গদ্যের ক্ষেত্রে এগুলো একসাথে যুক্ত হয়ে থাকে। হৃদয়ের এই বর্ণনাগুলো হয় নিরবিচ্ছিন্ন। আর লাইনের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পেতে থাকে, কাঠামোতেও তত পরিবর্তন যুক্ত হতে থাকে। গদ্যে সংগঠিত ঘটনাগুলোর মধ্যে বিভিন্ন চরিত্রগুলোর ভেতরটা সব একরকম হয় না। কিন্তু এই সমস্ত বাক্যগুলোর মূল ভাব বের করে আনলে তা একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে। সবকিছু একসাথে ধরে রাখার জন্য আমাদের কিছু “পরিবর্তন” যোগ করার প্রয়োজন পড়ে। প্রথম আর শেষ পৃষ্ঠার মধ্যে চরিত্রগুলোর হৃদয় বদলে গিয়ে অন্য কিছু একটায় পরিবর্তিত হতে হবে। এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াটা সোতের মত এসে হাজির হয়, আর সেটাই গল্পটার কাঠামো তৈরি করে। সরল গনিতের মত ব্যাপার। আপনি যদি একটা গদ্য নিয়ে একে ঘোট ঘোট অংশে বিভক্ত করেন, সেটা তখন হাইকু বা পদ্যতে রুপান্তরিত হয়। আপনি যদি একটা গল্পকে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করেন, সেটা তখন ব্যাখ্যায় পরিণত হয়।
ফটোগ্রাফ বা ছবিও কিন্তু বর্ণনামূলক। একটা ক্যামেরা দিয়ে কোন ল্যান্ডস্কেপকে আজীবনের জন্য আটকে ফেলা যায়। একটা ছবি একটা বাচ্চার ক্রন্দনরত মুখটাকে বর্ণনা করতে পারে। ব্যাপারটা হাইকু বা পদ্যতে যা হয় তার কাছাকাছি।
অবশ্যই শব্দ আর ছবির মধ্যে পার্থক্য আছে, কিন্তু দুটোই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে একটা নির্দিষ্ট সময়ে চিরকালের জন্য থামিয়ে দেয়।
সুতরাং ধরা যাক আমরা কয়েক ডজন, কিংবা কয়েকশ ছবি তুললাম। একই ছবি বার বার নয়-আবার একদম অন্য কিছুও নয়। প্রত্যেকটা ছবি আগের ছবিটার ঠিক পরের মুহূর্তের ছবি, একটার পর একটা, এভাবে সারি বদ্ধভাবে। তারপর আমরা যদি ছবিগুলো দ্রুত একটার পর একটা উলটে যাই তাহলে যা ঘটে তাকে বলা হয় “দৃষ্টির বিদ্যমানতা” যা পুরো ব্যাপারটার মধ্যে সময়ের জন্ম দেয়।
একটা ক্রন্দনরত বাচ্চার উদাহরণ দেয়া যাক: কাঁদতে কাঁদতে একসময় বাচ্চাটা হাসতে শুরু করল। স্থির আলাদা আলাদা ছবির বদলে এগুলো একসাথে একটা চলমান অবস্থার সৃষ্টি করে। যে অবস্থার মধ্যে কান্না থেকে হাসি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটা রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার কারনে আমরা ভেতরের পরিবর্তনটা চাক্ষুষ দেখতে পাই। নিশ্চিতভাবে “সময়” হল প্রত্যেকটা মুহূর্তকে একসাথে সংযুক্ত করলে যা পাওয়া যায়, আর এ থেকে আমরা “পরিবর্তন” ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করতে পারি। অন্য কথায় বললে একটা গল্প বলতে পারি। আর সেটাই হল একটা মুভি। অন্তত আমার তাই মনে হয়।
