আমরা রক-পেপার-সিজার খেলোম সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য। টানা ত্রিশ বার করলাম, পনের বার ও জিতল, পনের বার আমি। সম্ভবত আমরা জমজ বলে একইভাবে অনুমানও করি। একত্রিশ তম বার আমি জিতলাম। সুতরাং কাজারি, আমি সেজে আগে যাবে। আমি ওকে অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিঙে ঢুকতে দেখলাম। বিল্ডিঙের সামনের একটা গাছে হেলান দিয়ে ডুবতে থাকা সুর্যের আলোয় ভেসে থাকা শহরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমার হাতে কনভিনিয়েন্স স্টোর থেকে আনা কাজারির ব্যাগটা। হাঁটুর সাথে ঘষা লেগে প্লাস্টিক খচখচ করে উঠল।
একটা ছেলে সাইকেল চালিয়ে গেল, পেছনে লম্বা ছায়া ফেলে। আকাশের মেঘগুলোকেও লাল দেখাচ্ছিল, যেন ভেতর থেকে জ্বলছিল। কেউ একজন “কাজারি!” বলে ডাক দিল। আমি ঘুরে দেখি আমাদের বিল্ডিঙের এক মহিলা। “স্কুল কেমন চলে?” তিনি জানতে চাইলেন। “তুমি ভাল করছ তো?”
“মোটামুটি,” আমি উত্তর দিলাম। এর পরপরই কিছু একটা উপর থেকে নিচে ধপ করে আছড়ে পড়ল, আর মহিলাটা ভয়ে চিৎকার করে উঠল। মাটির উপর, ময়লা পোশাক পরা একটা মেয়ে পড়ে আছে, যে দেখতে একদম আমার মত ছিল।
৫
আমি অ্যাপার্টমেন্টে যাওয়ার পর, মৃত কাজারির হয়ে আমাকে একটা নোট লিখতে হল। মা আমাকে লিখতে বাধ্য করলেন। তিনি বললেন পুলিশ আসার আগে আমার হাতে কমবেশি পাঁচ মিনিটের মত আছে। আমি রাজি হলে তিনি বললেন আমি কত লক্ষ্মী একটা মেয়ে, আর তিনি আমাকে কতখানি ভালবাসেন। এই কথাগুলো আমি এর আগে শুধু গভীর রাতে শুনেছি, আমার স্বপ্নে।
নোটটা হতে হবে আত্মহত্যার আগে ইয়োকোর লিখে যাওয়া চিঠি, যেটা আমার জন্য লেখা সহজ ছিল। আমার শুধু দরকার ছিল আমি যখন মরতে চাইতাম তখন যা ভাবতাম তা লিখে ফেলা।
কেউ ইয়োকোর আত্মহত্যা নিয়ে কোন সন্দেহ করেনি। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর যখন আকাশ অন্ধকার হয়ে গেল, আর সেই অন্ধকারে লোকজন অ্যাপার্টমেন্টের সামনে জড়ো হয়ে ছিল, পুলিশ আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে এসে আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। আমরা তাদের আমাদের গল্প শোনালাম। মা আমার সত্যিকারের পরিচয় ধরতে পারেননি। আমি জানি শিগগিরি তিনি বুঝতে পারবেন এবং তখন আতংকিত হয়ে পড়বেন বা রেগে যাবেন। আমি ঠিক করলাম ব্যাগ-ট্যাগ প্যাক করে সে রাতেই বেরিয়ে পড়ে দূরে কোথাও চলে যাব।
পুলিশের সাথে কথাবার্তা অনেক রাত পর্যন্ত চলল, আমাকে আর মাকে দুজনকেই ভুতের মত দেখাচ্ছিল। আমি সত্যি সত্যি ক্লান্ত ছিলাম। কিন্তু মায়েরটা সম্ভবত অভিনয় ছাড়া কিছু ছিল না। পুলিশ যাওয়ার পর তিনি আমার কাঁধ ডলতে ডলতে আমাকে সান্ত্বনা দিলেন। আমি মারা গেলে আমার মনে হয় না মার মন খারাপটাও হবে। কি দুঃখজনক রকমের একটা মানুষে পরিণত হয়েছি আমি। মনের ভেতরে আমি আসলেই কাজারির জন্য দুঃখিত ছিলাম, যে আর আমাদের সাথে নেই।
