“কাজারি! দাঁড়াও!”
ও থেমে ঘুরে দেখল আমি দৌড়ে আসছি। ওর চোখগুলো গোল হয়ে কোটর থেকে বের হয়ে আসছিল মনে হল।
“কাজারি, আমি চাই তুমি মায়ের রুমে যা করেছ তার সত্যিটা মাকে বলে দাও আর ক্ষমা চাও।”
“তুমি ওটার সম্পর্কে জানো?”
“আমি ওটার সম্পর্কে সবকিছু জানি। তাই তুমি মাকে সত্যিটা বলে। দাও, যে তুমিই কাজটা করেছ।”
“অসম্ভব। আমি চাই না মা আমার উপরে রেগে যাক!” কাজারি জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাচ্ছিল। “তুমি কেন দোষটা তোমার ঘাড়ে নিচ্ছ না? তোমার তো এর অভ্যাস আছে। মা আমার উপর রাগ করলে আমি সহ্য করতে পারব না। এটা লজ্জাজনক। আমার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব না।”
আবারও আমার বুক চেপে আসছিল মনে হল। আমার কাছে যদি একটা ছুরি থাকত তাহলে খুশি মনে নিজের হৃদপিণ্ডে একটা ছিদ্র করে দিতাম। তাহলে শান্তি হত।
“…কিন্তু তুমি, তুমি নিজে পানিটা ফেলেছিলে, তাই না?” আমি অনুনয় করলাম।
“তুমি কি কানে শুনো না? আমি কি মাত্রই বললাম না যে তুমি বলবে কাজটা তুমি করেছ? মা যখন বাসায় ফিরবেন, তুমি গিয়ে তার কাছে ক্ষমা চাইবে, বুঝেছ?”
“কিন্তু আমি…” আমি আমার হাতগুলো পকেটে ঢুকালাম।
“হ্যাঁ?” ও তাড়া দিয়ে বলল।
পকেটে রাখা চাবিটা এত জোরে চেপে ধরেছিলাম যে মনে হচ্ছিল রক্ত বেরিয়ে আসবে।
“আমি…”
হৃদয়ের গভীর থেকে আমি ওকে ভালবাসতাম, কিন্তু সেটা দশ সেকেন্ড আগের কথা। আর আমার বুকের উপর থেকে চাপটা সরে গিয়েছিল। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস আবার নিয়মিত হয়ে এল।
“আচ্ছা ঠিক আছে। ব্যাপারটা ভুলে যাও। কাজারি, আমার কথা শোন…” আমি মনস্থির করে ফেলেছি। “তোমাকে বলতে খারাপ লাগছে, কিন্তু মা ইতিমধ্যে জানেন যে কাজটা তুমিই করেছ। কথাটা সত্যি। তিনি জানেন তুমি আমাকে দোষী দেখানোর জন্য বইগুলো নিয়ে গিয়েছ। তুমি দোকানে যাওয়ার জন্য বের হওয়ার সাথে সাথেই মা বাসায় ফিরেছিলেন। আমি সামনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম আর তার রুম থেকে চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। তারপর দৌড়ে পার্কে চলে আসি। কিন্তু মা এর মধ্যেই বুঝে ফেলেছেন যে তুমি ফুলদানি উলটে পানি ফেলেছ।”
কাজারির মুখ আবারও ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
“তার পক্ষে জানার কোন সুযোগই নেই!”
“কিন্তু তিনি জেনেছেন। আমি সামনের দরজায় দাঁড়িয়ে তার চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। তিনি চিৎকার করে বলছিলেন সিডিগুলো উল্টোপাল্টা হয়ে আছে, তারমানে নিশ্চয়ই তুমি করেছ। সেজন্যই তিনি চিৎকার করছিলেন। আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, দয়া করে যাও আর তিনি যা চান তা কর।”
কাজারি আমার দিকে তাকিয়ে থাকল, বিহ্বল।
“মা সবকিছু জানে তারমানে?”
