বিছানার নিচ থেকে আমি আয়নায় দেখতে পেলাম ওর হাত ফুলদানির সাথে গিয়ে লাগছে। মুহূর্তেই আমার মুখ থেকে, “আহ!” বেরিয়ে এল। ফুলদানিটা উলটে গিয়ে সব পানি গড়িয়ে মায়ের ল্যাপটপের উপর পড়ল। কাজারি মনে হয় না আমার গলা শুনতে পেয়েছে কারন ও নিজেও একই সময়ে “আহ!” করে উঠেছিল। দ্রুত ও ফুলদানি সোজা করে ফেললেও যা ক্ষতি হওয়ার ততক্ষণে হয়ে গিয়েছে। ভেঁজা চুপচুপে ল্যাপটপটার দিকে তাকিয়ে ওর মুখ যে ভুতের মত সাদা হয়ে গিয়েছে তা আমি আয়নাতে পরিস্কার দেখতে পাচ্ছিলাম।
ও পাগলের মত রুমের মধ্যে এদিক ওদিক তাকাল তারপর আবার ওর মুখে হাসি ফিরে এল। ও রুমের মধ্যে এমন একটা জায়গায় গেল যেটা আমি আয়নায় দেখতে পারছিলাম না কিন্তু বিছানার নিচ থেকে ওর গোড়ালি আর মোজা চোখে পড়ছিল। ওর পাগুলো রুমের মধ্যে ঘুরে বেড়াল, কোণায় ফেলে রাখা তিনটা বইয়ের সামনে গিয়ে থামল। মিসেস সজকির বাড়ি থেকে যেই বইগুলো এনেছিলাম, মা যেগুলো আমার থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন। কাজারির হাতগুলো ওগুলো তুলে নিল।
তারপর ও গিয়ে ডেস্ক থেকে সিডিগুলো তুলে আমার বুককেসে ঢুকিয়ে রাখল। দেখে মনে হচ্ছিল ওগুলো নেয়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়েছে। বরং মিসেস সুজুকির বইগুলো হাতে নিয়ে নিজের রুমে চলে গেলে। ওর রুমে কিছুক্ষণ থাকার পর আমি ওর পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম, লিভিং রুমে গেল। কয়েক মিনিট পর আবার ওর রুমে ফিরে গেল। এরপর আর আমি কোন পায়ের শব্দ পেলাম না।
আমার বুঝতে বেশি সময় লাগেনি কেন কাজারি বইগুলো নিয়েছিল। মা যখন ফিরে এসে দেখবে তার কম্পিউটার পানিতে ভেঁজা, তখন নিশ্চয়ই চিন্তা করবে আমি কিংবা কাজারির কেউ একজন কাজটা করেছে। কিন্তু যদি তার রুম থেকে বইগুলো উধাও হয়ে যায় তাহলে মা ধরে নেবে যে আমি তার রুমে বইগুলো আনতে গিয়েছিলাম, আর আমিই ফুলদানিটা ফেলে দিয়েছি।
আমি যতখানি দেখেছি মা তারচেয়েও কতখানি রেগে যেতে পারে তা আমি কল্পনা করতে পারছিলাম। এরকম ভয়াবহ কিছু আগে কখনো ঘটেনি। আমার মনে কোন সন্দেহ নেই যে এর মুল্য আমাকে আমার জীবন দিয়ে চুকাতে হবে। গতরাতে দেখা মায়ের চেহারাটা মনে পড়ল। তিনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, হাতগুলো ঈষৎ পেছনের দিকে বাঁকিয়ে কোমরের উপর রাখা। মন্দিরের গেটে থাকা নিও (বুদ্ধর রক্ষী)-এর মূর্তির মত নিচের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার অভিব্যক্তি ছিল কঠোর এবং ক্ষমাহীন।
খুব সাবধানে আমি বিছানার ফাঁক থেকে বের হয়ে এমনভাবে রুম থেকে বের হলাম যেন কাজারি আমার পায়ের শব্দ শুনতে না পায়। মূল দরজা খুলে দৌড়ে মিসেস সুজুকির বাড়িতে চলে গেলাম। মিসেস সুজুকির আশ্রয়ই আমাকে একমাত্র জীবিত রাখতে পারে এখন। কিন্তু দরজার বেল বাজালে মিসেস সুজুকি নন, বরং মুখে মেকআপ দেয়া একটা কমবয়সি মেয়ে দরজা খুলল।
মেয়েটা আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত নজর বুলিয়ে বলল, “কে তুমি?”