মা তার রুমে গেলেন। আমি কাজারির রুমে গেলাম, যেটা অনেক কিউট কিউট জিনিস দিয়ে ভর্তি। আমি শান্তি পাচ্ছিলাম না। আমি মনে হয় কিচেনের ময়লার ঝুড়ির পাশে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম। যখন আমি নিশ্চিত হলাম যে মা রাতের জন্য বিশ্রাম নিয়েছেন, একটা ব্যাগে কিছু জিনিসপত্র ঢুকিয়ে রাখলাম। একটা ঘেঁড়া যাবুতোন যেটা আমি শোয়র জন্য ব্যবহার করতাম, সেটা ব্যাগে ঢোকানোর চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু ঢুকল না। কাজারির কিছু জামা কাপড় বের করে বালিশটা ঢোকার জায়গা করলাম।
অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে মিসেস সুজুকির বাসায় গেলাম আসোকে নিতে। আমার মনে ছিল যে কেউ একজন নির্দোষ কুকুরটাকে এনিম্যাল সেল্টারে দিয়ে আসার কথা বলছিল। আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছিল আসো তখনো ঐ বাসায় আছে কিনা। গিয়ে দেখি আসোকে মূল দরজার সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। বাড়ির ভেতরে মনে হচ্ছিল মিসেস সুজুকির ছেলেমেয়ে আর নাতি নাতনিরা আছে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রস্তুতির জন্য। আসোকে সেজন্য বাড়ির বাইরে বের করে দেয়া হয়েছে। আমারও একই অবস্থা, আমি ভাবলাম।
আমাকে দেখে আসো এত জোরে লেজ নাড়াতে লাগল যে ভয় হচ্ছিল টর্নেডো না শুরু হয়ে যায়। আমি দড়িটা খুলে কুকুরটাকে কিডন্যাপ করলাম।
কুকুরটাকে নিয়ে ট্রেন স্টেশনের দিকে গেলাম। আমি দুঃখিত যে মিসেস সুজুকি আর ইয়োকো এনদো দুজনেরই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া মিস করব। আমার জীবন কিভাবে চলবে সে ব্যাপারে আমার কোন স্পষ্ট ধারণা নেই। আমার কাছে কোন টাকা ছিল না, হয়ত না খেয়ে মরতে হবে। কিন্তু ক্ষুধার্ত থাকার অভ্যাস আমার আছে, আর নিজের লোহার মত শক্ত পেটটার উপরও আমার ভরসা আছে, সুতরাং রেস্টুরেন্টের ফেলে দেয়া যে কোন কিছু, যেমন গাজরের ছিলকা পর্যন্তও খেয়ে বাঁচতে পারব। পকেটে হাত ঢুকিয়ে আলতো করে চাবিটা চেপে ধরলাম। ওটা আমাকে চলার জন্য যে শক্তির প্রয়োজন তা সরবরাহ করছিল। মনে মনে বলে উঠলাম, “হ্যাঁ! আমি মুক্ত!”
জু
১
ছবি আর ভিডিওর মধ্যে পার্থক্যটা হাইকু (জাপানি ঐতিহ্যগত পদ্য) আর গদ্যের মধ্যের পার্থক্যর মত।
শুধু হাইকু নয়, ছোট আর বড় ছন্দের পদ্যও এর মধ্যে পড়ে। সাধারণত এসব পদ্যর আকার গদ্যের চেয়ে অনেক ছোট হয়। পদ্যর এটা একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এসব ছন্দবদ্ধ ঘোট ঘোট লাইনগুলো হঠাৎ করে হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে আর লেপ্টে থাকে। একজন কবি জগতটাকে দেখেন এবং শোনেন, তারপর হৃদয়ের অনুভূতিগুলো দিয়ে তা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। আর তিনি তা ছোট ছোট বাক্যের দ্বারা ব্যাখ্যা করে থাকেন।