***
আজ সকালে আবারও চিঠির বাক্সে একটা ছবি ছিল। এখন পর্যন্ত কতগুলো হল? এরকম চলছে প্রায় একশ দিন কিংবা তারও বেশি হবে। আমি এখনো এর সাথে মানিয়ে নিতে পারিনি, মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছি না। প্রতিদিন সকাল বেলায় ঠান্ডার মধ্যে আমি বাইরে গিয়ে আমার পুরাতন মরচে পড়া চিঠির বাক্সে একটা করে ছবি খুঁজে পাই। ছবিটা পাওয়ার পর আমার মাথা ঘোরাতে থাকে, হালকা মাথাব্যথা অনুভুত হয়, সেই সাথে বিশ্রী রকমের হতাশাবোধ হয়। ছবিটা শক্ত করে হাতে ধরে আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। প্রত্যেক সকালে এই একই কাহিনী।
ছবিগুলো কোন খামে-টামে আসে না, ডাকেও আসে না। সেফ চিঠির বাক্সের মধ্যে ফেলা থাকে। ছবিগুলো একজন মৃত মানুষের। আমার এক্স গার্লফ্রেন্ডের। দেখে মনে হয় ও কোন গর্তের মধ্যে আছে। ছবিতে ওর বুকের থেকে উপরের অংশ দেখানো থাকে। ওর চেহারায় পঁচন ধরেছে, আগের সেই সৌন্দর্যর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
প্রত্যেক দিনের ছবিতে পঁচন প্রক্রিয়া আগের দিনের ছবির চেয়ে একটু একটু করে এগুতে থাকে। এখন এমন একটা অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যেখানে আমি ওর মুখের উপর পোকা কিলবিল করতে দেখতে পাচ্ছি। পঁচন যত বাড়ে পোকাগুলো চামড়ার অন্য অংশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।
ছবিটা নিয়ে আমি আমার রুমে ফিরে যাই। স্ক্যান করে কম্পিউটারে ঢুকাই। ওর যত ছবি আমি এখন পর্যন্ত পেয়েছি, সবগুলো কম্পিউটারে রাখা আছে। আমি ওগুলো ক্রমানুসারে সাজিয়েছি, আর ওর অস্তিত্ব এখন বিশাল পরিমাণ ছবির তথ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একদম প্রথম ছবিটায় ওকে দেখতে একদম মানুষের মত লাগে। দ্বিতীয় ছবিটায়-যেটা আমি ঠিক পরের দিনে পেয়েছিলাম-সেটায় ওর চেহারার উপর হালকা একটা কালো ছাপ ছিল। তারপর থেকে প্রতিটা দিন গিয়েছে আর ছবির মেয়েটা আস্তে আস্তে জীবিত প্রাণী থেকে চেনার অযোগ্য কিছুর দিকে যেতে থেকেছে।
আমি কাউকে এই ছবিগুলো সম্পর্কে কিছু বলিনি। আমার গার্লফ্রেন্ড যে খুন হয়েছে সেটা খালি আমিই জানি। বাকি পুরো দুনিয়ার কাছে সে শুধু নিখোঁজ মানুষের অমীমাংসিত একটা কেস হয়ে রয়ে গিয়েছে।
স্বীকার করছি, আমি ওকে গভীরভাবে ভালবাসতাম। আমার এখনো মনে আছে যেদিন আমরা একসাথে “জু” মুভিটা দেখতে গিয়েছিলাম। মুভিটা ছিল আর্ট ফিল্ম ধরনের, কি হচ্ছে তা আমাদের দুজনেরই মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছিল।
স্ক্রিনে অসংখ্য সবজি আর প্রাণীর দুরত পঁচে যাওয়ার দৃশ্য দেখাচ্ছিল। আপেল আর চিংড়িগুলো কালো হয়ে বিকৃত হয়ে যাচ্ছিল। ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমণের কারনে ওগুলো থেকে নিশ্চয়ই বাজে গন্ধ ছড়াচ্ছিল। পেছনে ব্যাখ্যাতীত রকমের উৎফুল্ল মাইকেল নাইম্যান সাউন্ডট্র্যাক চলছিল, জীবজন্তুর মৃতদেহগুলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কুঁকড়ে যাচ্ছিল। তীরে যেভাবে বড় ঢেউ আছড়ে পড়ে আবার নেমে যায়, সেভাবে মাংসগুলো খুলে খুলে যাচ্ছিল। পুরো ফিল্মটার মূল উদ্দেশ্য ছিল, অন্তত যা আমার মনে হচ্ছিল, যে পঁচনের প্রক্রিয়াটা দেখানো।