আমি মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারলাম যে এই মেয়েটা মিসেস সুজুকির সেই নাতনি।
“আঃ…আমি মানে…মিসেস সুজুকি কোথায়?”
“তুমি বলতে চাইছ আমার নানি? তিনি মারা গিয়েছেন। আজ সকালে তার প্রতিবেশী এসে আমাদেরকে জানান যে কুকুরটা অসম্ভব চিৎকার করছে। আমরা এসে তাকে সামনের দরজার কাছে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখতে পাই। বাজে ঠাণ্ডা থেকে সৃষ্ট জটিলতায় মৃত্যু। আজকে আমার স্কুলও বন্ধ ছিল। এখন এসব সামলাতে হবে। ঝামেলা ছাড়া কিছু না।”
***
আমার মনে আছে মিসেস সুজুকি মাত্র আগের দিনই বলেছিলেন যে তার মনে হয় ঠাণ্ডা লেগেছে। দরজার ফাঁক দিয়ে মেয়েটার পেছনে আমি কিছু লোকজনকে ভেতরে নড়াচড়া করতে দেখতে পাচ্ছিলাম।
“এরি! কে এসেছে?” ভেতর থেকে একজন নারীর কষ্ঠ ভেসে এল।
মেয়েটা ঘুরে বলল, “চিনি না। একটা মেয়ে, আগে কখনো দেখিনি।” তারপর আমার দিকে ঘুরল। “আমি বিশ্বাস করতে পারছি না তিনি এভাবে মারা গিয়ে আমাদের ঘাড়ে ঝামেলা চাপিয়ে দিলেন। কী যন্ত্রণা বল তো। এখন এই কুকুরটাকে নিয়ে কি করব? ভাবছি বাসায় নিয়ে যাব নাকি কোন এনিম্যাল সেন্টারে পাঠিয়ে দেব?”
এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হল, খোদা, এই মেয়ের গলা টিপে ধরলে কি কোন ভুল হবে? কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি যা করলাম তা হল মাথা নিচু করে মিসেস সুজুকির বাসার সামনে থেকে চলে এলাম।
পার্কে গিয়ে একটা বেঞ্চে বসলাম। ঐ একই বেঞ্চ যেখানে আসোকে খুঁজে পেয়েছিলাম। পার্কে অনেক বাচ্চা-কাচ্চা খেলাধুলা করছিল, স্লাইড বেয়ে নামছিল, দোলনায় দোল খাচ্ছিল, খেয়াল খুশি মত হাসছিল। আমি বলের মত গুটিসুটি মেরে চোখ বন্ধ করলাম। আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না যে মিসেস সুজুকি দুনিয়াতে আর নেই। ব্যাপারটা আমার জন্য সহ্য ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
পার্কের ঘড়িতে ছয়টা বাজছে। শিগগিরি মা বাসায় ফিরবে। আন্দাজ করলাম প্রায় তিন ঘন্টার মত হবে পার্কে বসে আছি। ঐ সময় আমার পায়ের কাছে কাদার মত দেখতে পেলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম আমার অশ্রু থেকে সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু পরে খেয়াল করলাম কাছের একটা ফোয়ারা থেকে পানি বয়ে এসে কাদা হয়েছে।
উঠে দাঁড়ালাম। ঠিক করলাম পালিয়ে পৃথিবীর শেষ সীমানায় চলে যাব। কিন্তু সেই মুহূর্তে চোখের কোণা দিয়ে কাজারিকে চোখে পড়ল। প্রথমে ভেবেছিলাম ভুল দেখেছি, কিন্তু না, পার্কের পাশের ফুটপাথ দিয়ে কাজারিই হেঁটে যাচ্ছিল, হাতে স্থানীয় কনভিনিয়েন্স স্টোর থেকে কেনাকাটার ব্যাগ ঝুলছে। আমি ওর দিকে দৌড়ে গেলাম।
