুকে। মনে মনে জানতাম ঘটনা আসলে একদম অন্যরকম। কিন্তু আমি এই নাটকের চরিত্র হয়ে থাকিনি, বাস্তবতার রুক্ষতা নেমে এসে আমাকে চিড়ে চ্যাপ্টা করে ফেলত।
অন্য কথায় বললে আমি ভান করছিলাম যে কিছু জানি না। সেটা আমাকে প্রত্যয় দিচ্ছিল যে আমি হয়ত ওর খুনিকে খুঁজে বের করতে পারব। কিন্তু বাস্তবে আমার পক্ষে ওর খুনিকে খুঁজে বের করা সম্ভব নয়।
আমি নিজেই ওকে খুন করেছিলাম।
২
ওকে হারানোর পর থেকে আমি যতটা সম্ভব সাধারণভাবে আমার জীবন কাটানোর চেষ্টা করেছি। ব্যাপারটা কঠিন ছিল। আয়নায় নিজের চেহারার দিকে তাকালে দেখতাম আমার গাল বসে গিয়েছে, চোখগুলো কোটরে ঢুকে গিয়েছে।
আমি জানতাম যে আমি ওকে খুন করেছি। আর এই জানা আর ওর খুনি খুঁজে বের করার যে স্পৃহা, সেটার মধ্যের যে স্ববিরোধ আছে তা সম্পর্কেও অবগত ছিলাম। কিন্তু খোদার কসম কেটে বলছি আমার মধ্যে কোন সিপ্লট পারসোনালিটি বা দ্বৈত সত্ত্বা নেই।