আমি মাথা ঝাঁকালাম।
“তিনি যদি রেগে যান আর তোমাকে যেভাবে মারেন সেভাবে যদি আমাকে মারেন তাহলে সেটা আমি সহ্য করতে পারব না!”
আমি ভান করলাম যে আমিও বিহ্বল, তারপর ব্যাপারটাকে সামনে নিয়ে গেলাম।
“ঠিক আছে। আমি জানি কি করতে হবে। আমি তোমার জায়গায় গিয়ে তার কাছে মাফ চাইব।”
“তুমি তাকে কি বলবে?”
“শুধ আজ রাতের জন্য, চল পোশাক অদলবদল করি। আমি ভান করব যে আমিই তুমি। আমি তোমার পোশাক পরব, তুমি আমারগুলো পরবে। কাল সকাল পর্যন্ত আমি অভিনয় চালিয়ে যাব, আর তুমি আমি সেজে চুপচাপ থাকবে।”
“তোমার ধারণা তিনি তা বুঝতে পারবেন না?”
“সেটা চিন্তা কোর না। আমরা দেখতে হুবহু একই রকমের। কিন্তু তোমার মনে রাখতে হবে যে আমার মত খানিকটা দুঃখী দুঃখী অভিনয় করতে হবে। সেটা ঠিক মত করলে কোন সমস্যা হবে না। তিনি আমার উপর চিৎকার করবেন আর আঘাত যা করার আমাকে করবেন। তোমাকে সেটা নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা করতে হবে না।”
পার্কের রেস্টরুমে আমরা পোশাক বদলালাম। আমি কাজারির পোশাকগুলো পরে চুল ঠিক করে নিলাম। কাজারি আমার নোংরা পোশাক পরে মুখ কুঁচকে ফেলল।
“তোমার পোশাক থেকে অদ্ভুত গন্ধ আসছে!”
কাজারির পোশাকগুলো ছিল পরিস্কার আর সুন্দর। আমি ওর মোজাগুলো পড়লাম। ওর ঘড়ি পড়লাম। জানি না কতখানি ভাল করতে পেরেছি কিন্তু রেস্টরুমের আয়নায় তাকিয়ে হেসে ফেললাম। আমাকে কম বেশি কাজারির মতই লাগছে। নিজেকে হাসতে দেখে আমার মিসেস সুজুকির কথা মনে পড়ল। হাত দিয়ে মুখে স্পর্শ করলাম। চোখ দিয়ে পানির মত কিছু বেরিয়ে আসছিল। কাজারির থেকে আমার অশ্রু লুকানোর জন্য বেসিনের পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেললাম।
“কি করছ তুমি?” কাজারি বাইরে অপেক্ষা করছিল। রেস্টরুমের দরজায় এসে দাঁড়াল, ওকে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ দেখাচ্ছিল। আমরা পার্ক থেকে বেরিয়ে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের দিকে গেলাম। গোধূলির সময়, পুরো বাড়িটা আমাদের সামনে লাল আলোতে স্নান করছিল। উপরে তাকিয়ে আমি দশ তলায় আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের জানালার দিকে তাকালাম। একটু আগে কাজারিকে আমি মিথ্যে বলেছিলাম যে মা বাসায় চলে এসেছেন। ও আমাকে সন্দেহ করেনি।
যদিও আমার নিশ্চিত হওয়ার কোন উপায় নেই, কিন্তু আমার বিশ্বাস মা এতক্ষণে অবশ্যই বাসায় চলে এসেছেন। এসব ব্যাপার মা বেশ মেনে চলেন। তিনি যদি বলেন ছয়টার মধ্যে বাসায় ফিরবেন, তাহলে তাই করবেন।
“কাজারি, বাসায় গিয়ে তুমি ভান করবে যেন তুমি আমি।”
কাজারিকে দেখে মনে হচ্ছিল না পরিকল্পনাটা নিয়ে সে খুশি। মিনমিন করে বলল, “আমি জানি। তো কে আগে ঢুকবে? সেই সেকেন্ড গ্রেডের পর থেকে আমরা কখনো একসাথে বাসায় ফিরিনি। ব্যাপারটাকে ভাল দেখাবে না।”
